বাউল গানের নামে অপব্যাখ্যা কাম্য নয়

যে কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে হলে প্রথমে ওই বিষয়ে পরিপূর্ণ না হলেও ন্যূনতম জ্ঞান থাকা চাই। কিন্তু ইদানীং দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তি বা মহল ইসলাম সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান অর্জন না করে অনায়াসে ইচ্ছামতো মন্তব্য বা ব্যাখ্যা প্রদান করে যাচ্ছেন। অথচ মনগড়া কথাই হলো মিথ্যা কথা। নবীজি (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘মিথ্যা সব পাপের মূল।’ এমনই একজন ইসলামের ভুল ব্যাখ্যাকারী শরিয়ত বয়াতি নামের এক ভেকধারী বয়াত গানের অনুষ্ঠানে ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে গান গেয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মামলায় গ্রেপ্তার হন। গেল ৯ জানুয়ারি শরিয়ত বয়াতির বিরুদ্ধে ধর্মীয় নিরাপত্তা আইন-২০১৮ ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। 
উল্লেখ্য, গেল ২৪ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার ধামরাই উপজেলার রৌহাট্রেক এলাকায় অবস্থিত হেলাল শাহ পীরের দশম বার্ষিক পালাগানের অনুষ্ঠানে শরিয়ত বয়াতি ইসলাম ধর্ম ও নবী-রাসুল নিয়ে বিকৃত, ধৃষ্টতাপূর্ণ ও শরিয়তবিরোধী ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে গান গান। তিনি বলেন, নবীই আল্লাহ। আল্লাহই নবী। গুরুর চরণে সেজদা করতে হবে। আল্লাহকে সেজদা করার প্রয়োজন নেই। যে পীর ধরে না, সে মুসলমান নয়। এভাবেই পালাগানের মধ্যে শরিয়ত বয়াতি আল্লাহ, রাসুল, ইসলাম, কোরআন ও হাদিসের বিরুদ্ধে এমন আরও অনেক কথা বলার পাশাপাশি অকথ্য অশালীন বক্তব্য প্রদান করেন। (সূত্র : ইনকিলাব, ২৩ জানুয়ারি ২০২০)।
কিন্তু একটি বিশেষ মহল শরিয়ত বয়াতির ইসলামবিরোধী কুরুচিপূর্ণ কথাগুলোকে পাশ কাটিয়ে ইসলামে গানের বৈধতা আছে কি নেই এমন বিষয়ের আলোচনা টেনে এনে তার অপব্যাখ্যাগুলো ঢাকতে উঠেপড়ে লেগেছে। শর্তসাপেক্ষে গানের বৈধতা ইসলামে আছে, তা ইসলাম সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখেন এমন কারোরই অজানা থাকার কথা নয়। এখানে গানের বৈধতা-অবৈধতা নিয়ে প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, শরিয়ত বয়াতির ইসলাম সম্পর্কে অপব্যাখ্যা। অনেকে আবার বাকস্বাধীনতার কথা তুলে শরিয়ত বয়াতির ইসলামবিরোধী বক্তব্যের পক্ষাবলম্বন করে মূলত ইসলামের বিরুদ্ধাচারণ করছেন কি না তা ভেবে দেখা দরকার। বাকস্বাধীনতা থাকবে। ইসলাম বাকস্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার বিরোধী নয়। কিন্তু বাকস্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার নাম করে ধর্মীয় অবমাননা, তা বাকস্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার মধ্যে পড়ে কি না, ভাববার বিষয়। 
বুধবার সন্ধ্যায় শরিয়ত বয়াতির গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অপরাধ করেছে বলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 
কেউ বয়াতি গান গাইলে সে অপরাধ করলেও কি তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে না? বয়াতিরা কি অপরাধ করতে পারে না? অপরাধ যে-ই করবে, আইন নিজের গতিতে তাকে পাকড়াও করবে। এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে একটি দেশের আইনের শাসন ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য পদক্ষেপ। তিনি সঠিক সময়ে, সঠিক জায়গায়, সঠিক কথাটি বলেছেন। 
গান বৈধ কি বৈধ নয়, এমন বিষয় টেনে এনে যারা শরিয়ত বয়াতির পক্ষে সাফাই গাইতে চাইছেন তাদের মনে রাখা দরকার, সত্য-মিথ্যা তালগোল পাকিয়ে ফেলে মূর্খতাকে প্রশ্রয় দেওয়া নিঃসন্দেহে নীতি-নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। অনেক বাউল নিঃসন্দেহে মননশীলতা, সৌন্দর্য ও আত্মশুদ্ধির কথা তুলে ধরেন। শরিয়ত বয়াতি যে বক্তব্য প্রদান করেছেন তা বাউল গানের অংশ নয়। এগুলো তার নিজস্ব ব্যাখ্যা। তাই এখানে শরিয়ত বয়াতির ইসলামের অপব্যাখ্যার প্রশ্নে বাউল গানের প্রসঙ্গ টেনে এনে দুটি বিষয়কে তালগোল পাকানো মূর্খতা নাকি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা, সে বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। 
ইসলামে অশ্লীল গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ। অশ্লীল গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ও ইসলামি গান এক কথা নয়। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য লাহওয়াল-হাদিস (বেহুদা কথা) খরিদ করে। আর তারা ওইগুলোকে হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে।’ (সূরা লুকমান : ৬)। এ আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি লাহওয়াল-হাদিস অবলম্বন করে সে দোজখের কঠিন শাস্তি প্রাপ্ত হবে। কাজেই তা হারাম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, লাহুওয়াল-হাদিস কী? উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় তাফসিরে ইবনে কাসির অষ্টম খণ্ড ৩-৪ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, এর অর্থ সংগীত বা গানবাজনা। বেশিরভাগ তাফসিরকারক লাহওয়াল-হাদিস বলতে গানকে বুঝিয়েছেন। বিখ্যাত মুফাসসির-সাহাবি ইবনে মাসউদ বলেন, এটি গান। ইমাম হাসান বসরি বলেন, এটি গান ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে নাজিল হয়েছে। 
অন্যদিকে ইসলামে বৈধ গানের উদাহরণ হচ্ছে, যখন রাসুল (সা.) সাহাবিদের নিয়ে খন্দক (গর্ত) খনন করছিলেন তখন ইবনে রাওয়াহা (রা.) এ গান গেয়েছিলেন, ‘আল্লাহর কসম যদি আল্লাহ না থাকতেন, তাহলে আমরা হেদায়েত পেতাম না। সিয়াম পালন করতাম না। আর সালাতও আদায় করতাম না। তাই আমাদের ওপর সাকিনা (শান্তি) নাজিল করুন। আর যখন শত্রুদের মোকাবিলা করব তখন আমাদের মজবুত রাখুন। মুশরিকরা আমাদের ওপর আক্রমণ করেছে, আর যদি তারা কোনো ফিতনা সৃষ্টি করে তবে আমরা তা ঠেকাবই।’ (বোখারি)।

