logo
প্রকাশ: ১২:২৫:১৬ AM, শনিবার, অক্টোবর ৮, ২০১৬
শাস্তি
সামিয়া লারা মৌমিতা, নবম শ্রেণী, কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

‘মেঘলা মা’ বলেই সব সময় শওকত সাহেব তার বড় মেয়েকে ডেকে থাকেন। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। অফিস থেকে ফিরেই তিনি মেঘলাকে ডাকলেন।
মেঘলা কাছে আসতেই শওকত সাহেব বললেন, ‘আমার জন্য এক গ্লাস পানি আনো তো।’
‘আনছি বাবা।’
মেঘলা পানি এনে বাবাকে খেতে দিল। শওকত সাহেবের পানি খাওয়া শেষ হলে সে বলল, ‘বাবা আমার জন্য পুতুল এনেছ তো? তোমার তো আবার ভুলে যাওয়ার অভ্যাস।’
‘না, ভুলিনি। এনেছি। এই দেখ তোর বার্বি ডল। ... সুন্দর না?’
‘হ্যাঁ, বাবা অনেক সুন্দর। থ্যাঙ্কস।... এই নাও তোমার লুঙ্গি ও তোয়ালে। জানি তুমি চাওনি কিন্তু কিছুক্ষণ পর ঠিকই বলতে।’
‘তোর এই ব্যাপারটাই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে রে মা’, গভীর আবেগে বলে উঠলেন শওকত সাহেব।
দুই
‘বাবা, চলো তো লুডু খেলি। অনেকদিন খেলা হয় না’, বলল মিথিলা।
‘ঠিক বলেছিস। ... আয় মেঘলা, লুডু খেলি’, শওকত সাহেব বললেন।
‘বাবা, আমি কিন্তু সাপলুডু ছাড়া খেলব না’, মেঘলা বলল।
‘ঠিক আছে তাই খেলব’, বললেন মেঘলার মা শিউলি।
‘একি, চার উঠেছে। আমি তো সাপের মুখে পড়ে একেবারে ৩-এ চলে যাব। কী করি? থাক একটু চিট করলে কিছুই হবে না, শুধু একটা ঘরই তো সামনে দেব’, ভাবল মিথিলা। তারপর পাঁচ ঘর চাল দিল। কিন্তু তার এ ফাঁকিটা কারও চোখে ধরা পড়ল না।
‘ওফ আল্লাহ। থ্যাঙ্কস। কেউ দেখেনি।’ মনে মনে ভাবল মেঘলা।
তিন
‘আপু, তোর পুতুলটা নিয়ে আমি একটু খেলি।’ মিথিলা মেঘলাকে জিজ্ঞেস করল।
‘না, তুই আমার পুতুলটাকে ধরবি না’, ফ্রেশরুম থেকে মেঘলা চিৎকার করে বলল।
কিন্তু মিথিলা ওর বড় আপুর নিষেধ শুনল না এবং এক পর্যায়ে পুতুলটি রাখতে গিয়ে নিচে ফেলে দিল।
শব্দ শুনে ফ্রেশরুম থেকে ছুটে এলো মেঘলা। ‘হায় আল্লাহ। এটা তুই কী করেছিস?’ বলে সে মিথিলার পিঠে কয়েকটা কিল বসিয়ে দিল।
মেঘলার চিৎকারে তাদের মা শিউলি এসে বললেন, ‘কী হয়েছে মিথিলা? তুমি কাঁদছ কেন?’
‘মা, আপু আমাকে মেরেছে’্, মিথিলা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল।
কিন্তু কেন? শিউলি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
‘মা, মিথিলা আমার পুতুল মাটিতে ফেলে দিয়েছে’, মেঘলা বলল।
তাই বলে তুমি ওকে মারবে? মেঘলা, মিথিলা তোমার ছোট বোন। সামান্য পুতুলের জন্য তোমার ওকে মারা উচিত হয়নি। বলে শিউলি মিথিলাকে নিয়ে আন্য ঘরে চলে গেলেন। এদিকে মায়ের বকা খেয়ে মেঘলার মুখে মেঘ জমে উঠল। সে তার বাবা শওকত সাহেবের কাছে তার মা ও বোন দুইজনের নামে নালিশ জানাল। শওকত সাহেব খুব অবাক হলেন। তিনি মেঘলাকে সঙ্গে নিয়ে তার স্ত্রী শিউলির কাছে গিয়ে বললেন, শিউলি, তোমার মেঘলাকে বকা উচিত হয়নি। দোষটা তো মিথিলার ছিল।
মানলাম দোষটা মিথিলার ছিল। কিন্তু মেঘলার এভাবে মারা কি উচিত হয়েছে? শিউলি বললেন। শওকত সাহেব আবারও খুব অবাক হলেন। তিনি জানতেন না যে মেঘলা মিথিলাকে মেরেছে। তবুও তিনি বললেন, তাহলে তো আর তর্ক করার কোনো দরকার নেই। দুইজনের দোষই সমান।
এভাবেই শওকত সাহেব সব সময় মেঘলার এবং ওদের মা শিউলি মিথিলার পক্ষ নিতেন।
চার
বাবা, আমাকে ২০ টাকা দাও না? মেঘলা তার বাবার কাছে আবদার করল।
এই নাও। খুশি? শওকত সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
অনেক খুশি, বাবা। থ্যাঙ্ক ইউ বলে মেঘলা বাবা-মা’র ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
এদিকে মেঘলার হাতে ২০ টাকা দেখে শিউলি অবাক হলেন। তিনি শওকত সাহেবকে বললেন, তুমি মেঘলাকে টাকা দেয়েছ?’
