logo
প্রকাশ: ১০:৩৭:০২ AM, মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ২০, ২০১৮
ফোরজি যুগে বাংলাদেশ
মিজান রহমান

গলির মোড়ে বাংলালিংক সিমের পসরা নিয়ে বসে আছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শাহিন। রিচার্জ করলেই পাবেন ফোরজি সিম- এমন কথা বলে বিক্রি করছেন সিম। ফোরজি সিম কিনলে সুবিধা কী? জানতে চাইলে খুব বেশি কিছু বোঝাতে না পারলেও এইটুকু বোঝাতে পেরেছেন, আগের চেয়ে ইন্টারনেটের গতি বেশি হবে। এ গেল রাজধানীর অলিগলির চিত্র। চার মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের চিত্র ছিল একটু ভিন্ন। কয়েক দিন ধরে চলছে সিম পরিবর্তনের হিড়িক। পরিবর্তনকারীদের অধিকাংশ তুরুণ-তরুণী। নতুন সেবা পেতে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন তারা। তাদের মধ্যে যেমন রয়েছে উৎসাহ, তেমনি রয়েছে উৎকণ্ঠা। এ রকম উৎসাহ-উদ্দীপনা আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়েই সোমবার রাতে ফোরজি টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ।

২০১২ সালে দেশে থ্রিজির মাধ্যমে দ্রুতগতির মোবাইল ইন্টারনেট চালু হয়। ফোরজির মাধ্যমে সেই ইন্টারনেটের গতি আরও বাড়বে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবকাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে দেশে ফোরজি চালু হচ্ছে। ফলে দেশে কতটা ভালোমানের ফোরজি সেবা দেওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশয় আছে।

মোবাইল ফোন অপারেটগুলো জানায়, ফোর্থ অব ব্রডব্যান্ড সেলুলার নেটওয়ার্ক (ফোরজি) সেবা চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশ উঠে যাবে ইন্টারনেট এক্সপ্রেসওয়েতে। এতে করে দ্বিগুণের চেয়েও বেশি হতে পারে ইন্টারনেটের গতি। ফলে অনলাইনভিত্তিক যে কোনো সেবা প্রাপ্তি হয়ে উঠবে আরও সহজ। কোনো ফাইল ডাউনলোড বা আপলোডে সময় নেমে আসবে আগের চেয়ে অর্ধেক। আমূল পরিবর্তন ঘটবে জীবনযাত্রায়ও। অধিকাংশ কাজকর্মই হয়ে উঠবে আরও বেশি নেটভিত্তিক। সংশ্লিষ্টরা জানান, ফোরজি চালু করতে সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা ক্লাবে চার মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা, বাংলালিংক ও টেলিটকের হাতে লাইসেন্স তুলে দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এরই মধ্যে ফোরজি লাইসেন্সের নির্ধারিত ফি ১০ কোটি টাকা বিটিআরসিকে পরিশোধ করেছে এ চার অপারেটর।

মোবাইল ফোন অপারেটর সূত্রে জানা গেছে, সোমবার রাত থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গ্রাহক ফোরজি সেবা পেতে শুরু করেছেন। আজ থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনার মতো বড় শহরেও সেবাটি চালু হবে। এজন্য কারিগরি প্রস্তুতির কাজ গুছিয়ে আনা হয়েছে। সেবা পেতে চাইলে গ্রাহককে প্রথমত, পরিবর্তন করতে হবে বর্তমানের সিমকার্ড। এছাড়া গতিসম্পন্ন এ সেবা দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতেও প্রয়োজন পড়বে বেশকিছুটা সময়ের। তবে বিটিআরসির দাবি, ফোরজি চালুর জন্য দেশ এখন পুরোপুরি প্রস্তুত।

