logo
প্রকাশ: ০৮:৫১:২৩ PM, শনিবার, এপ্রিল ৯, ২০১৬
‌‘টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’
আল মামুন

‘টাকডুম টাকডুম বাজাই, আমি টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল/সব ভুলে যাই, সব ভুলে যাই/তাও ভুলি না বাংলা মায়ের কোল।’ সামনে যদি থাকে বাংলা নববর্ষ তাহলে তো কথা নেই। তখন ঢোল বাজে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরেই! আর তখন সব ভুলে গেলেও বাংলা মায়ের কোলের কথা কেউ ভোলে না!

দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাংলা নববর্ষ। আর এই নববর্ষ উদযাপনে বাঙালিদের অন্যতম অনুষঙ্গ ঢোল। তাইতো নববর্ষ পালনে বাঙালিদের দিনক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে ঢোল নামের এই বাদ্যযন্ত্রটি তৈরিতে এর কারিগররা দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

ঢোল একটি লোকজ প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র। মধ্যযুগের বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যেও ঢোলের উল্লেখ আছে। বাংলার চিরায়ত বিভিন্ন লোকজ অনুষ্ঠানে বাজানো হয় ঢোল। হিন্দুদের বিভিন্ন পূজা তো ঢোল ছাড়া চলেই না। বিশেষ করে দুর্গাপূজা ও কালীপূজায় ঢোল বাজানো হয়। এ দেশের হিন্দু, মুসলমান, আদিবাসী নির্বিশেষে বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে ঢোল ব্যবহার করে থাকে। কয়েক বছর আগেও সরকারি কোনো আদেশ বা পরোয়ানা ঢোল বা ঢেড়া পিটিয়ে বিভিন্ন হাটে-বাজারে ঘোষণা করা হতো। ঢোলের আওয়াজ বহু দূর থেকে শ্রুত হয়।

ঢোল যে বাজায় তাকে বলে ঢুলি বা ঢোলি। ঢুলিরা সাধারণত ঢোলের দু’দিকে মোটা রশি বা গামছা বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে ঢোল বাজান। ঢোল বাজাতে ডান হাতে একটি কাঠি ব্যবহার করা হয়। বাম হাতের তালু দিয়ে অন্যপ্রান্ত বাজানো হয়। ঢুলিরা ঢোলের ডান দিক কাঠির বাড়িতে এবং একই সঙ্গে হাতের চাঁটিতে বাম দিকে ঢোল বাজিয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিনয় বাঁশি ভারত উপমহাদেশের একজন সেরা ঢোলবাদক।

যে ঢোল নিয়ে এতো কথা আসুন জেনে নেয়া যাক সেই ঢোল কীভাবে তৈরি হয়। একটি খোদাই করা কাঠের উভয় দিক চামড়া দিয়ে ঢেকে এই ঢোল তৈরি করা হয়। ঢোল পিপার মতো একটা কাঠের খোলবিশেষ, যার দুই মুখ খোলা, ভেতরটা ফাঁপা। দু’দিকে চামড়া দিয়ে আচ্ছাদন দেয়া। একমুখে থাকে গরু বা মহিষের মোটা চামড়া, অন্যপ্রান্তে থাকে ছাগলের পাতলা চামড়া। এতে মোটা ও চিকন শব্দে তালে তালে ঢোল বাজে। ঢোলের খোলটির পিঠে দড়ির টানা থাকে। এই টানাতে পিতলের কড়া লাগানো থাকে। কড়া সামনে বা পেছনে টেনে ঢোলের সুর বাধা হয়। ঢোলের খোলটা মাঝখানে একটু মোটা, দুই প্রান্ত একটু সরু।

আর কয়েকদিন পরেই পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ যতই ঘনিয়ে আসছে ব্যস্ততাও বাড়ছে ততো। ঢোলের তাল আর এক তারার সুর ছাড়া যেন অপূর্ণ থেকে যায় বাঙালির প্রাণের এই উৎসব। তাইতো উৎসবকে আরও বর্নিল করে তুলতে নাটোরের কারিগররা মেতে উঠেছেন ঢোল তৈরিতে।

দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢোল তৈরি হয় নাটোরেই, দাবি এখানকার কারিগরদের। তাছাড়া এখানকার ঢোল এবং ঢোলের চামড়া বিক্রি হয় দেশের বিভিন্ন জায়গায়। যার ৮০ ভাগই সরবরাহ হয় নাটোর থেকে। ঢোল কারিগররা জানান, উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ এবং পুঁজির অভাবে এই শিল্পে এখন ভাটা পড়েছে।

কয়েকশ বছর ধরে এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছেন নাটোরের লালবাজার, উপর বাজার, সিংড়া ও গুরুদাসপুরের চার শতাধিক পরিবার।

নাটোর ছাড়া মানিকগঞ্জেও ঢোল তৈরি হয়। এখানের তৈরি ঢোল জেলার ও দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। তবে ঢোল তৈরিতে ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি ও আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের কারণে লোকজ ঐতিহ্যবাহী বাংলার ঢোল হারিয়ে যেতে বসেছে। একে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বাইলাখোড়া এবং সাটুরিয়া উপজেলার পুরান গোয়ারিয়া গ্রামে প্রায় ৫০টি পরিবার ঢাক, ঢোল, তবলা, ঢুগি, খনজনি ও একতারাসহ আরো অনেক প্রকার বাদ্যযন্ত্র তৈরির কাজে নিয়োজিত আছেন। এখানকার বাদ্যযন্ত্র বিশেষ করে ঢোল দেশের চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপালসহ আরো কয়েকটি রাষ্ট্রে পাঠানো হয়।

ঢোল তৈরি করে আর্থিক ক্ষতি নিয়মিত হওয়ায় অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দুই বছর আগে যে ঢোল বিক্রয় হতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায়। বর্তমানে ওই ঢোল বিক্রি করতে হচ্ছে ছয় থেকে ১২ হাজার টাকায়।

আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রভাবে এখন বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী বাংলার ঢোল। লোকজ এই বাদ্যযন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোগী হওয়া দরকার। তা না হলে এমন নান্দনিক একটি বাদ্যযন্ত্রকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে হলে জাদুঘরই ভরসা হয়ে থাকবে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]