এক এমপির ধান কাটার সেলফি এবং আরেক এমপির মানবিকতার ফুলকি!

আমাদের সমাজে ভালো মন্দ দুটি শব্দ রয়েছে। এ দুটি শব্দের সাথে আমরা সকলেই পরিচিত এবং এর শাব্দিক অর্থও আমরা সহজেই বুঝি। ভালো কাজকে ভালো বলা, আর খারাপ কাজকে কালো মন্দ বলা। এ সমাজে অনেকেই ভালো কাজ করে প্রসংশা কুড়িয়েছেন বা কুড়াচ্ছেন, অপরদিকে অনেকে খারাপ কাজ করে দুর্ণাম বা ধিক্কার নিচ্ছেন। আর এ দুটো  কাজই মানুষের দ্বারাই ঘটে আর তারাই রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। আরও একটি কথা, এ সমাজে অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবেই ভালো কাজ করতে চেষ্টা করে বা করে, আবার কিছু সংখ্যক মানুষ  রয়েছে নিজের স্বার্থের জন্য লোক দেখানো কাজ করে থাকেন। এ দুটো কাজও মানুষের দ্বারাই হয়।

গত কয়েকদিন ধরে সারা বিশ্বে চলছে মহামারি করোনা ধ্বংসযজ্ঞ। আর এ ধ্বংসযজ্ঞ আর প্রাণহানি থেকে রেহাই নেই বাংলাদেশও। প্রতিদিনই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে, আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ মানুষ। ঠিক এমন মুহুর্তে আমাদের একজন এমপি ধান কেটে সেলফি তুলে হয়েছে সমালোচিত। গত কয়েকদিন ধরে ওই এমপির ধান কাটা নিয়ে বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে লিড নিউজও হয়েছে। সমালোচনার ঝড় বইছে সামাজিকযোগযোগ মাধ্যমেও। ঠিক এমন মুহুর্তে আরেক এমপি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যূ হওয়া এক পুলিশ কর্মকর্তার জানাজা পড়িয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এই দুজন এমপিকে এক সাথে করলে যেমন মানুষ হয়েও দেখতে ভিন্নতা রয়েছে তেমনি তাদের কার্যকলাপও ভিন্নতা রয়েছে। ভালো আর মন্দ। একজন এমপি ধান কেটে হয়েছেন সমালোচিত অন্যজন করোনায় মৃত্যূ এক পুলিশ কর্মকর্তার জানাজা পড়ে হয়েছেন প্রসংশিত।

প্রথমেই বলছি টাঙ্গালাইলের কথা। তবে আর আগে একটি কথা না বললেই নয়। আমরা একটি কথার সাথে পরিচিত সেটি হলো একই জিনিস সব সময় ভালো লাগেনা। প্রথমে ছাত্রলীগের এবং কৃষক লীগের ধান কাটা প্রশংসা কুড়িয়েছিল। তার দেখাদেখি টাঙ্গাইলের কৃষকের ধান কাটতে সাংসদ ছোট মণি নিজেই নেমেছিলেন। মনে করেছিলেন কয়েকটি গোছা কেটেই প্রশংসা কুড়াবেন। আসলে সব কাজ সকলের দ্বারা মানায়না এটাও যেমন সঠিক তেমনি কৃষক ছাড়া কৃষি কাজ এবং ধান কাটাও মানায়না। আর তাতে আসল কাজতো হয় ই না বরং ক্ষতি হয়।

ঠিক তেমনি এমপি ছোট মণি কয়েকটি গোছা কেটে সেলফি তুলে মিডিয়ায় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসতে পারলেও প্রশংসনীয় হতে পারেনি বরং সমালোচিত হয়েছেন। শুধু সমালোচনাই নয় কৃষকের কাঁচা ধান কেটে বিতর্ক তৈরী করেছেন তিনি। আমরা স্বাভাবিকভাবেই বুঝতে পারি একজন নারীর দ্বারা কতটুকু এ কাজ সম্ভব? যদিও অনেক ক্ষেত্রে নারীদের অবদান এবং ভূমিকা রয়েছে উচ্চস্থানে। ছোট মণির ধান কাটা ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। ছবিতে দেখা যায়, কৃষকের কাঁচা ধান দলবল নিয়ে কাটছেন এমপি। ছবি তোলার সময় অসহায়ের মতো সব কিছু তাকিয়ে দেখছেন জমির মালিক কৃষক।

