কোরআনে বিশ্বনবী (সা.) এর আবির্ভাবের সুসংবাদ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি আমার পিতা ইবরাহিম (আ.) এর দোয়ার ফলে, আর ঈসা (আ.) আমার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) এর দোয়া আল্লাহ তায়ালার এই বাণীতে উদ্ভাসিত হয়েছে। ইবরাহিম (আ.) এর জবানীতে আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্য থেক

কোনো বড় মেহমান আসার আগে চারদিকে সাড়া পড়ে যায়। তাকে বরণ করার প্রস্তুতি চলে নানা আয়োজনে। আমাদের সমাজ লৌকিকতার মতো সৃষ্টির সর্বত্রও এ রেওয়াজ বিরাজমান। মেহমান যত বড় হয় প্রস্তুতি তত আগ থেকে শুরু হয় এবং সেই তুলনায় ব্যাপকতর হয়। সৃষ্টিলোকের সবচেয়ে সম্মানিত মেহমান হিসেবে পৃথিবীর বুকে আগমন করেন আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)। আরবের মক্কার জমিনে তাঁর শুভ পদার্পণ হয় আজ থেকে দেড় হাজার বছর পূর্বে। বর্তমানে চৌদ্দশ একচল্লিশ হিজরি (১৪৪১) চলছে। হিজরি সন গণনা শুরু হয়েছে নবীজি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের তারিখ থেকে। তখন নবীজির বয়স ছিল তিপ্পান্ন বছর। অর্থাৎ হিজরি সন গণনা শুরুর ৫৩ বছর আগে ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মক্কার জমিনে ভূমিষ্ঠ হন। বিস্ময়কর হলো, তিনি যে শেষ জমানায় তাশরিফ আনবেন, সেই সুসংবাদ ঘোষিত হয় সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে, যুগ থেকে যুগান্তরে, নবী-রাসুলদের পবিত্র জবানীতে। 
নবীজির শুভ পদার্পণ সংবাদ বিঘোষিত হয়েছে সব আসমানি কিতাবে। কোরআন মজিদ, তওরাত, ইঞ্জিল ও জবুর এবং অন্যান্য গ্রন্থে। এ কথা সত্য, পূর্বেকার আসমানি ধর্মগ্রন্থ তওরাত, ইঞ্জিল ও জবুর প্রভৃতির আসল রূপ বর্তমান নেই। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের হাতে বিকৃত হয়ে এসব কিতাব বর্তমানে বাইবেলের কলেবরে গ্রন্থিত রয়েছে। এরপরও এসব কিতাবে এমন কিছু বক্তব্য পাওয়া যায়, যেগুলোতে বিশ্বনবী মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) এর শুভাগমনের পূর্বাভাস খুঁজে পাওয়া যায় এবং ইহুদি ও খ্রিষ্টান পাদ্রি-পুরোহিতরাও কোনো না কোনোভাবে তার সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। 
আসমানি ধর্মগ্রন্থগুলোতে উল্লেখ থাকার কারণে বনি ইসরাইলের কিছু লোক মহানবীর আগমনের বহু আগেই তাঁর নবুয়ত লাভের বিষয়টিকে স্বীকার করে নেন এবং পরবর্তী বংশধরদের অন্তিম উপদেশ দিয়ে যান যে, তোমরা শেষ নবীর প্রতি ঈমান আনবে ও মনে-প্রাণে তাঁকে সাহায্য করবে। কোরআন মজিদে বিষয়টি এভাবে উপস্থাপিত হয়েছে ‘অতঃপর তাদের মধ্যে একদল তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল এবং একদল তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, দগ্ধ করার জন্য জাহান্নামই তো যথেষ্ট।’ (সূরা নিসা : ৫৫)।
নবীজির আবির্ভাবের পূর্বেই এসব লোক তাঁর প্রতি বিশ্বাসী হওয়ার কারণ ছিল পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের ঘোষণার দ্বারা তারা উপকৃত হয়েছিল। আসমানি কিতাবগুলোতে তাঁর বিবরণ পড়ে তারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল। নবী-রাসুলদের এ শিক্ষা প্রজন্ম পরম্পরায় তাদের মধ্যে অব্যাহত ছিল। 
