অসুস্থতায় হোক ঈমান বৃদ্ধি

প্রায় দুই মাস ধরে মায়ের অসুস্থতার পরিচর্যার জন্য ঢাকার আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার ও জেনারেল হাসপাতাল যেন একটি সেকেন্ড হোমে পরিণত হয়েছে। সংগত কারণেই নানা বয়সের অনেক শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধবনিতাকে কঠিন কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে দেখেছি। দেখেছি ছোট্ট একটি বাচ্চা কীভাবে তার মাকে বিচক্ষণ ব্যক্তির মতো সান্ত্বÍনার বাণী শোনায়। প্রকৃতপক্ষে হাসপাতালে এলে ঈমান যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি মানুষের মনোবল ও দৃঢ়তা আকাশচুম্বী হয়। মায়ের বেডে কাতরানো আর রোগীদের অসহায়ত্ব দেখে নিজেকে সংবরণ করা নিতান্তই কঠিন। অজান্তেই মনটা আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও নবীদের কাহিনির দিকে প্রসারিত হয়ে যায়। হাসপাতালের নানা চিত্র দেখে স্মৃতিপটে নবী-রাসুলদের যে চিত্রগুলো ভাসে, সেটিরই অংশ বিশেষ কলমের পরশে আপনাদের সামনে উপস্থাপনের প্রয়াস মাত্র।
অসুস্থ শব্দটির আরবি শব্দ হলো ‘মারাদুন’ বা ‘সাকিম’। কোরআনে এ অসুস্থতাকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ক. আত্মার ব্যাধি। খ. শারীরিক ব্যাধি। আমার হাসপাতালের অভিজ্ঞতা ও আলোচনার বিষয় হচ্ছে শারীরিক ব্যাধি নিয়ে। মহান আল্লাহ বলেনÑ ‘এবং অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি এবং ফলফসল বিনষ্টের মাধমে; তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।’ (সূরা বাকারা : ১৫৫)। এ আয়াতে জানের ক্ষতি দ্বারা অসুস্থতা ও মৃত্যুকে বোঝানো হয়েছে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাস্বরূপ আসে এবং এখানে উত্তমরূপে ধৈর্যধারণ করলে আল্লাহ এর মাধ্যমে আমাদের কৃত পাপগুলো মোচন করে দেন। অসুস্থতা এবং ধৈর্য কেমন হতে পারে তার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করতে আইয়ুব (আ.) এর অসুস্থতা ও তার ধৈর্যের অনুপম বিষয়টি তুলে ধরতে চাই। আইয়ুব (আ.) কে আল্লাহ তায়ালা প্রথম দিকে অনেক ধনসম্পদ, বাহন, সন্তান-সন্ততি ও চাকর-নওকর দান করেছিলেন। এর দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পর ৭০ বছর বয়সে তার নবীসুলভ পরীক্ষা শুরু হয়। আর আল্লাহর নবীরা সবচেয়ে কঠিন বিপদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন হন। এরপর পর্যায়ক্রমে হতে শুরু করেন অন্যরা। তিনি কুষ্ঠের মতো এক ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন, ক্রমেই তার সব সম্পদ একে একে হাতছাড়া হতে শুরু করে। এ রোগে তার হৃদয় ও জিহ্বা ব্যতীত শরীরের সব অঙ্গে পচন ধরে। সন্তানরা তাকে ছেড়ে চলে যায়, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীরা তাকে আলাদা করে লোকালয়ের বাইরে একটি আবর্জনা ফেলার জায়গায় তাকে রেখে আসে। তখন তার প্রিয়তমা স্ত্রী লাইয়্যা বিনতে মেশা ইবনে ইউসুফ (তিনি ছিলেন ইউসুফ (আ.) এর কন্যা বা পৌত্রী) ছাড়া কেউ তার পরিচর্যার জন্য এগিয়ে আসেনি। আইয়ুব (আ.) এর সম্পত্তি বিলীন হয়ে যাওয়ায় তার স্ত্রী পরিশ্রম করে পানাহার ও প্রয়োজনীয় দ্রব্য সংগ্রহ করে স্বামীয় সেবায় হাজির হতেন। এভাবে আল্লাহর পরীক্ষা সাত বছর কয়েক মাস চলমান থাকল। সব সম্পদ, সন্তান, ক্ষমতা, বীরত্ব সবকিছু হারিয়ে তিনি যেন আরও বেশি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘হে আমার পালনকর্তা! আমি তোমার শোকর আদায় করি এ কারণে যে, তুমি আমাকে সহায়-সম্পত্তি ও সন্তান দান করেছ। এদের ভালোবাসা আমার অন্তরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এরপর এ কারণেও শোকর আদায় করি যে, তুমি আমাকে এসব বস্তু থেকে মুক্তি দিয়েছ। এখন আমার আর তোমার মধ্যে কোনো অন্তরায় নেই।’ তার সহিষ্ণুতা, ধৈর্য কত গভীর ছিল, এ ঘটনা থেকে তা সহজেই অনুমেয়। তার মধ্যে অসুস্থতার ব্যাপারে কারও প্রতি কোনো অভিযোগ ও অস্থিরতা ছিল না। একদা তার স্ত্রী তাকে আরজ করলেন যে, আপনার অনেক কষ্ট বেড়ে গেছে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। তিনি জবাবে বললেন আল্লাহ ৭০ বছর সুস্থ ও নিরোগ অবস্থায় আমাকে অনেক নেয়ামত ও দৌলতের মধ্যে দিনাতিপাত করিয়েছেন। তার বিপরীতে মাত্র সাত বছর কষ্ট বহন করা আমার জন্য কঠিন হবে কেন? তার সহিষ্ণুতা, দৃঢ়তার ফলে তিনি দোয়া করারও সাহস পেতেন না। এটি এজন্য যে, কোথাও যেন সবরের পরিপন্থি না হয়ে যায়। আসলে আল্লাহর কাছে চাওয়া তো অধৈর্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ আল্লাহর কাছে চাওয়াটাই আল্লাহ বেশি পছন্দ করেন। অবশেষে তিনি মহান রবের কাছে দোয়া করলেন, আর আল্লাহর কাছে তা এতটাই প্রিয় হলো যে, তিনি তা পবিত্র কোরআনে সংযুক্ত করে দিলেন ‘এবং স্মরণ করুন আইয়ুব (আ.) এর কথা, যখন তিনি তার পালনকর্তাকে আহ্বান করে বলেছিলেনÑ আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি এবং আপনি দয়াবানের চেয়েও সর্বশ্রেষ্ঠ দয়াবান।’ (সূরা আম্বিয়া : ৮৩)। অন্য এক দোয়ায় বলেছিলেন ‘শয়তান আমাকে কষ্ট ও যন্ত্রণা পৌঁছিয়েছে।’ (সূরা সোয়দ : ৪১)। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করে তাকে আগের সব সম্পত্তি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এবং আগের চেয়ে দ্বিগুণ সন্তান-সন্ততি তাকে পুরস্কারস্বরূপ দান করেছিলেন। আর আল্লাহ নিজে তার ধৈর্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন এই বলে যে, ‘নিশ্চয়ই আমি তাকে (আইয়ুব আ.) পেলাম সবরকারী ও চমৎকার বান্দা হিসেবে।’ (সূরা সোয়দ : ৪৪)। 
আলোচ্য ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। এ ঘটনার মাধ্যমে আমরা যারা সুস্থ রয়েছি, এ সুস্থতাকে নেয়ামত মনে করে অসুস্থ হওয়ার আগে এ বিষয়গুলো মাথায় স্থান দেওয়া চাই। কেননা অসুস্থতা আল্লাহর পক্ষ থেকে যেমন পরীক্ষা, তেমনি বান্দার ক্ষমা পাওয়ারও একটি মোক্ষম সময়। তাই অসুস্থতার সময় রোগীদের আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা চাইতে হবে এবং হজরত ইবরাহিম (আ.) এর এ দোয়ার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে, যা কোরআনেও স্থান পেয়েছে। ‘যখন আমি রোগাক্রান্ত হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।’ (সূরা শুআরা : ৮০)। এ বিশ্বাস অটল রেখে এবং আইয়ুব (আ.) এর ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমরাও যদি ধৈর্যের সঙ্গে আদব রক্ষা করে মহান রবের কাছে যাচনা করি আজও তিনি আমাদের তাঁর অফুরন্ত নেয়ামত থেকে অঢেল পরিমাণ করুণা দান করবেন ইনশাআল্লাহ। তবে কয়েকটি সতর্কতার বিষয় না বললেই নয়। শারীরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সময় শয়তান সুযোগে মানুষকে ঈমান বৃদ্ধির বিপরীতে কুফরি বৃদ্ধি করার প্রয়াস চালাতে থাকে। ফলে সতর্ক থাকতে হবে এ সময়গুলোতে। রোগমুক্তিতে কয়েকটি বিষয়ে সজাগ থাকা আবশ্যক বলে মনে করি। যেমন ১. গোপনে বেশি বেশি সদকা করা। ২. নিজের যাবতীয় অন্যায়কে স্বীকার করে লজ্জিত হওয়া, বেশি করে তওবা-ইস্তেগফার পড়া এবং পুনরায় সে অন্যায় না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা (এ তিনের সমন্বয়েই তওবা হয়। শুধু আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ার দ্বারা তওবা হয় না)। ৩. সবার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা এবং মানুষকে অন্তর থেকে ক্ষমা করে দেওয়া। ৪. এ বিশ্বাস মনে-প্রাণে রাখা যে, আল্লাহর সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো অর্থসম্পদ, অট্টালিকা, সন্তান-সন্ততি কাউকে আরোগ্য দিতে পারবে না। তাই আল্লাহর রহমত পাওয়ার আশায় নিজেকে বিনয়ী রাখা। ৫. ক্রোধ নিবৃত করা। কারণ ক্রোধের সময় শয়তান মানুষের সবচেয়ে কাছে আগমন করে এবং অনেক বড় বড় অন্যায় করতে সাহায্য করে। 
আইয়ুব (আ.) এর এ রোগ থেকে আরোগ্য লাভের জন্য শয়তান আইয়ুব (আ.) এর স্ত্রীকেও কুমন্ত্রণা দিতে ছাড়েনি। শয়তান এ বলে ধোঁকা দিল যে, আমি আইয়ুব (আ.) এর রোগ ভালো করে দেব; তবে তুমি তাকে এ কথা স্বীকার করতে বলবে যে, আমিই তাঁর আরোগ্যদাতা। স্ত্রী রাজি হয়ে আইয়ুব (আ.) এর কাছে এ কথা পেশ করলে তার এ আবেগ নবীর দৃঢ়তা ও রবের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের সামনে ধোপে টিকেনি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে নিলেন, এটি শয়তানের পক্ষ থেকে শিরক করানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন।
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে সচেতনতা অর্জন করে আল্লাহ আমার মা-বাবাসহ আমাদের ছোট্ট ও সবুজ-শ্যামল এ দেশের সবাইকে সব ধরনের রোগ-ব্যাধি থেকে আরোগ্য দান করে পরিবারের মুখে প্রখর আলো বিচ্ছুরিত করার এবং পরিপূর্ণ ঈমানদীপ্ত জীবনের রশ্মি ও ভালোবাসার মসৃণ চাদরে পরিবারের সবাইকে আবৃত করে রাখার তৌফিক দিন। মায়ের অসুস্থতার এ কঠিন সময়ে রাজশাহীর প্যারামাউন্ট স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে সার্বিকভাবে যে সহায়তা করে যচ্ছেন, আল্লাহ দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের কল্যাণ ও মঙ্গল করুন। সব পাঠকের কাছে আমার এ দোয়ার আরজ রেখেই আজকের সমাপ্তি টানছি।

লেখক : এমফিল গবেষক, আরবি বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মাতৃভাষার নেয়ামত ছড়িয়ে পড়ুক
ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিরাট একটি দান। ভাষার রয়েছে প্রচ- শক্তি;
বিস্তারিত
ন তু ন প্র
বই : আল-কুরআনে শিল্পায়নের ধারণা লেখক : ইসমাঈল হোসাইন মুফিজী প্রচ্ছদ :
বিস্তারিত
উম্মতে মুহাম্মদির মর্যাদা
আল্লাহ তায়ালা যে বিষয়কে আমাদের জন্য পূর্ণতা দিয়েছেন, যে বিষয়টিকে
বিস্তারিত
যেভাবে সন্তানকে নামাজি বানাবেন
হাদিসে এরশাদ হয়েছে ‘তোমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আর
বিস্তারিত
আবু বাকরা (রা.)
নোফায় বিন হারেস বিন কালাদা সাকাফি (রা.)। তার উপনাম আবু
বিস্তারিত
মাটি আল্লাহ প্রদত্ত মূল্যবান সম্পদ
মাটি মানবজাতির বসবাসের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মাটি বলতে ভূতল, পৃথিবীর
বিস্তারিত