সুপারিশে সওয়াব মেলে

রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেনÑ আমি শুধুই একজন সুপারিশকারী। (অর্থাৎ এটা তোমার প্রতি আমার আদেশ নয়, পরামর্শ ও অনুরোধ)। তখন হজরত বারিরা (রা.) বললেন, তাই যদি হয়, তাহলে তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ তাকে আবার গ্রহণ করে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। (সুনানে আবু দাউদ : ২২৩৩; সুনানে নাসাঈ : ৫৪১৭)

দুই সাহাবিÑ হজরত মুগিস (রা.) এবং হজরত বারিরা (রা.) সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। বিয়ের সময় হজরত বারিরা ছিলেন আরেকজনের দাসী। হজরত বারিরা (রা.) এর মনিব হয়তো তার অমতেই তাকে বিয়ে দিয়েছিলেন হজরত মুগিস (রা.) এর কাছে। বারিরা ছিলেন অত্যন্ত রূপসী। কিন্তু তার স্বামী মুগিস (রা.) এর গঠন-আকৃতি সুন্দর ছিল না। এরপরের কথা। উম্মুল মোমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) এ দাসীকে কিনে আজাদ করে দিলেন। হজরত বারিরা যখন স্বাধীন হয়ে গেলেন, তখন ইসলামি শরিয়তের বিধানানুসারে তার বিয়েটি টিকিয়ে রাখার কিংবা ভেঙে দেওয়ার এখতিয়ার লাভ করলেন। এ এখতিয়ারের ভিত্তিতে তিনি তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙে দেন। হজরত মুগিস (রা.) অনেক অনুনয়-কান্নাকাটি করেও বারিরার মন গলাতে পারেননি। অবশেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বললেনÑ আপনি আমার জন্য সুপারিশ করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত বারিরা (রা.) কে তার সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করতে সুপারিশ করলেন, তুমি যদি তাকে আবার গ্রহণ করে নিতে! সে যে তোমার সন্তানের বাবা!
সদ্যমুক্তি পাওয়া এ নারী রাসুলুল্লাহ (সা.) কে প্রত্যুত্তরে যা বলেছিলেন, তাতেই তিনি ইতিহাস হয়ে থাকতে পারেন। তিনি বলেছিলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি আমাকে এর আদেশ করছেন? (আপনার আদেশ যদি হয়, তাহলে আমার জন্য তা শিরোধার্য। আমার মতের সঙ্গে তা মিলুক আর না-ই মিলুক, আমি আপনার আদেশই মেনে নেব। কিন্তু যদি আদেশ না হয়, তাহলে ভিন্ন কথা)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেনÑ আমি শুধুই একজন সুপারিশকারী। (অর্থাৎ এটা তোমার প্রতি আমার আদেশ নয়, পরামর্শ ও অনুরোধ)।
তখন হজরত বারিরা (রা.) বললেন, তাই যদি হয়, তাহলে তার কাছে আমার কোনো প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ তাকে আবার গ্রহণ করে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। (সুনানে আবু দাউদ : ২২৩৩; সুনানে নাসাঈ : ৫৪১৭)।
হজরত বারিরা (রা.) এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুপারিশ গ্রহণ করলেন না। এটা ছিল তার অধিকার ও স্বাধীনতা। নবীজি (সা.)ও তাই তার ওপর বিষয়টি চাপিয়ে দেননি। তবে এ সুপারিশ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণে তিনি কি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন? রুষ্ট হয়েছিলেন? ইতিহাস আমাদের ভিন্ন কথা বলে।
