কোরআন সুন্নাহর দৃষ্টিতে বদনজর

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন ‘বদনজর সত্য। যদি কোনো জিনিস তকদির তথা ভাগ্যে পরিবর্তন সাধন করত তাহলে তা হতো এ বদনজর। সুতরাং যদি তোমাদের কাছে শরীর ধোয়া পানি চাওয়া হয় তোমরা দিতে অস্বীকার করো না।’ (মুসলিম)। আসমা বিনতে উমাইস (রা.) থেকে বর্ণিত, ত

শাইখুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) প্রতিষ্ঠিত জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়ার সামনে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত ঐতিহাসিক সাতগম্বুজ মসজিদ। ছবি : আলী হাসান তৈয়ব

বদনজর বা নজর লাগাকে শরিয়তের ভাষায় বলা হয় ‘আইন’। আরবিতে ‘আইন’ শব্দটি ‘আ-না-ইয়াইনু’ থেকে নির্গত। যার অর্থ দাঁড়ায় কাউকে চোখ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত করা। তার মূল অর্থ হচ্ছে, কেউ কিছু দেখে মুগ্ধতায় বিমূঢ় হওয়ার পর তার আত্মিক কদর্যতা ওই মুগ্ধ হওয়া ব্যক্তিকে ঘিরে ফেলা। অতঃপর তার দৃষ্টির বিষকে দৃষ্টি নিক্ষেপকৃত ব্যক্তির ওপর প্রয়োগ করা। আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবী (সা.) কে হিংসুকের হিংসা থেকে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন কোরআনে। এরশাদ হয়েছেÑ ‘হিংসুকের হিংসার অনিষ্ট থেকে (রবের কাছে পানাহ চাই)।’ (সূরা ফালাক : ৫)। প্রত্যেক নজরদাতাই হিংসুক; পক্ষান্তরে সব হিংসুক বদনজর বিশিষ্ট নয়। সুতরাং হিংসা যেহেতু বদনজর থেকে ব্যাপক; তাই হিংসুক থেকে আশ্রয় চাওয়ার মধ্যে বদনজরধারী থেকে আশ্রয় চাওয়াও অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। 
বদনজর এমন একটি তির, যা হিংসুক ও কুদৃষ্টিদাতার সত্তা থেকে বের হয়। টার্গেট থাকে বদনজর ও হিংসার শিকার ব্যক্তি, যা একবার লক্ষ্য স্পর্শ করে আবার কখনও লক্ষ্যচ্যুত হয়। যদি ব্যক্তির ওপর অসতর্ক অবস্থায় বা নগ্নভাবে চক্ষু পড়ে, তাহলে তা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। আর যদি সতর্ক অবস্থায় ব্যক্তির ওপর দৃষ্টি পড়ে, তাহলে তা প্রভাব সৃষ্টি করে না। কখনও আবার তির তার নিক্ষেপকারীর দিকেই ফিরে আসে। (যাদুল মাআদ)।
হাদিসে বদনজর প্রসঙ্গ 
বদনজর-সংক্রান্ত অনেক হাদিস রয়েছে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) আমাকে বদনজর থেকে বাঁচার জন্য ঝাড়ফুঁক করতে আদেশ করেছেন। (বোখারি, মুসলিম)। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘বদনজর সত্য। যদি কোনো জিনিস তকদির তথা ভাগ্যে পরিবর্তন সাধন করত তাহলে তা হতো এ বদনজর। সুতরাং যদি তোমাদের কাছে শরীর ধোয়া পানি চাওয়া হয় তোমরা দিতে অস্বীকার করো না।’ (মুসলিম)। 
আসমা বিনতে উমাইস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! জাফর গোত্রের লোকদের বদনজর লেগেছে, আমরা কি তাদের জন্য ঝাড়ফুঁক করব? তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ। যদি কোনো বস্তু ভাগ্য পরিবর্তন করত তাহলে তা বদনজর।’ (তিরমিজি)। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘বদনজরদাতার কাছে অজু করতে বলা হবে। অতঃপর সে পানি দিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ধৌত করা হবে।’ (আবু দাউদ)। 