এ বিষয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, যারা সিমকার্ড চেঞ্জ করে ফোরজিতে গিয়েছেন, তারা সোমবার থেকেই সেবা পাবেন। নেটওয়ার্ক সমস্যাজনিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত সমস্যা থাকবে। ফোরজি আসার পরও সমস্যা থাকতে পারে। তবে তা আগের চেয়ে কিছুটা কমবে বলে আশা করি।

এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাইকেল ফোলি বলেন, ফোরজির মাধ্যমে গ্রাহকের নতুন পথে চলা শুরু হলো। একই কথা বলেন রবি আজিয়াটার সিইও ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, লাইসেন্স পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে ফোরজি সেবা চালু করবে রবি। অপারেটরটির সূত্রে জানা গেছে, তারা প্রথম দিন থেকে সবচেয়ে বড় পরিসরে ফোরজি নেটওয়ার্ক দেওয়ার চেষ্টা করছে।

বাংলালিংক সূত্রে জানা গেছে, তারাও গ্রাহকদের ফোরজি সেবা দেবে। রাজধানীর পাশাপাশি খুলনা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে বাংলালিংক গ্রাহক সেবাটি সবার আগে পাবেন। তবে টেলিটক সূত্র জানায়, তারা আজ লাইসেন্স নিলেও সেবাটি চালু করতে তাদের দেরি হবে। কিন্তু কত দেরি হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে দায়িত্বশীল কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ফোরজি সেবা পেতে চাইলে : ফোরজি সেবা পেতে চাইলে সিমকার্ড ও হ্যান্ডসেটটি এ প্রযুক্তির উপযোগী হতে হবে। আপনার সিমটি ফোরজি কিনা, সেটি বিনামূল্যে জানার সুযোগ আছে। গ্রামীণফোন ব্যবহারকারীরা মোবাইল ফোন থেকে *১২১*৩২৩২# ডায়াল করলেই ফিরতি বার্তায় সিমটি ফোরজি কিনা, তা জানতে পারবেন। রবির গ্রাহককে এজন্য ডায়াল করতে হবে *১২৩*৪৪#-এ। আর বাংলালিংকের গ্রাহক মোবাইল ফোন থেকে ৪ এ লিখে ৫০০০ নম্বরে খুদেবার্তা পাঠালে ফিরতি বার্তায় ফোরজি সিমের বিষয়ে তথ্য পাবেন। টেলিটক তাদের ব্যবহারকারীদের জন্য এখনও এ ধরনের কোনো সেবা চালু করেনি। সিম পরিবর্তন করতে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, ছবি ও আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন) দিতে হবে।

ফোরজির সুবিধা : ইন্টারনেটের গতি হবে দ্বিগুণের চেয়ও বেশি। ফলে ডাউনলোড বা আপলোডে সময় লাগবে আগের চেয়েও অর্ধেক। দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে ফোরজিতে ইন্টারনেটের গতি হতে পারে ৭ থেকে ১০ এমবিপিএস; বর্তমানে যা থ্রিজিতে ৩ থেকে ৪ এমবিপিএসের মধ্যে রয়েছে।

সিম পরিবর্তনে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ : কয়েকটি কাস্টমার সেন্টারে ফোরজিতে সিম পরিবর্তনে গ্রামীণফোন ১১০ টাকা করে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রবির এক কাস্টমার অভিযোগ করেছেন, সিম পরিবর্তনেও ১০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। সিম পরিবর্তনে বাংলালিংক গ্রাহককে বাড়তি কোনো অর্থ গুনতে হবে না। আর টেলিকটের প্রায় ৯০ শতাংশ সিমই এখন ফোরজি। তবে ১০ শতাংশ সিম পরিবর্তনে টাকা লাগবে কিনা, তা এখনও জানায়নি তারা।

অর্থ আদায় অনৈতিক : সোমবার বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদ এক বিবৃতিতে বলেন, গ্রাহক আগেই সিম ক্রয় করার সময় একবার অর্থ প্রদান করেছেন। সেখানে রিপ্লেসমেন্টের নামে নতুন করে অর্থ আদায় করা ন্যায়সঙ্গত নয়।