তিনি একবার গিয়েছিলেন হজরত বারিরা (রা.) এর ঘরে। গিয়ে দেখলেনÑ ডেকচিতে মাংস রান্না করা হচ্ছে। এরপর হজরত বারিরা (রা.) নবীজি (সা.) কে রুটি এবং ঘরে থাকা অন্য একটি তরকারি দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। নবীজি (সা.) বললেনÑ কী ব্যাপার! ডেকচিতে দেখলাম মাংস রান্না করা হচ্ছে! (অথচ তুমি আমাকে মাংস না দিয়ে এসব দিয়ে মেহমানদারি করছ!) তিনি জানালেন, এটা সদকার মাংস আর আপনি তো সদকার কোনো খাবার গ্রহণ করেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এটা তোমার জন্য সদকা; কিন্তু (তুমি যখন আমাদের খাওয়াবে তখন) আমাদের জন্য তা হাদিয়া! (বোখারি : ৫২৭৯)।
এমন উদার মন নিয়ে সুপারিশ করাই আমাদের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) এর শিক্ষা। উপযুক্ত স্থানে, সামর্থ্য থাকলে সুপারিশ করতে হবে। কিন্তু এমনটা ভাবা যাবে না, আমার সুপারিশ গ্রহণ না করা আমাকে অপমান করার নামান্তর।
অবশ্য সুপারিশ গ্রহণ করতে যদি কোনো সংকট না থাকে, তাহলে যথাসম্ভব সুপারিশকারীর কথা গ্রহণ করা উচিত। কারণ সুপারিশ সাধারণত কোনো সম্পর্কের ভিত্তিতেই করা হয়। এ সম্পর্কের কারণে সুপারিশকারী আশায় থাকেÑ আমার সুপারিশ হয়তো সে গ্রহণ করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনÑ মানুষকে তাদের উপযুক্ত মর্যাদা দাও। (সুনানে আবু দাউদ : ৪৮৪৪)।
তাই একই বিষয়ের সুপারিশ যদি আগে-পরে দুই সময়ে দুজন করে, আর প্রথম সুপারিশকারীর তুলনায় দ্বিতীয় সুপারিশকারীর সঙ্গে সম্পর্ক অধিক ঘনিষ্ঠ হয়, কিংবা দ্বিতীয়জন অধিক সম্মানিত-সম্ভ্রান্ত কেউ হন, তাহলে প্রথমজনের সুপারিশ অগ্রাহ্য করার পরও দ্বিতীয়জনের সুপারিশ গ্রহণ করা যেতে পারে। সবার সঙ্গে একই আচরণ করতে হবে, একজনের সুপারিশ অগ্রাহ্য করার কারণে সবারটাই অগ্রাহ্য করতে হবেÑ এটা জরুরি নয়।
সুপারিশ যখন করা হবে, তখন যার কাছে সুপারিশ করা হচ্ছে তার বিষয়টিও যতেœর সঙ্গে লক্ষ রাখতে হবে। সুপারিশ একটি পরামর্শ, আর পরামর্শ প্রদান একটি আমানত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেনÑ যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হয়, সে তো আমানতদার। (জামে তিরমিজি : ২৮২৩)।
আর আমানতদারির দাবি হচ্ছে, তার কাছে সুচিন্তিতভাবে যেটা ভালো মনে হবে, সে সেভাবেই পরামর্শ দেবে। পরামর্শ দেওয়ার সময় কল্যাণকামিতার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা অপরিহার্য। কল্যাণকামী মানসিকতা ছাড়া সঠিক পরামর্শ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই কোনো অসহায় বা বিপদগ্রস্ত ব্যক্তির জন্যও যদি কারও কাছে সুপারিশ করতে হয়, সেখানেও লক্ষ রাখতে হবেÑ এ সুপারিশ রক্ষা করতে গিয়ে সে আবার বিপদে পড়ে কি না, তার কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করতে হয় কি না, তার নীতি ও নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে কি না, তাকে পরবর্তী সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে কি না, তার সম্মান-মর্যাদা ও চারিত্রিক শুদ্ধতা আক্রান্ত হয় কি না, আমার সুপারিশের মর্যাদা দিতে গিয়ে তাকে অনাকাক্সিক্ষত কোনো পরিস্থিতির শিকার হতে হয় কি না, তার ধনসম্পদ কিংবা দ্বীন-ধর্ম এতে আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় কি না। তাই চাকরি বা এ জাতীয় কোনো সুপারিশের ক্ষেত্রে প্রথমেই ভেবে নিতে হবেÑ যার জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে, সে এ পদের উপযুক্ত কি না, এ পদে সে নিযুক্ত হলে মালিকের কিংবা জনগণের জানমালের কোনো ক্ষতির আশঙ্কা আছে কি না। কারও জন্য আর্থিক সহযোগিতার সুপারিশ করতে হলেও যথাসম্ভব জেনে নিতে হবেÑ বাস্তবেই সে অভাবগ্রস্ত কি না, এমন সহযোগিতা পাওয়ার সে উপযুক্ত কি না।
এসব দিক যদি রক্ষিত হয়, তাহলে সুপারিশের মাধ্যমে উপকৃত হবে তিন পক্ষইÑ যার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে তার প্রয়োজন পূরণ হবে, সংকট কেটে যাবে; যার কাছে সুপারিশ করা হলো একটি ভালো কাজে কিংবা কোনো অভাবগ্রস্তকে সহযোগিতা করার মধ্য দিয়ে তিনিও একটি পুণ্যের কাজ করার সুযোগ পেলেন, উপযুক্ত ক্ষেত্রে সহযোগিতা করতে পারলেন, আর যিনি সুপারিশ করেছেন তিনি পাবেন সুপারিশের বিনিময়ে পরকালের মহাপুরস্কার, এমনকি হাদিসের ভাষ্য মোতাবেক এর ফল তিনি দুনিয়াতেও ভোগ করবেন।
এর বিপরীতে যদি সুপারিশ করার সময় এসব বিষয়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা না হয়, তাহলেও এর ফল ভোগ করতে হবে তিন পক্ষকেইÑ যার পক্ষে সুপারিশ করা হয়েছে, আর যার কাছে সুপারিশ করা হয়েছে হয়তো তাদের দুজনের একজন অন্যায়কারী আরেকজন অন্যায়ে সহযোগিতাকারী হবে কিংবা তাদের একজন হবে জালেম আরেকজন হবে মজলুম। আর সুপারিশকারী সর্বাবস্থায় হবেন অন্যায়ের পথ উন্মোচনকারী।
যোগ্য ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করার পরও যে সে অন্যায় করবে না, কারও কোনো ক্ষতি করবে না, ধোঁকা-প্রতারণার আশ্রয় নেবে নাÑ এ নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। আর এটা ভবিষ্যতের বিষয়, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তবে সুপারিশ করার সময় ব্যক্তির অতীত ও বর্তমানকে সামনে রেখেই করতে হবে। না হলে এর দায়ভার তো বহন করতে হবেই।
সুপারিশের মহান ফজিলত লাভ করতে হলে এসব মূলনীতি সামনে রেখেই সুপারিশ করতে হবে। অন্যথায় ধর্মীয় ও সামাজিকÑ উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি আমাদের আপদ হয়ে দাঁড়াবে। এ বিষয়ে তাই সচেতনতা ও সতর্কতার বিকল্প নেই।


ফেসবুকে আজহারীর আবেগঘন স্ট্যাটাস
দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারী। তার
বিস্তারিত
ইজতেমায় মুসল্লিদের ঢল, আখেরি মোনাজাত
বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের দ্বিতীয় দিন শনিবার। ফজর নামাজের পর
বিস্তারিত
যেমন কর্ম তেমন ফল
আল্লাহ তায়ালা গোটা সৃষ্টিলোককে খুব সুন্দরভাবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টির
বিস্তারিত
ছামুদ জাতির গল্প এবং আমাদের
আদ জাতির পতনের পর তামাম আরব উপদ্বীপে শৌর্যশালী জাতি হিসেবে
বিস্তারিত
অনুসরণীয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হজরত ফুলতলী
প্রত্যেক জাতি, গোত্র, সমাজ ও দেশে যুগে যুগে বহু ক্ষণজন্মা
বিস্তারিত
অসুস্থতায় হোক ঈমান বৃদ্ধি
প্রায় দুই মাস ধরে মায়ের অসুস্থতার পরিচর্যার জন্য ঢাকার আহ্ছানিয়া
বিস্তারিত