logo
প্রকাশ: ১২:০৯:১২ AM, বুধবার, জানুয়ারী ৩, ২০১৮
খাদ্যে ভেজালের ভয়াবহতা
মোস্তফা কামাল গাজী

খাদ্যে ভেজাল বলতে বোঝায় অধিক মুনাফার মানসে খাদ্যের প্রতি ক্রেতার আকর্ষণ সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন ধরনের রঙ বা বিষাক্ত মেডিসিন মেশানো। আজকাল বাজারের প্রায় কোনো খাদ্যই ভেজালমুক্ত নয়। ক্রেতা নিজের জন্য বা পরিবারের জন্য বাজার থেকে খাদ্য কিনে নিয়ে যাচ্ছেন নাকি বিষ নিয়ে যাচ্ছেন, নিজেও জানেন না। কৃষক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীদের প্রতিটি স্তর শাকসবজি ও খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মেশানোর সঙ্গে জড়িত। জমিতে বিষাক্ত কিটনাশক ছিটিয়ে পানি সেচ ব্যতীত তৎক্ষণাৎ তা বাজারজাত করা হচ্ছে। আম, কলা, কাঁঠালসহ অন্যান্য ফল দ্রুত পাকানো ও আকর্ষণীয় রঙের জন্য কার্বাইড এবং এগুলোর পচন রোধে বিষাক্ত ফরমালিন ব্যবহার হচ্ছে। এর মধ্যে ‘ইথিলিন’ নামক গাছের নিজস্ব এক ধরনের হরমোন প্রধান ভূমিকা রাখে। 