সাহল বিন হুনাইফ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বের হলেন। সঙ্গে ছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। উদ্দেশ্য মক্কা মোকাররমা। পথিমধ্যে জুহফা নামক স্থানের খারার নামক ঘাঁটিতে তারা অবতরণ করলেন। সেখানে সাহল বিন হুনাইফ (রা.) গোসল করতে গেলেন। তিনি ছিলেন ধবধবে ফরসা। তার চেহারা ও চামড়া ছিল দুধে-আলতায়। সেখানে আদি বিন কাব গোত্রের আমের বিন রবিআও গোসল করছিলেন। তিনি তার দিকে নজর দিয়ে বললেন, এর আগে এত সুন্দর কাউকে দেখিনি। এমন লাবণ্যময় ত্বকও দেখিনি। সঙ্গে সঙ্গে সাহল (রা.) বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলেন। অতঃপর রাসুল (সা.) এর কাছে যাওয়া হলো। বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি সাহলকে কিছু করবেন? আল্লাহর কসম! তিনি মাথা তুলতে পারছেন না। রাসুল (সা.) বললেন, তার ব্যাপারে কারও বিরুদ্ধে কি তোমাদের অভিযোগ আছে? তারা বললেন, আমের বিন রবিআ তার দিকে তাকিয়েছিল। রাসুল (সা.) আমের বিন রবিআকে ডাকলেন। তার ওপর রাগান্বিত হলেন এবং বললেন ‘তোমাদের কেউ কেন তার ভাইকে হত্যা করে! তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তুমি কেন বরকতের দোয়া করলে না?’ অতঃপর তাকে বললেন, ‘তুমি তার জন্য গোসল করো।’ সাহাবিটি তার চেহারা, দুই হাত, দুই কনুই, দুই টাখনু, দুই পায়ের পার্শ্বদেশ এবং লুঙ্গির ভেতরের অংশ একটি পাত্রে ধৌত করেন। অতঃপর ওই পানি সাহলের গায়ে ঢেলে দেওয়া হয়। এক ব্যক্তি তার পেছন থেকে পিঠে-মাথায়ও ঢেলে দেন। অতঃপর পাত্রটি তার পেছনে রাখা হয় এবং অনুরূপ আবার করা হয়। এরপর সাহল (রা.) লোকদের সঙ্গে চলতে সক্ষম হলেন। তার কোনো সমস্যা হলো না। (আহমদ)।
উল্লেখিত হাদিসগুলোসহ আরও বিভিন্ন সুন্নাহ ও ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ওলামায়ে কেরামের মত হলো বদনজর সত্য এবং তার বাস্তবতা রয়েছে। ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থ প্রণেতা উল্লেখ করেছেন, ইমাম বাজ্জার (রহ.) হাসান সনদে উল্লেখ করেছেন, জাবের (রা.) সূত্রে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন ‘আল্লাহর নির্ধারিত তকদির বাদ দিলে আমার উম্মতের অধিকাংশের মৃত্যু হবে বদনজরের কারণে।’ 
অতএব আমাদের করণীয় হলো নিজেকে জিন ও মানব শয়তান থেকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করা। আল্লাহর প্রতি ঈমানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে, তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসা ও তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে, তাঁর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং তাঁর প্রতি বিনয়ী হওয়ার মাধ্যমে, নবী (সা.) কর্তৃক বর্ণিত বিভিন্ন দোয়ার মাধ্যমে, অধিক হারে সূরা ফালাক, নাস, ইখলাস, ফাতেহা, আয়াতুল কুরসি পাঠের মাধ্যমে। 
শায়খ উসাইমিনের ফতোয়া
শায়েখ সালেহ উসাইমিন (রহ.) কে জিজ্ঞেস করা হলো, বদনজর কি সত্য? তিনি উত্তরে বলেন, শরিয়ত ও বাস্তবতার আলোকে বদনজর লাগা সত্য ও সঠিক। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যখন কাফেররা আপনাকে দেখে, তখন তারা চোখ দ্বারা আপনাকে স্খলন চায়।’ (সূরা কলম : ৫১)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস ও অন্যরা বলেছেন, তারা বদনজর দেয়। 
বদনজরের আমল
বাস্তবতাও এমনটিই প্রমাণ করে। তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। যদি এমনটি ঘটে যায়, তাহলে শরিয়ত কর্তৃক বৈধ সব চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। যেমন : 
