logo
প্রকাশ: ১২:৩৩:০১ AM, শনিবার, নভেম্বর ৫, ২০১৬
বর্ণবাদবিরোধীর ম্যান বুকার জয়
শা ম স আ রে ফি ন

পল ব্যাটি প্রথম আমেরিকান হিসেবে ৪৮ বছরের ইতিহাসে ২০১৬ সালে ম্যান বুকার প্রাইজ পেলেন। তার লেখনিতে আমেরিকান বর্ণবাদী রাজনীতির ব্যঙ্গাত্মক বাস্তবতা তুলে ধরার কারণে তিনি মার্ক টুআইন ও জোনাথন সুইফটের মতো এ পুরস্কারে গৌরব অর্জন করলেন। ১৯৬৯ সালে ম্যান বুকার পুরস্কার সূচনা হয় শুধু ইংরেজি ভাষায় লেখা সাহিত্যের জন্য। ২০১৪ পর্যন্ত এ পুরস্কার সীমাবদ্ধ ছিল ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড ও কমনওয়েলথভুক্ত দেশের জন্য। ২০১৪ এর পর সব দেশের ইংরেজি ভাষার লেখকদের জন্য এ পুরস্কার উন্মুক্ত করা হয়। তারপর সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন এতে বুকার ব্রিটিশ স্টাইলে লিখিত সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। কারণ তখন নবীন লেখকরা আমেরিকান লিখনপদ্ধতির প্রতি আগ্রহী হয়ে আগের বড়ো লেখকদের স্টাইল এড়িয়ে যাবে। গত বছর জ্যামাইকান লেখক মারলন জেমসকে এ ব্রিফ হিস্টোরি ফর সেভেন কিলিং উপন্যাসের জন্য এ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। অথচ পল ব্যাটি বুকার জয়ের আগে ২০ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত হিপহপ কবিতা লিখতেন। ১৯৯০ সালে তিনি নিউরেচিয়ান পয়েট ক্যাফ পুরস্কার লাভ করেন। আর তখনই তার প্রথম বই প্রকাশনার মুখ দেখে। ৫৪ বছর বয়সে লস এঞ্জেলেসে বসবাসরত এ লেখককে দ্য সেল আউট বইটির জন্য এবার ম্যান বুকার জয়ী নির্বাচিত করা হয়। বইটির মূল চরিত্র নায়ক আফ্রো আমিকান পরিচয় ব্যক্ত করতে চায় প্রকাশ্যে আগ্রাসী হয়ে। সে অস্বীকার করতে চায় কৃষ্ণাঙ্গদের দাসত্ব, নিপীড়ন ও বিচ্ছিন্ন বঞ্চিত জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি। বইটির নান্দনিকতা, বৈশিষ্ট্য, আইডিয়ার গভীরতা, লেখার ও গল্প বলার কৌশলে পাঠকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার বিষয় দৃষ্টিগ্রাহ্য।
ব্যাটি অবশ্য নিজেও স্বীকার করেছেন পাঠকের এ বইটি হজম করতে একটু কষ্ট হবে। কিন্তু জুরি বোর্ডের সদস্য অ্যামান্ড ফোরেম্যান বলেছেন, এটা বুঝতে অতটা কষ্ট হওয়ার কথা নয়। উপন্যাস খুব সহজপাঠ্য সবসময় নাও হতে পারে। কারণ সত্য অধিকাংশ সময় তিক্ত হয়। এ বইটি পাঠককে অনেক সুখকর স্মৃতিচারণের মাধ্যমে ভাবতে শেখাবেÑ কৃষাঙ্গরা জীবনের জন্যই আসলে আন্দোলন করে। এ বইয়ের ব্যঙ্গ রসাত্মক ঘটনার মধ্য দিয়ে আমেরিকাবাসীর বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে। এ উপন্যাস খুব সহজে সমাজের প্রচলিত ট্যাবু ও রাজনৈতিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সমালোচনায় বিদীর্ণ করেছে। পাঠককে হাসানোর পাশাপাশি জ্ঞানীও করে তুলবে এবং একই সময় দুঃখজনক ও সুখকর বিষয় তুলে ধরে মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট। ব্যাটি পুরস্কারপ্রাপ্তির পর আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, আমি উপন্যাসের নায়কের মতো ভাবিনি লেখালেখি আমার জীবিকা নির্বাহের বাহন হবে। কিন্তু লেখালেখি আমাকে নতুন জীবন দান করেছে। তবে লেখক তার বইকে স্যাটায়ারধর্মী রচনা মানতে নারাজ। তিনি জানান, একসময় তিনি তার সহকর্মীকে বলেছিলেন তিনি লিখতে তেমন পছন্দ করেন না। কারণ এটা খুব পরিশ্রমের কাজ। যার জন্য আপনাকে বসতে হয়, পারফেকশনিস্ট হতে হয়। আর খুব সহজে ধৈর্যের অভাব হলে আপনি এতে বিরক্তও হয়ে পড়বেন। লেখালেখির সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করি। আর একটু আত্মবিশ্বাসী হতে চেষ্টা করি।
গল্পের মূল চরিত্র যেভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছে, তাতে যে কেউ বইটি পড়ার ব্যাপারে দ্বিতীয়বার ভাববে। এ বইয়ে অনেক গালাগালযুক্ত শব্দ আছে। সমালোচকরা এসবকে অতিরিক্ত আবেগের বহিঃপ্রকাশ বলেলেও, লেখক জানিয়েছেনÑ গল্পের মূল চরিত্র বারবার বর্ণবৈষম্য ও আক্রমণের শিকার হওয়ার অর্থ এই নয় যে, আপনি আমাকে আবেগতাড়িত বলতে পারেন। অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সমালোচকরা বলেছেনÑ এ বই হচ্ছে জোনাথন সুইফটের স্যাটায়ারের পুনরাবৃত্তি। যেমন নাকি সিনেমা হলের ভিড়ে কাউকে চেঁচিয়ে জানাতে হয় আগুন আগুন। আর একইভাবে ব্যাটি বর্ণবৈষম্যকে পোস্টরেসিয়াল বিশ্বে জানিয়েছে। তবে লেখকের বাস্তব জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা বইয়ের পাতায় পাতায় প্রতিফলিত হয়েছে।
