logo
প্রকাশ: ১২:১৭:১১ AM, শনিবার, নভেম্বর ১২, ২০১৬
লন্ডনে প্রথম দিন
চি ন্ম য় মু ৎ সু দ্দী

প্রায় ১৩ ঘণ্টা আকাশে থাকার পর, লন্ডনের কাছে এসে ক্যাপ্টেনের ঘোষণায় জানতে পারলাম আমাদের বিমান হিথরোতে অবতরণ করতে পারবে না। সেখানে পার্কিংয়ের জায়গা নেই। দুবাই থেকে ছাড়তে দেরি হয়েছিল আমাদের ফ্লাইট, ঢাকা থেকেও কিছুটা দেরিতে যাত্রা শুরু হয়। হিথরোতে ট্রাফিক সমস্যা প্রকট। সময় একটু এদিক-ওদিক হলেই ল্যান্ডিং করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। জীবনের প্রথম লন্ডন সফরে হিথরো বিমানবন্দরে নামতে পারছি না শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। একই সঙ্গে চিন্তিতও। এশিয়ার বাইরেও এটাই প্রথম সফর। চিন্তিত হওয়ার একটা বড় কারণ হিথরোর বদলে ‘স্টেন্সটেড’ নামের যে এয়ারপোর্টে আমাদের উড়োজাহাজ নামবে, সে স্থানে তো কেউ আমাকে নিতে আসবে না। আসবে তো হিথরোতে। আগেই চিঠিতে নিশ্চিত হয়েছিলাম আতিউর আসবেন হিথরো বিমানবন্দরে, আমাকে পথ দেখিয়ে নেয়ার জন্য। কথা ছিল তার সঙ্গেই কাটাব প্রথম কয়েকটা দিন। সে অনুযায়ী আতিউর হয়তো ছুটিছাটা নিয়ে একটা স্কেজ্যুল করে নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আতিউর ছিলেন সহপাঠী। একই বিভাগে নয়, তবে একই শিক্ষাবর্ষে। নৈকট্য ছিল সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে। ১৯৭০-এ আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখনও ‘বামপন্থার’ অবস্থান শক্তিশালী। ঊনসত্তরের গণআন্দোলনকে সাময়িক স্থবির করে দিয়ে সামরিক আইন চলছে তখন দেশে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রকাশ্য তৎপরতা পাইনি। তখন সামরিক আদেশ বলে রাজনৈতিক কর্মকা- স্থগিত রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা বন্ধ থাকেনি। বিভিন্ন আবাসিক হলে রাজনৈতিক দল ও গ্রুপের গোপন সমাবেশ অনেকটা নিয়মিত ঘটনা। পরে জেনেছি হুলিয়া কাঁধে নিয়ে অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিরাপদে অবস্থান করতেন এসব হলে।
১৯৮০-তে আতিউর লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টেল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে পিএইচডি করছিলেন। থাকতেন পূর্ব লন্ডনের সেনরাব স্ট্রিটে জিলানী পরিবারের সঙ্গে। জিলানী ও আমাদের সমসাময়িক জাসদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, নানাবিধ পুলিশি হয়রানি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লন্ডনে আশ্রয় নিয়েছেন। ধারণা ছিল, লন্ডন সফরের প্রথম দিনই তিনজনে মিলে একটা দীর্ঘ আড্ডা হবে। কথা হবে উত্তাল দিনগুলো নিয়েÑ স্বাধীনতার আগের মুহূর্তগুলো, যুদ্ধের টুকরো টুকরো স্মৃতি, যুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের অস্থিরতা। সেই সঙ্গে জানা হবে আমাদের সময়ের কে কোথায় আছে। কিন্তু বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট দেরি করায় মনে হলো সব ভেস্তে যাচ্ছে।