আগেকার যুগে নবীজির শুভাগমনের সংবাদ প্রচারের আরেকটি সূত্র ছিল গণকরা। গণকরা তাদের সহযোগী জিনদের মাধ্যমে ঊর্ধ্বজগতের কিছু কিছু খবরাখবর আগাম জেনে নিতে পারত। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে তার সলাপরামর্শ ও সিদ্ধান্ত হয় ঊর্ধ্বলোকে। পরে তার বাস্তবায়ন হয় পৃথিবীতে। জিন বা শয়তানদের অভ্যাস ছিল ঊর্ধ্বজগতে। উঁকি দিয়ে তারা গোপন তথ্য জেনে নিত, তারপর সেগুলো পৃথিবীতে তাদের দোসর গণকদের জানিয়ে দিত। এসব তথ্য আয়ত্ত করে গণকরা ভাগ্য-গণনার পশরা জমাত। ঊর্ধ্বাকাশে জিন শয়তানের উপস্থিতি টের পেলেই উল্কাপি- গোলা আকারে তাদের দিকে নিক্ষেপ করা হতো। ঊর্ধ্বলোকের অন্যতম প্রধান সিদ্ধান্ত ছিল শেষ জমানায় মহানবী (সা.) এর আগমন। সেই আগমনি সংবাদ জিনরাও জেনে তা গণকদের কাছে প্রকাশ করত। জিনরা কান পেতে ঊর্ধ্বজগতের তথ্য সংগ্রহ সম্পর্কে জিনদের ভাষ্য কোরআনে এভাবে এসেছেÑ ‘আর পূর্বে আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শুনার জন্য বসতাম; কিন্তু এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে তার ওপর নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত জ্বলন্ত উল্কাপি-ের সম্মুখীন হয়।’ (সূরা জিন : ৯)।
পৌত্তলিকদের পূজ্য প্রতীমার ভেতর থেকেও জিনরা নবীজির নবুয়তের সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ইতিহাসে উল্লেখ আছে। মূলত এসবের ফলে সৌভাগ্যবান লোকরা সত্যের সন্ধান পেয়েছেন এবং আল্লাহ তায়ালা তাদের সত্যের অনুসরণ ও মহানবী (সা.) এর প্রতি ঈমান আনয়নের হেদায়েত দান করেছেন।
যেসব আসমানি গ্রন্থে মহানবী (সা.) এর আগমনি সংবাদ ঘোষিত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে কোরআনুল কারিম, মুসা (আ.) এর ওপর অবতীর্ণ তওরাত, ঈসা (আ.) এর ইঞ্জিল এবং দাউদ (আ.) এর জবুর কিতাব। এছাড়া হিজকিল ও শামাউন (আ.) প্রমুখ নবীর প্রতি নাজিলকৃত কিতাবগুলোতেও বিভিন্ন আঙ্গিকে এর উল্লেখ আছে। 

কোরআন মজিদে নবী করিম (সা.) এর আগমনি সুসংবাদ
কোরআন মজিদে বর্ণিত আছে, হজরত ঈসা (আ.) পরিষ্কার ভাষায় তার কওমের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন, তার পরে যিনি আল্লাহর রাসুল হয়ে আসবেন এবং যার নাম হবে আহমদ, তাঁর প্রতি তোমরা ঈমান আনয়ন করবে। এরশাদ হয়েছেÑ ‘স্মরণ কর, মরিয়ম পুত্র ঈসা বলেছিল, হে বনি ইসরাইল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসুল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে তওরাত রয়েছে আমি তার সমর্থক এবং আমার পরে আহমদ নামে যে রাসুল আসবে আমি তাঁর সুসংবাদদাতা। পরে সে যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাদের কাছে এলো, তখন তারা বলতে লাগল, এটা তো স্পষ্ট জাদু।’ (সূরা সফ : ৬)। 
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, হজরত ঈসা (আ.) শেষ নবীর আগমন হলে তাঁর প্রতি ঈমান আনার জন্য আপন কওম খ্রিষ্টানদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন এবং শেষ নবীর নামটিও হচ্ছে আহমদ, যা হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) এর অপর নাম। অন্য আয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী, এমন অঙ্গীকার স্বয়ং নবী-রাসুলদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল এবং তা-ও নিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা।
এরশাদ হয়েছে ‘স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের কাছ থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, তোমাদের কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়েছি অতঃপর তোমাদের কাছে যা আছে তার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসুল আসবে, তখন তোমরা অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে। এ সম্পর্কে আমার অঙ্গীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে? তারা বলল, আমরা স্বীকার করলাম। তিনি বললেন, তবে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সঙ্গে সাক্ষী রইলাম।’ (সূরা আলে ইমরান : ৮১)। 
