মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

শীতকালের তাৎপর্য ও বিধিবিধান

শরিয়তে বিধানের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কষ্ট বা প্রয়োজনের সময় মানুষের জন্য বিভিন্ন বিধানকে সহজ করে দেওয়া। কারণ শরিয়ত চায় না কারও কষ্ট হোক। মানুষ কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোক। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এবং ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি।’ (সূরা হজ : ৭৮)। তাই অসুস্থ ব্যক্তি অথবা সুস্থ, যার সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সে পানি ব্যবহার না করতে পারলে মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করতে পারবে। তেমনি অসুস্থ ব্যক্তি ব্যান্ডেজ ও কাপড়ের ওপরে মাসেহ করতে পারবে

দিনের পরিবর্তনে এবং অতীতের স্মৃতিতে রয়েছে শিক্ষা। আল্লাহ তায়ালা দিন ও রাতের পরিবর্তন ঘটান। এতে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য চিন্তার উপকরণ রয়েছে। (সূরা নুর : ৪৪)। 
দিন ও মাসের পরিবর্তন ঘটে। ঋতু ও বছর ঘুরে আসে। মানুষের আশা-প্রত্যাশার সমাপ্তি ঘটে। নির্ধারিত বয়স শেষ হয়ে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসে। ধীরে ধীরে পৃথিবীতে সব নিঃশেষ হয়ে যাবে। শুধু থাকবেন পালনকর্তা আল্লাহ তায়ালা। 
এই ঋতু ও সময়ের পালাবদলে এখন উপস্থিত শীতকাল। আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামকে নিশ্বাস নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘জাহান্নাম তার পালনকর্তার কাছে অভিযোগ করে বলেছে, আমার একাংশ অপরাংশকে খেয়ে ফেলেছে। তখন তার জন্য দুটি নিশ্বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি শীতে অপরটি গ্রীষ্মে। শীতের নিশ্বাসে তীব্র ঠান্ডা আর গ্রীষ্মের নিশ্বাস বিষাক্ত। (বোখারি ও মুসলিম)। 
ওমর (রা.) শীতকাল এলে তার প্রজাদের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। এই বলে তাদের কাছে ফরমান পাঠাতেন, ‘শীত এসেছে। সে অনেকটা শত্রুর মতো। তার জন্য উল, মোজা এবং জাওরাবের ব্যবস্থা গ্রহণ কর। উলকে নিজেদের প্রতীক, আর পোশাক বানিয়ে নাও। কারণ ঠান্ডা হচ্ছে শত্রু। দ্রুত সে প্রবেশ করে। বের হতে বিলম্ব করে।’ 
অতএব শীতে দুর্বল ও গরিবদের খবর নেওয়া প্রয়োজন। শীতে তাদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং শীতের কাপড় দিয়ে খোঁজখবর নেওয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রতিদান ও সওয়াবের প্রত্যাশা করা যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে মাল তোমরা ব্যয় কর, তা নিজ উপকারার্থেই কর। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যয় করো না। তোমরা যে অর্থ ব্যয় করবে, তার পুরস্কার পুরোপুরি পেয়ে যাবে এবং তোমাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না।’ (সূরা বাকারা : ২৭২)। 
সময় ও ঋতু নিয়ে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। এতে অনেক ভালো ও কল্যাণের দিক রয়েছে। অনেক প্রজ্ঞা ও জ্ঞান রয়েছে। যদি সারা বছর এক ঋতু হতো, তাহলে অন্য ঋতুর যে বৈশিষ্ট্য, তা বোঝা যেত না। যদি সবসময় গ্রীষ্মকাল হতো, তাহলে শীতের অনেক কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হতে হতো। আবার যদি সবটা সময় শীতাকাল হতো, তাহলে গ্রীষ্মের সব উপকার থেকে বঞ্চিত থাকতে হতো। এমনি যদি পুরোটা বসন্ত হতো বা পুরোটা শরৎ হতো। 
শীতকাল ইবাদতকারীদের জন্য বিরাট গনিমত। মোমিনদের বসন্তকাল। রাত অনেক বড়; তাই ভালোভাবে ঘুমিয়ে নেওয়া যায়। এরপর নামাজের জন্য বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। দিন অনেক ঠান্ডা ও ছোট হয়। তাই সহজে সিয়াম পালন করা যায়। কোরআনে এসেছেÑ ‘আল্লাহভীরুরা জান্নাতে ও প্রস্রবণে থাকবে। এই অবস্থায় যে, তারা গ্রহণ করবে, যা তাদের পালনকর্তা তাদের দেবেন। নিশ্চয়ই ইতোপূর্বে তারা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। তারা রাতে সামান্য অংশেই নিদ্রা যেত। রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমাপ্রার্থনা করত।’ (সূরা জারিয়াত : ১৫-১৯)। 
শীতকাল মোমিনের বসন্ত। আনুগত্যের বাগানে সে উপভোগ করতে পারে। ইবাদতের ময়দানে বিচরণ করতে পারে। নৈকট্যের বাগানে হৃদয়কে পবিত্র করতে পারে। কষ্ট কমে গেছে। দুর্বলতা আর ক্লান্তি দুরীভূত হয়ে গেছে। অতএব সিয়াম তাকে দুর্বল করতে পারে না। ঘুম আর তাহাজ্জুদের জন্য রাত ছোট হয়ে যায় না। আমের বিন মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শীতকালের সিয়াম হচ্ছে শীতল গনিমত।’ (আহমাদ, তিরমিজি)। 
রাতে নামাজ আদায় করা যায়, যা অত্যন্ত মূল্যবান ও সওয়াবের ইবাদত। আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বলেন, যখন রাসুল (সা.) মদিনায় এলেন, মানুষ তার কাছে ভিড় জমাতে লাগল। আমিও মানুষের সঙ্গে তাকে দেখতে এলাম। আমি তার চেহারা দেখে বুঝতে পারলাম এটা মিথ্যা নবীর চেহারা নয়। তিনি সর্বপ্রথম বলেছেন, হে মানুষ সকল! তোমরা সালামের প্রচার কর। খাবার প্রদান কর। মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন নামাজ আদায় কর। তাহলে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (আহমাদ, তিরমিজি)। 
শীতকালে রাত বড় হয়। দিন ছোট হয়। আল্লাহ তায়ালা রাতকে আবরণ, আর পোশাক বানিয়েছেন। ঘুমকে বানিয়েছেন আরামের। ‘তিনিই তো তোমাদের জন্য রাতকে করেছেন আবরণ, নিদ্রাকে বিশ্রাম এবং দিনকে করেছেন বাইরে গমনের জন্য।’ (সূরা ফুরকান : ৪৭)। রাত জাগার অভ্যাস একটি ভয়াবহ বদঅভ্যাস, যা উদ্যমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। উদাসীনতার কারণ হয়। কাজ ও উপার্জনে বাধা সৃষ্টি করে। সময়কে বিনষ্ট করে। আনুগত্য আর ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সর্বোপরি এটি সুন্নতের পরিপন্থি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তার আরও নিদর্শন, রাতে ও দিনে তোমাদের নিদ্রা এবং তাঁর কৃপা অন্বেষণ কর। নিশ্চয়ই এতে মনোযোগী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (সূরা রুম : ২৩)। 
রাসুল (সা.) এশার পূর্বে ঘুমানো খারাপ মনে করতেন। আর পরে কথা বলা অপছন্দ করতেন। অতএব সফলতা চাইলে নবীর আদর্শে আদর্শবান হতে হবে। 
ইসলাম জীবনের সার্বিক দিকের প্রতি লক্ষ রেখেছে। সময়ের আবর্তন-বিবর্তনের প্রতি খেয়াল রেখেছে। অতএব আবশ্যিক বিধান যেমন দিয়েছে, তেমনি প্রয়োজনে সুযোগ ও ছাড়ও দিয়েছে। পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে গোনাহ মাফ হয়। সওয়াব ও প্রতিদান প্রত্যাশা করা যায়। অতএব শীতের সময় পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করলে গোনাহ মাফ হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের গোনাহ মাফ হয়, এমন আমলের কথা বলব না?’ সাহাবায়ে কেরাম বললেন, অবশ্যই ইয়া রাসুলাল্লাহ। তখন তিনি বললেন, ‘কষ্টের সময় (অর্থাৎ ঠান্ডার সময়) সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে অজু করা।...’ (মুসলিম)। 
শরিয়তে বিধানের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, কষ্ট বা প্রয়োজনের সময় মানুষের জন্য বিভিন্ন বিধানকে সহজ করে দেওয়া। কারণ শরিয়ত চায় না কারও কষ্ট হোক। মানুষ কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোক। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এবং ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা রাখেননি।’ (সূরা হজ : ৭৮)। তাই অসুস্থ ব্যক্তি অথবা সুস্থ, যার সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সে পানি ব্যবহার না করতে পারলে মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করতে পারবে। তেমনি অসুস্থ ব্যক্তি ব্যান্ডেজ ও কাপড়ের ওপরে মাসেহ করতে পারবে। 