সম্পূর্ণ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে বিমান অবতরণ করল স্টেন্সটেড এয়ারপোর্টে। ওপর থেকেই বোঝা যাচ্ছিল ছোটখাটো বিমানবন্দর। অনেকটা আমাদের যশোরের মতো। বিমান থেকে বের হতেই প্রচ- ঠা-া বাতাস ধাক্কা দিল বুকে। বুঝলাম শীতের দেশে এসেছি। সারা এলাকায় আর কোনো বিমান চোখে পড়ল না। এরাইভ্যাল লাউঞ্জে এসে দেখি কাস্টমস ইমিগ্রেশন কাউন্টারগুলো ফাঁকা। ব্যাপারটা কী? নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে জানা গেল, এ বিমানবন্দরে শুধু জরুরি অবতরণ হয়। আমাদেরটাও ওদের হিসেবে জরুরি অবতরণ। কাস্টমস এবং ইমিগ্রেশনকে খবর দেয়া হয়েছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা এসে পড়বে।
ঢাকা থেকে আমার সফরসঙ্গী ছিলেন ডা. বি বি বড়–য়া। তিনি যাচ্ছেন জেনেভা। তিনি চিন্তিত তার কানেক্টিং ফ্লাইট নিয়ে। আমি শঙ্কিত কোথায় যাব, কীভাবে যাব। ফোন করতে গিয়েও বিড়ম্বনা বোধ করি। সেটা জোগাড় করে ফোন করার নিয়মগুলো বুঝতে সময় লাগছিল। কোনটা ডায়াল টোন, কোনটা ব্যস্ততা টোন, আগে কী, পরে কী নিয়মগুলোতে যখন চোখ বুলাচ্ছিলাম তখন এক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন, আপনি কি এখানে নতুন? ঢাকা থেকে এসেছি জেনে আমাকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘নম্বর বলুন, আমি ধরে দিচ্ছি আপনাকে।’ কিন্তু বিধিবাম, ওপারে কেউ জবাব দিচ্ছে না। একটু হতাশ হয়েই এবার তিনি জানতে চাইলেন আমি কোথায় যাব। আমার গন্তব্য হর্নচার্চ বলায় তিনি একটু জোরে শব্দ করে বললেন, ভালোই হলো, আমিও গ্রিন লাইন। তখনও অবশ্য গ্রিন লাইন কি জানি না, তবু ভাবলাম অচেনা পথ বোধহয় কিছুটা সহজ হলো।
ঢাকায় ক্যাপ্টেন সাত্তার বলে দিয়েছিলেন লন্ডনে প্রয়োজন হলে যেন কান্ট্রি ম্যানেজার সালাউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে দেখা করি। সে হিসেবে বিমানবন্দরে আসা বাংলাদেশ বিমানের ইউনিফর্ম পরা একজন ব্যস্ততা প্রদর্শনকারী ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম সালাউদ্দিন সাহেব কোথায়?
‘ওনার অফিসে’Ñ এই সংক্ষিপ্ত জবাবটি দিয়ে তিনি অন্যদিকে চলে গেলেন দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে। পরে জেনেছিলাম ইনি লন্ডনে বিমানের দ্বিতীয় ব্যক্তি। তৌহিদ বা এ ধরনের একটা নাম, এখন মনে নেই। বিমান যে এই রকম একটা কা- করে বসেছে এ নিয়ে কোনো ভাবান্তর নেই তাদের। কি আর এমন হয়েছেÑ এমন একটা মনোভাব তাদের। প্রায় প্রায় বিমান এরকম করে কিনা কে জানে। ওদের ভাবান্তর না থাকলেও আমাদের মতো যাত্রীরা যে কেমন অসুবিধায় পড়ে, সেটা আমিই টের পাচ্ছি। বাস ছাড়ার পর ঘোষণা দেয়া হলো, এটি ভিক্টোরিয়া পর্যন্ত যাবে, সেখান থেকে নিজ নিজ মতো নিজের গন্তব্যে যেতে হবে সবাইকে। আমার তো এখনও লন্ডনের জিওগ্রাফি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাই ভালো হচ্ছে কী মন্দ তা বুঝব কী করে। গওহর ভাই বললেন, ভালো হলো ভিক্টোরিয়া থেকে গ্রিন লাইন ধরেই যাওয়া যাবে। আবার গ্রিন লাইনÑ কি ওটা?
