(পর্ব-১৪)

একদিন নবীজির বাড়িতে

ধৈর্য ও সহনশীলতা : নবীজির (সা.) বাড়িতে শুধু শান্তি আর শান্তি। এখানে ছোটরা যেমন স্নেহ পায়, আদর পায়, তেমনি বড়রাও পায় সম্মান ও শ্রদ্ধা। আর সবাই পায় নিরাপত্তা। কারও ওপর কোনো অত্যাচার চলে না। চলে না মারধর। নবীজি (সা.) কখনও কোনো স্ত্রীর ওপর কিংবা কোনো চাকরের ওপর হাত তোলেননি।
হঠাৎ ভাবলাম, নবীজির সহনশীলতার ব্যাপারে একটু জেনে নেই। শুরু হলো আবার জানার পালা। খোঁজ নেওয়ার পালা। প্রথম জানার সুযোগ হলো আনাস (রা.) থেকে। তিনি একবার নবীজির সঙ্গে ছিলেন। নবীজি নাজরানি একসেট কাপড় পরে কোথাও যাচ্ছিলেন। এক গ্রাম্য লোক এলো। হঠাৎ করে কিছু চাইতে গিয়ে নবীজি (সা.) এর চাদর টেনে ধরল। এমনভাবে টান লাগল যে তিনি কাঁধে চোট পেলেন। ঘষা লাগার দাগও পড়ে গেল। রাসুল (সা.) কে সে থামিয়ে বলল, হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর মাল যা আপনার কাছে আছে, তা থেকে কিছু দিতে আদেশ দিন। লোকটির কাছ থেকে নবীজি এমন আচরণ পেয়েও সহনশীলতার পরিচয় দিলেন। লোকটির দিকে তাকালেন। তার অবস্থা দেখে রাগ না করে বরং মৃদু হাসলেন। অতঃপর নির্দেশ দিলেন তাকে কিছু দেওয়ার জন্য।
আনাস (রা.) এর ভাষায় এ কাহিনি শুনছিলাম তন্ময় হয়ে। আর মিলাচ্ছিলাম আমাদের জীবনের সঙ্গে। আমরা তো এমতাবস্থায় ওই লোকটিকে গলা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতাম। নবীজি তা করলেন না বরং তাকেই আবার দান করলেন। 
নবীজি (সা.) এর দানের প্রসঙ্গ বিরাট কলেবরের। হুনাইন যুদ্ধের সময় তিনি বললেন, আমাকে যদি বনের গাছ পরিমাণ প্রাচুর্যও দেওয়া হয়, তাহলে তা আমি দান করতেই থাকব। সবই দান করে দেব। এক্ষেত্রে আমাকে কৃপণ হিসেবে পাবে না। হীনমনাও পাবে না। আমার বক্তব্যে আমি মিথ্যাবাদীও হব না। আমি সবই দান করব। 
রাসুল (সা.) ধৈর্য ও সহিঞ্চুতার পরিচয় দিয়েছেন সব ক্ষেত্রে। ধর্মীয় ক্ষেত্রে, ব্যক্তিজীবনে, সামাজিক কর্মকা-ে। একবার তো এক লোক এসে মসজিদে প্রস্রাব করতে বসে গেল। লোকেরা তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিল। নবী করিম (সা.) তাদের বাধা দিলেন। লোকটি প্রস্রাব করা শেষ করলে তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিলেন। সাহাবিদের বললেন পানি প্রবাহিত করে দিতে অথবা পানি ঢেলে দিতে। অথচ আমরা হলে তো ওই লোকদের থেকে এক ডিগ্রি বাড়িয়ে প্রস্রাবরত লোকটির মাথায় আঘাত করে বসতাম। পক্ষান্তরে নবীজি কত ধৈর্যশীল, সহনশীল। আবেগে উত্তেজিত হয়ে পড়েন না কখনও।