এভাবে কাঁচা ধান কাটতে দেখে অনেকেই সমালোচনা করে লিখেছেন কৃষকের ক্ষতিপুরণ এখন কে দিবে? ছবি দেখে মনেই হবে একটি সেলফি ছাড়া আর কিছুই নয়। মাথায় সাদা একটি কাপড়, চোখে কালো চশমা গলায় নতুন একটি গামছা। পাশেই কয়েকজন সেলফি তুলছে বাকি দলবল দেধারছে কাচা ধান কাটছে। একজন নারী সাংসদের এ কাজটি কান্ডজ্ঞানহীন ছাড়া আর কিই বা বলার আছে? তিনি জনসেবার নামে তামাশা করেছেন, অনেকের মতো আমিও হতবাক; এ কাজের নিন্দা জানানোরও রুচি হয়না। করোনার মহা প্রলয়ে  মৃত্য ও ভয়ের বিভীষিকাময় অসহ্য দমবন্ধ জীবনে যেখানে মানুষ অসহায় সে সময় নিজে ধান ক্ষেতে নেমে সেলফি তোলা আর প্রশংসা কুড়ানোর জন্য একজন কৃষকের সম্পদ নষ্ট করা এটি কখনই ক্ষমার যোগ্য নয়।

এখন বলছি আরেক এমপির কথা। বরগুনা ২ আসনের এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমন। এক মানবতার কাজ করে প্রশংসিত হয়েছেন। নেতার নেতাগিড়ি কিভাবে সম্ভব এটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি। ঢাকায় কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা আ. খালেক করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যূ বরণ করায় তার গ্রামের বাড়ি বরগুনার বেতাগীতে জানাজা পড়িয়েছেন এমপি রিমন। আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, তিনি ধর্মীয় কোন প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া না করলেও ধর্মীয় অনুভূতি এবং জ্ঞান রয়েছে অনেক। যে কারণেই তার দ্বারা জানাজা দেয়া সম্ভব হয়েছে।
সারাবিশ্বে করোনা মহামারিতে এ সংকটময় সময় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তার পাশে স্বজনও আসছেনা, জানাজা পড়ানো তো দুরের কথা। আমার বিশ্বাস হয়তো এমপি রিমন নিজের প্রসংশা কুড়ানোর জন্য এই জানাজা পড়াননি। সংকটময় সময় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এবং সরকারি সকল বৈধ আদেশ মেনেই তিনি জানাজা পড়িয়েছেন। তার জানাজা পড়ানো ছবি সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। প্রশংসাও কুড়াচ্ছেন তিনি। সাধারণত আমরা দেখেছি জানাজাসহ ধর্মীয় সকল কাজ আলেমদের দ্বারা করানো হয় এবং করাও উচিত।

কিন্তু একজন এমপির দ্বারা জানাজা তাও আবার এই সংকটময় মুহুর্তে এটি ভাববার বিষয়। অনেকেই এ বিষয়টি হালকা ভাবে নিতে পারেন। জানাজা পড়ানো এটি কত বড় বিষয় নাকি? আমি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি বা শিখতে পেরেছি তাতে জানাজা পড়ানো অনেক কঠিক কাজ। এটি অবশ্যই আলেম ছাড়া সম্ভব নয়। একজন নেতার নেতাগিড়ি এমনই হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

আমি বলবো একজন নেতার  অনেক গুন থাকা উচিত। আমরা জানি নেতা হতে হলে নেতৃত্বের অনেক গুন থাকতে হয়। ধান কাটার মতো নেতৃত্বের নেতা এবং এরকমের সংস্কৃতি থাকা উচিত নয়। এমন সংকটময় মুহুর্তে ধান কাটার সেলফি তামাশা আমরা দেখতে চাইনা। এমন নেতৃত্ব এবং এমন সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। এমন সংস্কৃতি দেশ ও জাতির কল্যাণ বয়ে আনো। দেখতে চাই জানাজা পড়ানো নেতার মতো নেতৃত্ব। যে নেতৃত্বের সকল গুনই থাকবে। এমন নেতৃত্ব দেখতে চাই যে নেতৃত্বে থাকবে অনেক গুন, থাকবে মানবিকতার কাজ, থাকবে মানবতার সেবায় নিয়োজিত। ধান কাটার সেলফির বিপরীতে থাকবে মানবতার ফুলকি।

লেখক [সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক] [email protected]


রক্ত জমাট বাঁধা: করোনায় মৃত্যুর
পঞ্চাশ বয়সের একজন ভদ্রলোক হাসপাতালে ভর্তি হন কভিড ১৯ পজিটিভ
বিস্তারিত
উন্নয়ন আর পরিবেশ রক্ষা, দুটি
উন্নয়ন আর পরিবেশ রক্ষা- দুটি কি একই সাথে সম্ভব? যদি
বিস্তারিত
করোনা প্রতিরোধে অন্তরের অসুখ নিরাময়
মানুষের অসুস্থতা প্রধানত দুই প্রকার, শারীরিক ও মানসিক। বিশ্বস্বাস্থ সংস্থা
বিস্তারিত
আমাদের চার পাশে হাজারো দু’পায়ের
আপনি পবিত্র রমজান মাসে কতজন লোককে সাহায্য করেছেন? একজন? দুইজন?
বিস্তারিত
সাংবাদিকতা ছাড়া কিছুতেই আর আনন্দ
বেশিরভাগ প্রতিবেদন প্রচার হবার পরে এক শ্রেণির তীর্যক তীর প্রতিহত
বিস্তারিত
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বর্তমান সংকট
  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন উন্নতির দিকে এগিয়ে চলছিল
বিস্তারিত