মুফাসসিররা বলেন, প্রত্যেক নবী-রাসুলের কাছে ওহি প্রেরণের সময়ই আল্লাহ তায়ালা এ অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন। যে কোনো নবী-রাসুল দুনিয়ায় প্রেরিত হয়েছেন তার কাছে আল্লাহ তায়ালা হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর পরিচয় ও তাঁর গুণাবলি তুলে ধরেছেন। তারপর ওয়াদা নিয়েছেন যে, যদি মুহাম্মদ (সা.) এর সাক্ষাৎ পাও অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে। মুফাসসিররা বলেন, এ অঙ্গীকারের আসল উদ্দেশ্য ছিল, তারা যাতে নিজ নিজ উম্মতের কাছে তথ্যটি তুলে ধরেন এবং তাদের কাছ থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন যে, মুহাম্মদ (সা.) এর শুভাগমন হলে অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে। শুধু উপদেশ নয়, এই মর্মে তাদের কাছ থেকে যেন অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। একইভাবে পরবর্তী বংশধরদের কাছেও যেন তারা বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করে। 
হজরত আলী (রা.) বলেন, আদম (আ.) থেকে নিয়ে পরবর্তী প্রত্যেক পয়গম্বরের কাছ থেকে আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ (সা.) এর ব্যাপারে এই মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন যে, ততদিন বেঁচে থাকলে যখনই মুহাম্মদ (সা.) আবির্ভূত হবেন, তাঁর প্রতি ঈমান আনবে, তাঁকে সাহায্য করবে এবং আপন কওমের কাছ থেকে এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করবে। কোরআন মজিদে এই মর্মে এরশাদ হয়েছেÑ ‘স্মরণ কর, যখন আমি নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং তোমার কাছ থেকেও এবং ইবরাহিম, মুসা ও মরিয়ম-তনয় ঈসার কাছ থেকেও, তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার।’ (সূরা আহজাব : ৭)।
কাতাদাহ থেকে বর্ণিত, পয়গম্বর (সা.) বলেন, আমি সৃষ্টির দিক থেকে পয়গম্বরদের চেয়ে প্রথম। আর নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার দিক থেকে সবার শেষ। কাজি আয়াজ বলেন, এ আয়াতে এ কথার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, নবী করিম (সা.) এর আগমন অনেক আগেই হয়েছে। কেননা আয়াতে নবী করিম (সা.) এর নাম নুহ ও অন্য পয়গম্বরদের আগে উল্লেখ করা হয়েছে। 
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি আমার পিতা ইবরাহিম (আ.) এর দোয়ার ফলে, আর ঈসা (আ.) আমার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) এর দোয়া আল্লাহ তায়ালার এই বাণীতে উদ্ভাসিত হয়েছে। ইবরাহিম (আ.) এর জবানীতে আল্লাহ তায়ালা বলেনÑ ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রাসুল প্রেরণ কর, যে তোমার আয়াতগুলো তাদের কাছে তেলাওয়াত করবে; তাদের কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদের পবিত্র করবে। তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা বাকারা : ১২৯)।


চীনে মুসলিম নির্যাতনের গোপন নথি
  সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক নথিতে গণচীনে উইঘুর মুসলিম নির্যাতন
বিস্তারিত
হিজাব পরার অনুমতি পেলেন ত্রিনিদাদ-টোবাগোর সেই
দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান সাগরের দেশ ত্রিনিদাদ-টোবাগো প্রজাতন্ত্রের এক মুসলিম নারী পুলিশ
বিস্তারিত
আফগান যুদ্ধ অবসানে তালেবানের সঙ্গে
দীর্ঘদিনের আফগান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে তালেবানের সঙ্গে আবার
বিস্তারিত
ইউনেস্কোর তালিকায় বিশ্বের প্রভাবশালী কবিদের
বাহলানির কবিতা ছিল সূক্ষ্ম প্রেমময়। কিন্তু তার সাহিত্য ও চিন্তাজগতে
বিস্তারিত
যে ১০ দেশে বাংলাদেশের সবচেয়ে
  জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বা বিএমইটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে
বিস্তারিত
জনসমাবেশের ‘শব্দদূষণ’ নিয়ন্ত্রণ
যানবাহনের হর্নের শব্দ, মানুষের হল্লা, চিৎকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রোগ্রামের মাইকের
বিস্তারিত