ধৈর্যের প্রসঙ্গ যেহেতু চলছে, তাই এ ব্যাপারে মুখোমুখি হলাম আয়েশা (রা.) এর একটি দীর্ঘ বর্ণনার। আয়েশা (রা.) নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, উহুদ যুদ্ধের ভয়াবহ অবস্থার চেয়েও আরও কোনো ভয়াবহ কষ্টদায়ক অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন কি? রাসুলে করিম (সা.) জওয়াব দিলেন, তায়েফে যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলাম, তেমন পরিস্থিতির শিকার আর কখনও হইনি। কষ্টের তীব্রতায় যখন ইবনে আবদে ইয়ালিলের কাছে আশ্রয় চাইলাম, তখন সে আশ্রয় দিল না। আমার উদ্দেশ্যের ব্যাপারে কোনো সহযোগিতা করল না। আমি চলছি। আমার চেহারা মলিন। মাথা এলোমেলো। আমি যেন চলতে পারছিলাম না। ক্লান্ত হয়ে পড়ে গেলাম। ঠিক তখনই একখ- মেঘ এসে আমাকে ছায়া দিল। এলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য। আমি মেঘের দিকে তাকালাম। তখন দেখি সেখানে জিবরাইল (আ.)। তিনি আমাকে ডাক দিলেন। এবার তিনি বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ আপনার গোত্রের লোকদের কথাবার্তা সব শুনেছেন। তারা কি আচরণ করেছে, তাও তিনি দেখেছেন। তাই আল্লাহ তায়ালা আপনার কাছে পাঠিয়েছেন পাহাড়ের দায়িত্বশীল ফেরেশতাকে, আপনি যা আদেশ করবেন, তাই সে করবে। সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের ফেরেশতাকে আমার কাছে আনা হলো। সে এসে আমাকে সালাম দিল। তারপর বলল, হে মুহাম্মদ (সা.)। আপনার সঙ্গে আপনার উম্মতের কী কথা হয়েছে, আল্লাহ তা শুনেছেন। আমি পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণকারী ফেরেশতা। আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন, যেন আপনি যা বলেন তা-ই বাস্তবায়ন করি। বলুন আপনি কী চান? আপনি যদি চান, তাহলে দু’পাহাড় একত্রে মিশিয়ে মধ্যস্থিত এসব অবাধ্য কাফেরদের পিষে ফেলব। 
নবীয়ে রাহমাতুল্লিল আলামিন (সা.) জবাব দিলেন, ‘আমি এখন শাস্তি চাই না। বরং আমি তো চাচ্ছি তারা বেঁচে থাকবে। আর তাদের ঔরস থেকে এমন সন্তান জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। আল্লাহর সঙ্গে কোনো অংশীদারিত্ব সাব্যস্ত করবে না।’
আমরা তো ইসলামের দাওয়াত দিয়ে নগদ চাইতে থাকি। নবীজির চিন্তাচেতনা কত সুদূরপ্রসারী! উপস্থিত কাফেরদের মৃত্যু কামনা করেননি। বরং তাদের সন্তানদের হেদায়েত কামনা করেছেন। তিনি ফল পাওয়ার ব্যাপারে ধৈর্যশীল ছিলেন। আবার প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষেত্রেও ধৈর্যশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তাৎক্ষণিক রাসুল্লাল্লাহ (সা.) কারও শাস্তি কামনা করেননি।
নবীজির আরেকটি ধৈর্যের কথা সবারই জানা। রাসুল (সা.) এক সাহাবির জানাযায় ছিলেন। এরই মধ্যে এক ইহুদি এলো। তার নাম যায়িদ বিন সা’নাহ। নবীজির কাছে উপস্থিত হয়ে ঋণ পরিশোধের জন্য চাপ দিল। এক পর্যায়ে ইহুদিটি নবীজির কাপড়-চাদর টান দিয়ে ধরল। তার চেহারা একদম ক্রোধান্বিত করে রাখল। রেগে বলল, ‘হে মুহাম্মদ! তুমি কি আমার অধিকার পরিশোধ করে দেবে না?’