৯ রবিউস সানি ১৪৪১ হিজরি মদিনার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ মুহিউদ্দীন ফারুকী


ফেসবুকে আজহারীর আবেগঘন স্ট্যাটাস
দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা ড. মিজানুর রহমান আজহারী। তার
বিস্তারিত
ইজতেমায় মুসল্লিদের ঢল, আখেরি মোনাজাত
বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের দ্বিতীয় দিন শনিবার। ফজর নামাজের পর
বিস্তারিত
যেমন কর্ম তেমন ফল
আল্লাহ তায়ালা গোটা সৃষ্টিলোককে খুব সুন্দরভাবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টির
বিস্তারিত
ছামুদ জাতির গল্প এবং আমাদের
আদ জাতির পতনের পর তামাম আরব উপদ্বীপে শৌর্যশালী জাতি হিসেবে
বিস্তারিত
অনুসরণীয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হজরত ফুলতলী
প্রত্যেক জাতি, গোত্র, সমাজ ও দেশে যুগে যুগে বহু ক্ষণজন্মা
বিস্তারিত
অসুস্থতায় হোক ঈমান বৃদ্ধি
প্রায় দুই মাস ধরে মায়ের অসুস্থতার পরিচর্যার জন্য ঢাকার আহ্ছানিয়া
বিস্তারিত