ব্যাটি বলেন, আমি আমার বাস্তব জীবনে বর্ণবৈষম্যের শিকার। একদিন আমি বাবাকে বোকার মতো বলি আমেরিকায় কোনো বর্ণবৈষম্য নেই। আর কৃষ্ণাঙ্গরা নিজেদের দায়িত্বহীনতার কারণে সমান অধিকার ভোগ করতে পারছে না। কিন্তু পরক্ষণেই বাবার সঙ্গে গাড়িতে বেড়াতে বেরিয়ে আমি এক শ্বেতাঙ্গ মহিলার বর্ণবাদী আচরণের মুখোমুখি হই। আর এ ঘটনাগুলো উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে। প্রথমত, আমেরিকানরা তাদের সামাজিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে তার কাল্পনিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোতে থেকে। আর বর্ণবৈষম্য যদি দূর করতে হয়, তবে সবদিক থেকেই করতে হবে। শুধু কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার কারণে অন্য স্কুলে ভর্তি হওয়া, দাসত্বের জীবনযাপন করে কীভাবে নিজের আত্মমর্যাদাকে টিকাতে দাঁড়াতে হয় এ বইয়ে তাই বলা আছে। লেখক আরও বলেন, কোনো বৈপরীত্যকে গ্রহণ করা অপরাধ নয়। কিন্তু অপরাধ হলো, মানবতার স্মখল ও মুক্তমনার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া। সারাজীবন কৃষ্ণাঙ্গদের অবদমিত থাকতে হবে। আর যখন আপনি শূন্যতা থেকে কোনো কিছু পাবেন, তখন জীবনে বেঁচে থাকার মানে দাঁড়াবে। এ আলোচনা থেকে বোঝা যায়, দ্য সেল আউট উপন্যাসটি সহজপাঠ্য নয়। তার মাঝে যে কষ্ট, বেদনা, দুঃখ পাওয়ার কারণ ও প্রতিরোধের যে স্পৃহা, তা আপনাকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে বাধ্য করবে।
দ্য সেল আউট : উপন্যাসের মূল চরিত্রে আছে একজন আফ্রো আমেরিকান চেইন স্মোকার কৃষক। সে লস এঞ্জেলেসের একটা ছোট শহরে বাস করে। বাল্যকালে বাবার আদরে মানুষ হলেও বর্ণবাদ নিয়ে মনোবিদ্যা অধ্যয়ন করে বড় হয়ে। তার বাবা গাড়িতে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। মৃত্যুর পর সে বুঝতে পারে বাবার মৃত্যুর পর শুধু দাফন কাফনের খরচের বিল বাকি থাকে, আর কিছু থাকে না। বর্ণবৈষম্যে হতাশ হয়ে সে নাস্তিক সামাজিক এ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট তার এ গতি রোধ করে। বর্ণবাদী আচরণ করে তাকে কারাগারে বন্দি করার নির্দেশ দেয়। এটা আসলে এক কথায় ধাক্কা দেয়ার মতো স্যাটায়ার রচনা, যাতে একজন তরুণকে বর্ণবাদী বিচারের সম্মুখীন হতে হয় কমিকধর্মী গেম বা খেলার মতো।
জর্জ অরওয়েলে প্রভাবিত ব্যাটি হোয়াইট বয় সাফল উপন্যাস দিয়ে পাঠকের সামনে আসেন। এ উপন্যাসটি ১৯৯৬ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের একজন কৃষ্ণাঙ্গ সার্ফারকে নিয়ে লেখা। ২০০০ সালে তার উপন্যাস টাফ ও ২০০৮ সালে সøামবারল্যান্ড প্রকাশিত হয়। এসব বলতে গেলে এক ধরনের আফ্রো আমেরিকান কমিকধর্মী লেখা। তার লেখনীতে মানুষের মনোবিদ্যা, বর্ণাবাদী পরিচয়, সমাজ ও সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতাকে এড়িয়ে না চলার অপারগতা বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে। আর সেলআউটে তিনি এসব থিম নাগরিক অধিকার আন্দোলন ও আফ্রো আমেরিকানদের সম্মানে পালিত ব্ল্যাক হিস্টরি মান্থ দিবসকে হাস্যকর বিষয় ধরে ঠাট্টা করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, মনোবিশেষজ্ঞ উইলিয়াম ক্রসের লেখা ‘দ্য নিগ্রো টু ব্ল্যাক কনভারসেশন’ দ্বারা অনেকটা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন এ ধরনের লেখা লিখতে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কৌতুকের মাধ্যমে তুলে ধরা সহজাত বিষয় তার জন্য। কারণ তার কাছে পৃথিবীর অধিকাংশ বিষয় হাস্যকর নাটকই মনে হয়। তারপরও তিনি তাকে স্যাটায়ার লেখক হিসেবে মানতে নারাজ। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমি অবাক হয়ে যাই লোকজন কীভাবে আমার উপন্যাসকে কমিক নোবেল বলে? তবু আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বর্ণবাদীর যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কিছুটা জয়জয়কার অবস্থা, তখন বর্ণবাদবিরোধী ব্যাটির ম্যান বুকার পাওয়া সবার জন্যই কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]