ক. কোরআন-সুন্নাহে বর্ণিত দোয়া পাঠ করা। নবী (সা.) বলেন জ্বর বা বদনজর ব্যতীত ঝাড়ফুঁক করা যাবে না। (তিরমিজি)। জিবরাইল (আ.) নবী (সা.) কে ঝাড়ফুঁক করেছেন। তিনি নবীজি (সা.) দোয়া করেছেন এভাবেÑ ‘বিসমিল্লাহি আরকিকা, মিন কুল্লি শাইয়িন ইয়ু’যিকা, ওয়া মিন কুল্লি আইনিন ওয়া হাসিদিন আল্লাহু ইয়াশফিকা।’ অর্থাৎ ‘আমি আল্লাহর নামে আপনাকে ফুঁক দিচ্ছি, সব কষ্টদায়ক বস্তু থেকে। সব হিংসুক চোখ ও ব্যক্তি থেকে। আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করে দিন। আমি আল্লাহর নামে আপনাকে ফুঁক দিচ্ছি।’ 
খ. পূর্বোক্ত হাদিস অনুযায়ী অঙ্গ ধৌত করা। যেমন নবী (সা.) আমের বিন রবিআ (রা.) কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারপর ধৌতকৃত পানি আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর ঢেলে দেওয়া।
নজর লাগা রোগীর চিকিৎসা
যখন কোনো মানুষ বদনজর লেগেছে বলে অনুভব করবে বা বদনজর লাগার সন্দেহ করবে, তখন যার বদনজর লেগেছে বলে সে মনে করছে তাকে বলা হবে, তার ভাইয়ের জন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করে দিতে। তার কাছে পানিভর্তি একটি পাত্র আনা হবে। সে তার হাত তাতে ঢুকাবে। অতঃপর কুলি করবে। অতঃপর পাত্রে তার কুলি নিক্ষেপ করবে। পাত্রে তার চেহারা ধৌত করবে। অতঃপর বাম হাত প্রবেশ করাবে, তা দিয়ে ডান টাখনুতে পানি ঢালবে পাত্রের ওপরে। অতঃপর ডান হাত প্রবেশ করাবে, তা দিয়ে বাম টাখনুতে পানি ঢালবে। অতঃপর তার লুঙ্গির ভেতর ধৌত করবে। অতঃপর সে পানি নিয়ে চোখ বদনজরে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পেছন দিক দিয়ে একবার সজোরে পানি ঢেলে দেবে। ইনশাআল্লাহ সুস্থ হয়ে যাবে। (ফতোয়া লাজনায়ে দায়েমা : ১/১৮৬)।
আগে থেকে সতর্ক থাকা
বদনজর যেন না লাগে এজন্য আগে থেকে সতর্ক থাকতে হবে। এটা তাওয়াক্কুল পরিপন্থি নয়। বরং এটাই তাওয়াক্কুল। কেননা তাওয়াক্কুল হলো আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং পাশাপাশি বৈধ ও নির্দেশিত সব উপকরণ গ্রহণ করা। 
নবী করিম (সা.) হাসান ও হুসাইন (রা.) এর জন্য আগাম দোয়া করতেন এভাবে
‘আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত-তাম্মাতি মিন কুল্লি শায়তানিন ওয়া হাম্মাতিন ওয়া মিন কুল্লি আইনিন লাম্মাতিন।’
‘আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ বাণীগুলোর মাধ্যমে সব শয়তান ও ক্ষতিকর প্রাণী থেকে তোমাদের জন্য আশ্রয় কামনা করছি। আরও আশ্রয় চাচ্ছি সব বদনজরবিশিষ্ট চক্ষু থেকে।’ (তিরমিজি)। 
নবী (সা.) বলতেন ‘এভাবেই ইবরাহিম (আ.) ইসমাইল ও ইসহাক (আ.) এর জন্য দোয়া করতেন।’ (বোখারি)। (ফতোয়া শায়েখ ইবনে উসাইমিন : ২/১১৭, ১১৮)।

বিশ্বখ্যাত ইসলামিক প্রশ্নোত্তর সাইট ইসলাম
কিউ অ্যান্ড এ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর যাইনুল আবেদীন ইবরাহীম


উত্তম চরিত্র নিয়ে যাবে জান্নাতে
রাসুল (সা.) এর উত্তম আখলাক সম্পর্কে দোয়া করতেনÑ তিনি নিজে
বিস্তারিত
আসল ব্যাধির দাওয়াই
ঈমানি ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখা। দ্বীনের ওপর চলার ক্ষেত্রে এটা বড়
বিস্তারিত
আলমেদরে সমালোচনা
আমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শক্ষিক ছলিাম। মাদ্রাসায় পড়ার পর আরও
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : সুবাসিত জীবনের পথ লেখক : মুহাম্মদ যাইনুল আবেদীন ইবরাহীম সম্পাদক
বিস্তারিত
পাথেয়
  ষ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এ হচ্ছে স্মৃতিচারণ, মুত্তাকিদের জন্য অবশ্যই
বিস্তারিত
শীতকালের তাৎপর্য ও বিধিবিধান
শরিয়তে বিধানের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কষ্ট বা প্রয়োজনের সময়
বিস্তারিত