মুড়িকে ধবধবে সাদা ও আকারে বড় করার জন্য মেশানো হচ্ছে বিষাক্ত হাইড্রোজ ও ইউরিয়া। দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখার জন্য জিলেপি ও চানাচুর তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে পোড়া মবিল। আকর্ষণীয় করার জন্য কাপড় ও চামড়ায় ব্যবহৃত রং দিয়ে তৈরি হচ্ছে সস্তা মানের আইসক্রিম, বিস্কুট, সেমাই, নুডলস এমনকি মিষ্টি। কমলা বা মাল্টার স্বাদই পরিবর্তন হয়ে যায় বিষাক্ত কেমিক্যালের জন্য। অনেক সময় দেখা যায়, কমলা বা মাল্টা খেলে ঠোঁট জ্বালা করে ও লাল হয়ে যায়। বিষাক্ত কার্বাইডের জন্য এমনটা হয় বলে জানা গেছে।
বাজারের সুদৃশ্য টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর এবং রঙিন শাকসবজির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ফরমালিন মেশানো চিনিযুক্ত রসালো ফলে মাছি বসে না। তাই বলে মাছি বসলেই ফরমালিন দেওয়া হয়নিÑ এটা এখন নিশ্চিত করে বলা যায় না। কেননা, ফরমালিন মিশ্রিত ফল বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের ওপর মধুর প্রলেপ দেয়া হয় মাছিকে আকৃষ্ট করার জন্য।
খাদ্যে ভেজালের কারণে মানুষের দেহে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন রোগ ও তার উপসর্গ। এর মধ্যে গর্ভবতী মা ও শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বেশি। বিভিন্ন ধরনের রোগ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। কেমিক্যালযুক্ত খাদ্যের কারণে নষ্ট হচ্ছে আমাদের শরীরের অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ যেমনÑ লিভার, কিডনি, হৃৎপি-, ফুসফুস, চোখ, কান ইত্যাদি। খাদ্যে ভেজালে লিভার ক্যান্সার, লিভার সিরোসিস, ব্লাড ক্যানসার, কিডনি ফেইলুর ইত্যাদি মরণব্যাধি রোগ দেখা দেয়।
খাদ্যে ভেজাল একটি অনৈতিক ও অমানবিক কাজ। এগুলো মোমিন তো নয়ই, কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না। ইসলামে এ ধরনের কাজ চরমভাবে নিন্দিত। এতে কয়েক ধরনের অপরাধ জড়িয়ে আছে। এক. এটি প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি। দুই. এটি মূলত অবৈধ পন্থায় অপরের অর্থ গ্রহণ যা আত্মসাতের শামিল। তিন. ভেজালমিশ্রিত খাদ্য বিক্রির সময় মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কসম করতে হয়। চার. মানুষকে কষ্ট দেয়া। পাঁচ. মানুষকে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা। 
খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ক্রেতার সঙ্গে প্রতারণার শামিল। প্রতারণা ইসলামে নিষিদ্ধ। হজরত আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) বাজারে এক খাদ্যস্তূপের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি খাদ্যস্তূপের ভেতরে হাত প্রবেশ করে দেখলেন, ভেতরেরগুলো ভেজা। তিনি খাদ্য বিক্রেতার কাছে জানতে চাইলেন, এমনটা করা হলো কেন? বিক্রেতা বলল, বৃষ্টিতে ভিজে গেছে, হে আল্লাহর রাসুল! রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, তাহলে তুমি খাদ্যগুলো ওপরে রাখনি কেন, যাতে মানুষ দেখতে পেত? লোকটি চুপ করে রইল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতারণা করে সে আমার উম্মত নয়।’ (মুসলিম : ১০২)। 
খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার ফলে যে অতিরিক্ত অর্থ আসে তা অবৈধ পন্থায় উপার্জিত। মহান আল্লাহ তায়ালা অবৈধ পন্থায় অপরের সম্পদ ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না।’ (সূরা বাকারা : ১৮৮)। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘হে মোমিনরা! তোমরা একে অপরের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা।’ (সূরা নিসা : ২৯)। যারা খাদ্যে ভেজাল দেয় তাদের উপার্জিত অর্থ অবৈধ হওয়ায় তাদের ইবাদত কবুল হয় না। কারণ ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো হালাল রুজি। হারাম রুজির মাধ্যমে যে রক্ত-মাংস তৈরি হয়, তা নিয়ে কোনো ইবাদত কবুল হয় না। (মুসনাদু আবি ইয়ালা : ৪৩২)। 
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘এক ব্যক্তি দীর্ঘ সফরে থাকা অবস্থায় এলোমেলো চুল ও ধুলায় ধূসরিত দেহ নিয়ে আকাশের দিকে দুই হাত তুলে হে প্রভু! বলে দোয়া করে, অথচ সে যা খায় তা হারাম, যা পান করে তা হারাম, যা পরিধান করে তা হারাম এবং হারামের দ্বারাই সে পুষ্টি অর্জন করে, তার মোনাজাত কীভাবে কবুল হতে পারে!’ (মুসলিম : ১০১৫)। হজরত সাদ (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন আমার দোয়া কবুল হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘হে সাদ! তোমার উপার্জনকে হালাল রাখো, তোমার দোয়া কবুল হবে। মনে রেখ, কেউ যদি হারাম খাদ্যের এক লোকমাও মুখে নেয় তাহলে ৪০ দিন ধরে তার দোয়া কবুল হবে না।’ (আত তাবারানি : ১৩৭৬)। 
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) একবার ব্যবসায়ের অংশীদার হাফস ইবনে আবদুর রহমানের কাছে কিছু কাপড় পাঠালেন বিক্রির জন্য। তার মধ্যে একটি কাপড়ে কিছু ত্রুটি ছিল। হজরত আবু হানিফা (রহ.) গ্রাহককে ত্রুটিটি দেখিয়ে দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু হাফস বিক্রির সময় তা উল্লেখ করতে ভুলে যান। এ কথা অবগত হয়ে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সব কাপড়ের বিক্রয়লব্ধ অর্থ গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করে দেন।
বৈধ পন্থায় ব্যবসা পরিচালনা করা একটি মহৎ পেশা। সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেন, ‘সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ীরা হাশরের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে উত্থিত হবে।’ (তিরমিজি : ১২০৯)। কিন্তু যারা খাদ্যে ভেজাল দেয় তারা অসাধু ব্যবসায়ী ও মহাপাপী। তাদের সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় কেয়ামতের দিন ব্যবসায়ীদের মহাপাপী হিসেবে ওঠানো হবে। তবে যারা সততার সঙ্গে ব্যবাসা পরিচালনা করেছে তারা ব্যতিরেকে।’ (তিরমিজি : ১২১০)। 

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]