দুর্বল অবকাঠামো : টেলিযোগাযোগ-বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার জ্যেষ্ঠ গবেষক আবু সাইদ খান বলেন, দ্রুতগতির ফোরজির জন্য ব্যান্ডউইথ সরবরাহের অবকাঠামো এখনও খুবই দুর্বল। বিটিআরসির অবকাঠামো ভাগাভাগি নীতিমালা অনুযায়ী এনটিটিএন (নেশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক) অপারেটর ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠান সারা দেশে ফাইবার অপটিক ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে পারে না। এনটিটিএন প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোমের হেড অব গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স আব্বাস ফারুক বলেন, সারা দেশে বর্তমানে দুই বেসরকারি এনটিটিএনের ৬০ হাজার কিলোমিটারের বেশি ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক রয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের উপজেলা পর্যন্ত দ্রুতগতির ট্রান্সমিশন সেবা দিতে এনটিটিএন অপারেটররা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

নিলামে আয় সোয়া ৫ হাজার কোটি টাকা : ১৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে বহু কাক্সিক্ষত ফোরজির নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। ওই নিলামে অংশ নিয়ে বাংলালিংক ১০.৬ মেগাহার্জ ও গ্রামীণফোন ৫ মেগাহার্জ তরঙ্গ কেনে। দুটি কোম্পানির কেনা এ তরঙ্গ থেকে ভ্যাটসহ সরকারের কোষাগারে জমা পড়েছে প্রায় ৫ হাজার ২৬৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ওই নিলামে তরঙ্গের বড় অংশটিই অবিক্রীত থেকে যায়। অভিযোগ রয়েছে, মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহক অনুযায়ী তরঙ্গ কিনছে না। ওই নিলামে বিটিআরসির পক্ষে বলা হয়, নিলামের পর বর্তমানে গ্রামীণের হাতে তরঙ্গ আছে ৩৭ মেগাহার্জ, রবি ৩৬.৪, বাংলালিংক ৩০.৬ ও টেলিটক ২৫.২ মেগাহার্জ। গ্রাহক সংখ্যার ভিত্তিতে তাদের মার্কেট শেয়ার যথাক্রমে গ্রামীণ ৪৫.০২ শতাংশ, রবি ২৯.৫৭, বাংলালিংক ২২.৩২ এবং একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টেলিটকের শেয়ার মাত্র ৩.১ শতাংশ।

এদিকে ফোরজি সেবা প্রাপ্তিতে প্রতারণার আশঙ্কা করছেন নগরীর বাসিন্দা ফয়সাল মাহমুদ। তার মতে, ঢাকায় এখনও ঠিকভাবে থ্রিজি সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। ইন্টারনেট ব্যবহারে দেখা যায়, এই থ্রিজি, মুহূর্তেই আবার টুজি! নেটওয়ার্ক সমস্যা তো আছেই। ফোরজিতে ইন্টারনেটের খরচ বেড়ে যাওয়া নিয়ে ফয়সালের মধ্যে রয়েছে উৎকণ্ঠা।

সামগ্রিক প্রসঙ্গে ডাক টেলিযোযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ফোরজি এমন একটা প্রযুক্তি, যা ডাটা সার্ভিসকে ভালো করবে। বিদ্যমান যে সমস্যা আছে, তা দূর করার জন্যই কিন্তু নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করছি। সারা দুনিয়া যা গুরুত্ব দিচ্ছে, আমরাও সেদিকে যেতে চাই। তিনি বলেন, যেসব অভিযোগ আছে, সেসব অভিযোগের জন্য খুব স্পষ্ট করে বলেছি, টেলিকম অপারেটগুলোকে নজর দিতে হবে। প্রত্যাশা করি, তরঙ্গের সক্ষমতা বাড়ায় জনগণের দুর্ভোগ কমবে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]