লেখক : শাইখুল হাদিস, জামিয়া আরাবিয়া শামসুল উলুম (কারবালা মাদ্রাসা), বগুড়া


আল্লাহর ভয় এবং এর প্রভাব
এ জন্য দরকার হৃদয়কে আল্লাহর ভালোবাসায় গড়ে তোলা। আল্লাহর উলুহিয়্যাহ
বিস্তারিত
বৈষম্যহীনতা ইসলামের সৌন্দর্য
বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান মোটিভেশনার বক্তার একটি ছবি সম্প্রতি ফেইসবুকে ভাইরাল
বিস্তারিত
ভালোবাসা আছে দিবস নেই
প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও ভক্তি-শ্রদ্ধা মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। এসব মানবিক গুণ
বিস্তারিত
আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা ও
শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করা আলোকপ্রাপ্ত বিবেক ও বুদ্ধির কাজ।
বিস্তারিত
কবি সাহাবি আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা
আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.) এর উপনাম আবু মুহাম্মদ, আবু রাওয়াহা।
বিস্তারিত
সম্পর্ক আবেগ নয় বিবেক দিয়ে
সৃষ্টিলগ্ন থেকেই পুরুষ নারীর প্রতি আকর্ষিত। এ আকর্ষণের অন্যতম অনুঘটক
বিস্তারিত