logo
প্রকাশ: ১১:৩১:৩৯ PM, শুক্রবার, মার্চ ২৩, ২০১৮
দেখতে এসো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
গাজী মুনছুর আজিজ

একাত্তরে জয় বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে সম্প্রচার করা হতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নানা অনুষ্ঠান। কেমন ছিল এ বেতারকেন্দ্রের সম্প্রচার যন্ত্রাংশ? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কলম, সিগারেট খাওয়ার পাইপ, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের পোশাক, একে খন্দকারের সোয়েটার, শহীদ ক্যাপ্টেন নূরুল হুদার পোশাক, মেজর খালেদ মোশাররফের ক্যামেরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শহীদ রশিদুল হাসানের পোশাক, শহীদ অধ্যাপক আবুল হাশেম মিয়ার কাঁচি, স্ট্রে, শহীদ এএসএম হাবিবুল্লাহের সোয়েটার, জামা, চশমা, শহীদ শামসুল করিম খানের কোরআন শরিফ, শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বির ব্যবহার করা কালো রঙের গাড়ি, মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলার পতাকা, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করা অস্ত্র, বারুদ, যুদ্ধবিমান, দলিল, চিঠিপত্র, আলোকচিত্র। এমন ১৭ হাজারের বেশি স্মৃতিস্মারক আছে ঢাকার আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। এই ভবনটি ৯তলা। মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট এ জাদুঘরের উদ্যোক্তা। জাদুঘরটির ট্রাস্টিরা হলেন আসাদুজ্জামান নূর, আলী যাকের, সারা যাকের, রবিউল হুসাইন, মফিদুল হক, জিয়াউদ্দীন তারিক আলী, আক্কু চৌধুরী ও ডা. সারওয়ার আলী।
এ জাদুঘর ২০১৬ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। জাদুঘরটি নির্মাণের তহবিল সংগ্রহের জন্য উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছিল সর্বস্তরের মানুষের প্রতি। সে আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন নানা পর্যায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। ফলে এ জাদুঘর গড়ে উঠেছে সর্বস্তরের মানুষের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে। অবশ্য জাদুঘরের শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ সেগুনবাগিচার একটি ভাড়া বাড়িতে। 
জাদুঘরে প্রবেশ গেটের বাঁয়ে আছে ছোট্ট একটি সবুজ উদ্যান। এ উদ্যানের একপাশে আছে লম্বা পুকুর। সে পুকুরে ফুটে আছে পদ্মফুল। আরও আছে নৌকা। এই পুকুরপাড়ে দর্শনার্থীরা চাইলে পা ঝুলিয়ে বসতে পারবে।
জাদুঘর ভবনে আছে ভূগর্ভস্থ তিনটি তলা। এই তলাগুলোয় আছে আর্কাইভ, ল্যাবরেটরি, প্রদর্শনশালা কার পার্কিং ইত্যাদি। নিচতলায় জাদুঘর কার্যালয় ও মিলনায়তন। সিঁড়ি বেয়ে জাদুঘরের মূল আঙিনা বা প্রথম তলায় এলেই সামনে আছে শিখা চিরঅমøান। এই শিখার চারপাশে পানি, মাঝখানে জ্বলছে শিখা। শিখার উপরের দেয়ালে লেখা আছেÑ ‘সাক্ষী বাংলার রক্তভেজা মাটি, সাক্ষী আকাশের চন্দ্রতারা, ভুলিনাই শহীদের কোনো স্মৃতি, ভুবল না কিছুই আমরা।’ এছাড়া শিখা চিরঅমøানের পাশের দেয়ালে লেখা আছে জাদুঘরের উদ্যোক্তা, জাদুঘর নির্মাণে দাতাদের নাম। আর শিখা অমøানের সামনে দাঁড়িয়ে একটু বাঁয়ে উপরে দেখা যাবে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করা একটি বিমান ছাদের সঙ্গে আটকানো। এর পাশের দেয়ালে আছে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার ব্রোঞ্জের তৈরি ভাস্কর্য। এছাড়া এ তলায় আছে মুক্তমঞ্চ, ক্যান্টিন, মুক্তিযুদ্ধের বইসহ বিভিন্ন স্মারক বিক্রয়কেন্দ্র ও টিকিট কাউন্টার। ভবনের দ্বিতীয় তলায় আছে গবেষণাকেন্দ্র, পাঠাগার। তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় আছে চারটি প্রদর্শনকক্ষ। পঞ্চম তলাটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনকক্ষ।