লোকটি অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করছিল। তাই দেখে ওমর (রা.) ক্ষেপে গেলেন। ওমর (রা.) রেগে যায়িদের দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন রাগ ঠিকরে পড়ছে। চোখ দুটি চক্কর খাচ্ছে। তিনি ক্ষেপে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর দুশমন! নবীজির শানে এমন বেয়াদবি! যিনি আমার নবীকে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার শপথ করে বলছিÑ আমি যদি নবীজির তিরস্কারের ভয় না করতাম, তাহলে অবশ্যই আমার তরবারি দ্বারা তোমাকে দ্বিখ-িত করে দিতাম।
রাসুল (সা.) সান্ত¡না ও ভালোবাসাপূর্ণ চোখে ওমর (রা.) এর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, হে ওমর! আমি তোমার থেকে অন্য কিছু চেয়েছিলাম। তোমার কর্তব্য তো ছিল আমাকে উপদেশ দেবে ভালোভাবে ঋণ আদায় করে দেওয়ার জন্য, আর তাকে বলবে সুন্দরভাবে তাগিদ দেওয়ার জন্য। হে ওমর! তাকে নিয়ে যাও। তার পাওনা আদায় করে দাও। তার সঙ্গে আরও ২০ ছা খেজুর বাড়িয়ে দাও।
যখন ‘ওমর ২০ ছা’ খেজুর বাড়িয়ে দিলেন, তখন ইহুদি যায়িদ ওমরকে জিজ্ঞাসা করলÑ এগুলো অতিরিক্ত কেন? জবাবে ওমর (রা.) বললেন, নবী করিম (সা.) আমাকে আদেশ দিয়েছেনÑ তোমার শাস্তির বদলায় তা বাড়িয়ে দিতে। তখন ইহুদি লোকটি বলল, হে ওমর! আমাকে চিনতে পেরেছেন? ওমর (রা.) জবাবে বললেনÑ না চিনতে পারিনি। আপনি কে?
আমি যায়িদ বিন সা’নাহ।
: পাদ্রি?
: জি, পাদ্রি।
: তাহলে রাসুলের সঙ্গে এমন আচরণ করার কারণ কি?
: হে ওমর! আমি নবুওতের দুটি চিহ্ন নবীজির চেহারা দেখেই জেনে নিয়েছি। একটি বাকি ছিল। তা হলো মূর্খদের অপেক্ষা তার ধৈর্য ও সহনশীলতা সবচেয়ে বেশি হবে। এ পরীক্ষায় তিনি টিকে গেলেন। 
অতঃপর বলল, হে ওমর! আল্লাহকে রব ও ইসলামকে দ্বীন হিসেবে আমি গ্রহণ করলাম। তারপর তিনি বললেন, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল। আপনি সাক্ষী থাকবেন, আমার মালের একটা অংশ উম্মতে মোহাম্মদির জন্য দান করলাম।
ওমর (রা.) বললেন, অতঃপর সে ইহুদি নবী করিম (সা.) এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে নিলেন।


উত্তম চরিত্র নিয়ে যাবে জান্নাতে
রাসুল (সা.) এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে দোয়া করতেনÑ তিনি নিজে
বিস্তারিত
আসল ব্যাধির দাওয়াই
ঈমানি ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখা। দ্বীনের ওপর চলার ক্ষেত্রে এটা বড়
বিস্তারিত
আলমেদরে সমালোচনা
আমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শক্ষিক ছলিাম। মাদ্রাসায় পড়ার পর আরও
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : সুবাসিত জীবনের পথ লেখক : মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন ইবরাহীম সম্পাদক
বিস্তারিত
পাথেয়
  ষ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এ হচ্ছে স্মৃতিচারণ, মুত্তাকিদের জন্য অবশ্যই
বিস্তারিত
শীতকালের তাৎপর্য ও বিধিবিধান
শরিয়তে বিধানের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কষ্ট বা প্রয়োজনের সময়
বিস্তারিত