কবি সাহাবি আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.)

প্রাণের নবীজি (সা.) এর সোনার মদিনায় উহুদ পাহাড়ের রাতের দৃশ্য। গেল পরশু ড্রোন ক্যামেরায় ধারণ করা হারামাইন কর্তৃপক্ষের পেইজে পোস্ট করা ছবি

আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা.) এর উপনাম আবু মুহাম্মদ, আবু রাওয়াহা। তিনি মদিনার খাজরাজ সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেন। আবু দারদা (রা.) তার বৈপিত্রেয় ভাই। নোমান বিন বশির (রা.) তার ভাগ্নে। 
তিনি ছিলেন বদরি সাহাবি, সৎসাহসী, বীরপুরুষ, সত্যবাদী, কবি, সুন্দর হস্তাক্ষরের অধিকারী। মক্কা বিজয়ের আগে সব যুদ্ধে তিনি শরিক ছিলেন। বিভিন্ন সময় কবিতার মাধ্যমে তিনি নবীর পক্ষে যুক্তিতর্ক পেশ করতেন।
সাহাবিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে বলতেন, আসো, একটু সময় ঈমানের আলোচনা করি। একদিন তিনি কাঁদছিলেন। তার কান্না দেখে স্ত্রীর চোখে পানি এসে গেল। তিনিও কাঁদতে লাগলেন। ইবনে রাওয়াহা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কাঁদছ কেন? স্ত্রী বললেন, আপনাকে কাঁদতে দেখে আমি কাঁদছি। তিনি বললেন, আমি তো কাঁদছি প্রভুর এ বাণী স্মরণ হওয়ার কারণে, ‘তোমাদের প্রত্যেকে পুলসিরাতের ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে।’ (সূরা মরিয়ম : ৭১)। তিনি বললেন, সবাইকে পুলসিরাত অতিক্রম করতে হবে। অথচ আমি জানি না, তা পার হতে পারব কি না। (মুস্তাদরাক হাকেম : ৮৭৪৮)।
৮ হিজরিতে রোমানদের বিরুদ্ধে মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে গমনের প্রাক্কালে সাধারণ মুসলমানরা তাদের সেনাদের আশীর্বাদ করছিল। তখনও ইবনে রাওয়াহা ওই আয়াত স্মরণ করে কাঁদছিলেন।
লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, আপনি কেন কাঁদছেন হে ইবনে রাওয়াহা? তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহর শপথ, দুনিয়ার মোহ, আত্মীয়তার সম্পর্ক অথবা যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ বিসর্জনের ভয়ে আমি কাঁদছি না। আমি তো কাঁদছি পুলসিরাত পারাপারের কথা স্মরণ করে। জানি না তা থেকে মুক্তি পাব কি না। এরপর উপস্থিত লোকজন সবাইকে আশ্বস্ত করে বলল, আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে আছেন। তিনি তোমাদের রক্ষা করবেন। সুস্থতার সঙ্গে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন। আশীর্বাদকারীদের কথা শুনে ইবনে রাওয়াহা বললেনÑ 
[কবিতার অর্থ] কিন্তু আমি দয়াময়ের কাছে প্রার্থনা করছি তার ক্ষমা এবং এমন প্রচ- আঘাত, যা রক্তের ফিনকিতে ফেনা তুলবে। অথবা আমি কামনা করছি অপ্রতিরোধ্য কোনো বাহাদুরের বর্শাঘাত, যা নাড়িভুঁড়ি ও কলিজা বিদীর্ণ করে ফেলবে। ফলে আমার পাশ দিয়ে অতিক্রমকারীরা বলবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ‘গাজী’ না বানিয়ে চিরসফলতার পথ দেখিয়েছেন। এরপর তিন হাজার সৈন্যের মুসলিম কাফেলা মুতা অঞ্চলের দিকে রওনা হলো।
মুতায় পৌঁছে রোমান সৈন্যসংখ্যা দুই লাখের কথা শুনে মুসলমানরা কিছুটা ঘাবড়ে গেল। এমনকি যুদ্ধ শুরুর আগেই কারও কারও পক্ষ থেকে নবীজিকে বিষয়টি জানানোর জন্য প্রস্তাব উঠল। এমন সময় আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা সবার সামনে অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা দিলেন।
‘হে বীরপুরুষরা, তোমরা তো শাহাদতের তামান্না নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছ। এখন কেন ওই শাহাদত বরণে ভয় পাচ্ছ? মুসলমানরা কখনও শত্রুদের সংখ্যা, শক্তি ও ক্ষমতা দেখে যুদ্ধ করে না। বরং তারা সব সময় আল্লাহর দ্বীনের জন্য যুদ্ধ করে। কারণ, এই দ্বীন আমাদের সম্মানিত করেছে। কাজেই চলো, রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ো। আর দুই কল্যাণের একটি অর্জন করো। হয়তো বিজয়, নয়তো শাহাদত।’
সবাই তাঁর কথা শুনে সমস্বরে বলে উঠল ‘ইবনে রাওয়াহা ঠিক বলেছে।’
এই যুদ্ধে তিনি ছিলেন মুসলমানদের তৃতীয় সেনাপতি। তার শাহাদতের পর খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা.) সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যখন জায়েদ বিন হারেসার পরে জাফর (রা.) শহীদ হলেন, লোকেরা ডাকাডাকি শুরু করল, ‘হে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা, হে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা।’
তখন আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা তিনদিন অভুক্ত থাকার পর উটের একটা সিনার হাড় নিয়ে চাবাচ্ছিলেন। তিনি সেটি ফেলে দিয়ে বললেন, ‘তোর সম্পর্ক দুনিয়ার সঙ্গে।’ অতঃপর তিনি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। প্রথমে তার একটা আঙুল আক্রান্ত হলো। তিনি আবেগের সঙ্গে কবিতা আবৃত্তি শুরু করলেন
[কবিতার অর্থ] তুমি একটা মাত্র আঙুল, রক্তে রঞ্জিত, আল্লাহর পথে কী প্রতিদান আছে, তুমি কি জানো? হে প্রাণ, তুমি শহীদ হবে; না হলে তো মরবে নিশ্চয়ই মৃত্যুর উত্তপ্ত হাউজে। মনের কামনাবাসনা তোমার চোখের সামনে। তুমি ভাগ্যবান যদি জায়েদ ও জাফরের পথ ধরো। নতুবা হতভাগা তুমি, চরম হতভাগা।
সেনাপতির দায়িত্ব নিতে তার মনের ভেতর কিছুটা পিছুটান উপলব্ধি হলো। তিনি অস্বস্তি ও বিব্রতবোধ করলেন। সংকোচ কাটিয়ে উঠতে নিজেকে সম্বোধন করে বললেন, প্রাণ, তুমি কীসের প্রতি আকাক্সক্ষী? স্ত্রীর প্রতি? তাহলে সে তিন তালাক। দাসদাসীর প্রতি? তাহলে তারা আজাদ। বাগবাগিচার প্রতি? তাহলে সেগুলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পথে উৎসর্গ।
এরপর কবিতা আবৃত্তি করলেন
[অর্থ] আল্লাহর কসম করে বলছি হে আমার প্রাণ, তুমি স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এখন রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য। এতদিন তুমি আশান্বিত ছিলে। তাহলে এখন কেন তুমি জান্নাতকে অপছন্দ করছ?
এরপর তিনি শত্রুবূহ্যে ঢুকে পড়লেন। যুদ্ধ করতে করতে শাহাদতের অমীয় সুধা পান করলেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/১৯৪, হিলইয়াতুল আউলিয়া : ১/১১৯, সিরাতে ইবনে হিশাম : ২/৩৭৩, তারিখে দিমাশক : ২৮/১২৬)।