প্রথম প্রদর্শনকক্ষটির নাম ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান পর্ব, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়ে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত দেশের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে এ প্রদর্শনকক্ষে। এছাড়ও এ কক্ষে আছে ফসিল, প্রাচীন টেরাকোটা, মৃৎপাত্র, শিলাখ-সহ নানা নিদর্শন। সঙ্গে আছে ঐতিহাসিক ঘটনা ও ঘটনাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আলোকচিত্র।
দ্বিতীয় প্রদর্শনকক্ষের নাম ‘আমাদের অধিকার আমাদের ত্যাগ’। এ কক্ষে ঢুকলেই চোখে পড়বে বিশাল একটি সাদাকালো ছবি। ছবিটি স্বাধীনতার দাবিতে রেসকোর্স ময়দানে অগণিত মানুষের বিশাল সমাবেশের। আলোকচিত্রী শুক্কুর মিয়া ১৯৭০ সালের ৩ জানুয়ারি এ ছবি তোলেন। যে ক্যামেরা দিয়ে এ ছবি তোলা হয়েছে, সেটিও আছে ছবির নিচে। এখানে আরও আছে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের ছবি, মেহেরপুরে বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে গঠিত মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার বা মুজিবনগর সরকার গঠনের ছবি, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করা রাইফেল, গুলির বাক্স, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রীও। এ কক্ষে একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতের গণহত্যার ঘটনা উপস্থাপন করা হয়েছে স্থাপনাকর্মের মাধ্যমে। এই কক্ষে আরও দেখা যাবে অপারেশন সার্চলাইট নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ট্যাংক, কামান, সাঁজোয়া যান নিয়ে যে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে, তার নমুনা। সেজন্য কক্ষের এ অংশটুকু অন্ধকার রাখা হয়েছে। এ অংশে আরও আছে সেদিনের সেই গণহত্যার আলোকচিত্র। 
ভনের চতুর্থ তলায় আছে দুইটি প্রদর্শনকক্ষ। প্রথমটির নাম ‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জীবনযাত্রা, বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বড় আকারের ডিজিটাল প্রিন্ট, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ হওয়া, রাজাকারদের তৎপরতা, মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলাযুদ্ধের আশ্রয়স্থল, মুক্তিযুদ্ধে দেশে-বিদেশে যারা বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন বা জনমত গড়েছেন, সেসব উপস্থাপন হয়েছে এ কক্ষে। আরও আছে প-িত রবিশঙ্করের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশের বিটলসের শিল্পী জর্জ হ্যারিসন ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ শিরোনামে যে গান গেয়েছেন, জর্জের হাতে লেখা সেই পা-ুলিপি ও সুরের স্টাফ নোটেশনও।
জাদুঘরের শেষ প্রদর্শনকক্ষটির নাম ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’। এখানে আছে নৌযুদ্ধের বিভিন্ন নিদর্শন। বিলোনিয়ার যুদ্ধের রেলস্টেশনের রেলিং, ট্রলি, মিত্রবাহিনীর ছত্রীসেনাদের আক্রমণ, আগুনে পোড়া ঘরবাড়ি, অর্জিত বিজয়, ১৯৭২ সালের স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সংবিধানের অনুলিপিসহ নানা নিদর্শন। 
ছবি : লেখক

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]