বাসে গওহর ভাইর কথা শুনে মনে হয়েছিল বাস থেকে নেমেই ট্রেনে উঠব। কিন্তু যখন ব্যাগ, স্যুটকেস, লাঠি আর ওভারকোট নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম তখনও জানতাম না আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন স্টেশন প্রায় কোয়ার্টার মাইল। এটুকু হাঁটতে গিয়ে বারবার পিছিয়ে পড়ছিলাম। ভিক্টোরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ভিক্টোরিয়া ট্রেন স্টেশনে এসে দেখি আমার চোখে সব এলাহী মনে হচ্ছে। লন্ডন নাম জানি ওই স্কুল থেকে। ক্যানাডিয়ান মিশনারিদের স্কুলের সিস্টার ফ্রান্সেসকা আর ব্রাদার হ্যামেলের কাছে লন্ডনের বহু গল্প শুনেছি সেই শিশুবেলায়। পরে অধ্যাপক আবদুল হাইর ‘বিলেতে সাড়ে সাতশ’ দিন পড়েছি। সেই বইয়ের সমালোচনা লিখেছিলেন, আবদুল গনি হাজারি ছদ্মনামে। শিরোনাম দেন ‘বিলেতে ৬৪৮০০০০০ সেকেন্ড!’ সব মিলিয়ে লন্ডন এক পরম আকর্ষণীয় নাম। কিন্তু প্রথম দিনের এই হুজ্জত মন ভেঙে দিচ্ছে।
গওহর ভাই আমার জন্য হর্নচার্চের টিকিট কেটে আনলেন। আমি খুশি হলাম। তিনি আমার কাছ থেকে একটা পাউন্ড চেয়ে নিলেন। টিকিটের দাম। বললেন, ‘বিদেশ বলে নিলাম, দেশে হলে লাগত না।’ আমি একা এলেও পাউন্ড তো লাগতই টিকিটের জন্য। বিদেশ বিভূঁইয়ে গওহর ভাই আমাকে যে পথ দেখিয়ে এনেছেন, ট্রেন লাইন চিনিয়েছেন এটাই তো অনেক। তাকে আমি কৃতজ্ঞতা জানালাম।
আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে বসে আছি। ইংরেজরা বলেন টিউব। আমি ভাবছি আমার কথা। কখন হর্নচার্চ আসবে এবং দ্রুত কীভাবে নামব সেই টেনশনে চুল প্রায় খাড়া।
গওহর ভাই পাশেই আছেন। কয়েকটা স্টেশন পার হওয়ার পর বললেন, আর দুটো স্টেশন পর আমি নেমে যাব। তুমি চিন্তা করো না, ট্রেন দ্রুতগতিতে চললেও স্টেশনে যাত্রী নামার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দেয়। আমাকে টেনশনমুক্ত করার জন্য পাশের কয়েকজন যাত্রীকে দেখিয়ে বললেন, তোমার হাতের লাঠি দেখে একটু অবাক হয়েছে ওরা, তরুণের হাতে বৃদ্ধের লাঠি, ওরা ঠিক হিসাব মেলাতে পারছে না।
লাঠির একটা কাহিনী আছে। আমার স্ত্রীর বড় ভাইদের একজন বিমানদা। পোশাকি নাম পার্থপ্রতিম বড়–য়া। মুক্তিযোদ্ধা। ছাত্রলীগ ও পরে যুবলীগের প্রথম সারির নেতা চট্টগ্রামে। দৈনিক অমর বাংলা’র সম্পাদক ও প্রকাশক। পত্রিকাটি স্বাধীনতার পর কয়েক বছর প্রকাশের পর বন্ধ রাখেন প্রকাশনা। করতে চান অনেক কিছু। কিন্তু সুস্থির নন মোটেও। সাপ্তাহিক খবরের সঙ্গে