লেখক : ইমাম ও খতিব, টঙ্গী রেলওয়ে স্টেশন পুরাতন জামে মসজিদ


প্রাণীর প্রতি নবীজির মমতা
‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া :
বিস্তারিত
স্রষ্টাকে খুঁজি সাগরের বিশালতায়
বিশাল জলরাশির উত্তাল তরঙ্গমালায় প্রবাহিত সমুদ্র আল্লাহর এক অপূর্ব সৃষ্টি।
বিস্তারিত
দুধপানের উপকারিতা
দুধের পুষ্টিগুণ বিচারে এটি মহান আল্লাহ তায়ালার বড় একটি নেয়ামত।
বিস্তারিত
পবিত্র শবে মেরাজ ২২ মার্চ
বাংলাদেশের আকাশে সোমবার রজব মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। বুধবার থেকে
বিস্তারিত
পবিত্র শবে মেরাজ কবে, জানা
১৪৪১ হিজরি সনের পবিত্র শবে মেরাজের তারিখ নির্ধারণ এবং রজব
বিস্তারিত
মাতৃভাষার নেয়ামত ছড়িয়ে পড়ুক
ভাষা আল্লাহ তায়ালার বিরাট একটি দান। ভাষার রয়েছে প্রচ- শক্তি;
বিস্তারিত