‘হ্যাঁ, দিয়েছি। কিছু হয়েছে নাকি?’ শওকত সাহেব উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
‘এখন পর্যন্ত হয়নি, কিন্তু পরে সাংঘাতিক কিছু হতেও পারে। শোন, বাচ্চাদের হাতে এভাবে টাকা দেয়া উচিত না’, শিউলি বললেন।
‘ঠিক আছে। আর দেব না’, শওকত সাহেব জানালেন।
পাঁচ
একি! এখানেই তো ছিল ১০০ টাকা? কোথায় গেল? বিড়বিড় করে বলে উঠলেন শওকত সাহেব। হঠাৎ তার মনে হলো স্ত্রীর কথা। কিন্তু তার স্ত্রী শিউলি জানালেন ১০০ টাকা তিনি নেননি। তখন শওকত সাহেব ভাবলেন, বোধহয় আমিই টাকাটা খরচ করেছি। তারপর তিনি ব্যাপারটা ভুলে গেলেন। কিন্তু এরপর থেকে শওকত সাহেবের টাকা হারাতেই লাগল। একপর্যায়ে তিনি নিশ্চিত হলেন যে, কেউ তার টাকা চুরি করছে। শওকত সাহেব প্রথমেই সন্দেহ করলেন কাজের মেয়ে জরিনাকে। এ বিষয়ে পুরোপরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনি একটি ফাঁদও পাতলেন। কিন্তু সেই পরীক্ষায় জরিনা ভালোভাবে উতরে গেল। তাহলে চুরিটা করল কে? শওকত সাহেব ভাবনার সাগরে ডুবে গেলেন।
ছয়
‘আজকাল গাড়িগুলোর যে কী অবস্থা। এভাবে কেউ কাদা ছিটায় নাকি? রাগে-ফুঁসতে ফুঁসতে শওকত সাহেব মেঘলাকে বললেন। মেঘলা বাবাকে সান্ত¡না দিয়ে বলল, ‘কিছু হবে না। তুমি ফ্রেশরুমে গিয়ে প্যান্টে লেগে থাকা কাদা উঠিয়ে ফেল।’
‘ঠিক বলেছিস। আমি প্যান্টটা ধুয়ে আসি।’ বলে শওকত সাহেব ফ্রেশরুমের দিকে গেলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন যে, তার হাত ও পায়েও কাদা লেগে আছে।
এটা দেখে তিনি গোসল করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন এবং জামা-কাপড় আনার জন্য ফ্রেশরুম থেকে বেরিয়ে বেডরুমে গেলেন। তখন তিনি দেখলেন যে, মেঘলা তার মানিব্যাগ থেকে টাকা নিচ্ছে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চিৎকার করে তিনি শুধু একটি কথাই বললেন, ‘মেঘলা তুই?’ শওকত সাহেবের চিৎকার শুনে মিথিলা ও শিউলি ছুটে এলো। সব ঘটনা শুনে তারাও বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
মেঘলা প্রতিবাদ জানাতে গেলে শওকত সাহেব আরও রেগে গেলেন। তিনি মিথিলা ও শিউলির দিকে চেয়ে বললেন, ‘শোন মেঘলা, যা চাইবে, তাই পাবে। কিন্তু ওর সঙ্গে তোমরা কেউ কথা বলবে না। আর এটাই ওর শাস্তি।’
সাত
‘ওই ঘটনার পর পাঁচ দিন কেটে গেছে। এখন পর্যন্ত কেউ আমার সঙ্গে একটি কথাও বলেনি। এমনকি বাবাও নয়। এভাবে চলতে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব। আজকেই ব্যাপারটার ফয়সালা করতে হবে’, মনে মনে ভাবল মেঘলা। তারপর ড্রইংরুমে গিয়ে দেখল, সবাই মিলে গল্প করছে। এ দৃশ্য দেখে মেঘলার মনের সব মেঘ তার চোখ দিয়ে অশ্রু হয়ে ঝরে পড়তে লাগল। মেঘলাকে হঠাৎ কাঁদতে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘বাবা-মা সেদিন আমি যে কাজ করেছি তার জন্য অনুতপ্ত। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। প্লিজ!’ মেঘলার কান্না দেখে শিউলি ও মিথিলার সব রাগ চলে গেল। তারাও শওকত সাহেবকে অনুরোধ করতে লাগল যেন তিনি মেঘলাকে ক্ষমা করেন। শেষ পর্যন্ত শওকত সাহেবকে ক্ষমা করতেই হলো। ফলে মেঘলার মনের আকাশে আর মেঘ থাকল না। সেখানে খুশির সূর্য উঠল।
আট.
এক বছর কেটে গেল।
একদিন নির্জন দুপুরে পাশের বাসার সিডিতে বাজতে থাকা ‘আয় খুকু, আয়’ গানটি শুনে মেঘলা হঠাৎ উদাস ও আনমনা হয়ে গেল। সে ভাবল, ‘বাবা আমাকে সত্যিই মাফ করেছে তো?’ ওর মনে পড়ল যে, ওই ঘটনার পর শওকত সাহেব ওকে আর ‘মেঘলা মা’ বলে ডাকেন না; অফিস থেকে ফিরে এটা-সেটা দিতে বলেন না।
মেঘলা নিজে থেকে কোনো কিছু এগিয়ে দিলেও তিনি কিছু বলেন না। এখন মেঘলা বাবার মুখে
‘মেঘলা মা’ ডাকটি খুব মিস করে। তার নানা ফরমায়েশও।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]