যুক্ত হন ঢাকায়। অনেক পরে দৈনিক খবর’র চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান ছিলেন বেশ কয়েক বছর। ১৯৭৯ সালে হস্তশিল্প সামগ্রী রফতানি করার উদ্যোগ নেন। সেই সুবাদে আমাকে কিছু হস্তশিল্প সামগ্রী দিয়েছেন লন্ডনে দুইজন আমদানিকারককে দেয়ার জন্য। সব জিনিস স্যুটকেসে রাখলেও হাতির দাঁতের লাঠিটি হাতেই রাখতে হয়েছে। যে লাঠি দেখে অবাক হয়েছেন স্থানীয় যাত্রীদের কেউ কেউ। গওহর ভাই কোন স্টেশনে নেমেছিলেন মনে নেই। তবে তিনি নামার পর আমি ট্রেনের ভেতরে রুট ডিরেকশনটা দেখছি বারবার। হর্নচার্চের আগের স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ার পরই আমি স্যুটকেস নিয়ে দারজার কাছে চলে আসি। নামার প্রস্তুতি হিসেবে। মনে ভয় নামার সময় পাবো তো। দরজার কাছে বসা এক ইংরেজ (না স্কটিশ?) ভদ্রলোক আমার স্যুটকেসটি ধরে বললেন, Don’t worry, I’ll help you স্টেশনে ট্রেন থামার পর দরজা খুলে গেলে আমি নামলাম ওই ভদ্রলোকের সহযোগিতায়। উনি আমার স্যুটকেসেটা নামিয়ে দিয়েছেন।
বিলেতের রাস্তাঘাটে কেউ কাউকে সাহায্য করে না। ট্রেনে-বাসে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না, কেবল বই বা পত্রিকা পড়ে। এ ধরনের কথাই শুনেছি বিলেত ফেরতদের কাছে। কথাগুলো অনেকটাই সত্যি। তবে ব্যতিক্রমও যে আছে ওই ভদ্রলোক তার প্রমাণ। হর্নচার্চের প্লাটফর্ম থেকে Exit দেখে হাঁটা শুরু করলাম। এখানে ভিক্টোরিয়া স্টেশনের মতো চলমান সিঁড়ি নেই, স্থির সিঁড়ি। মালপত্র নিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ঝামেলাই হলো। রাস্তায় ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের এক ড্রাইভারের সাহায্যে আবার ফোন করলাম সম্ভুদাকে। এবার No response. Taxi চালক কোথায় যাব জানতে চাইলে ঠিকানা লেখা কাগজটা দিলাম। ‘ও, গ্লিবওয়ে? নট ফার। চলো তোমাকে দিয়ে আসি।’ কথা শেষ করে ট্যাক্সির অফিস ঘরটিতে ঢুকে একজনকে কিছু বলে আবার বাইরে চলে এলো। Prepaid taxi Service, আগেই পয়সা দিতে হবে। এই অভিজ্ঞতা আগে ছিল না। কিছুটা ভয়ে ভয়ে দেড় পাউন্ড (যতদূর মনে পড়ে) দিলাম। ও একটা রিসিট এনে দিল ভেতর থেকে। এবার আমার মালপত্র পেছনে রাখল এবং দরজা খুলে দিয়ে আমাকে বসার আমন্ত্রণ জানাল। রিসিট পেয়ে কিছুটা নিশ্চিত মনে ট্যাক্সিতে ওঠে বসলাম। আমি এদিকে গ্লিবওয়ের পথে আর আতিউর তখন হিথরোতে আমার অপেক্ষায় সিটিং লাউঞ্জে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]