logo
প্রকাশ: ০৭:২৮:৩৪ PM, বুধবার, এপ্রিল ৪, ২০১৮
নদী আমাদের অস্তিত্ব
গৌতম কুমার রায়

পঞ্চাশ বছর আগের কথা- বাংলাদেশে অনেক নদী ছিল। কিন্তু এখন সেই নদী কমতে কমতে ঠেকেছে চারশ’র মতো। দেশের অধিক জনসংখ্যার চাপে এবং অনেকে রাতারাতি অর্থ আয়ের জাদুর কারণে নদী দখলে চলে গেছে। রাজনৈতিক শক্তির ছোবলে আর সম্পদ সৃষ্টির প্রতিযোগিতায় সংকুচিত হতে হতে অনেক নদী মরে গেছে, আবার অনেক নদী হারিয়ে গেছে। বর্ষায় নদী আগ্রাসী হয়। মানুষের দখলের প্রতিশোধ নেয় সে। ফলে আজকের নদীর জন্য আগামীতে বড় আফসোস আর হাপিত্যেশ করা ছাড়া কিছুই থাকবে না। নদীর জলসূত্রে আমাদের জীবনগাথা। নদীতে জল নেই, নদীর ভাষা নেই। তার অর্থ হলো জলজবৈচিত্র্য নেই। নেই প্রকৃতির সৌন্দর্যও। তাই তো সেদিনের যৌবনের নদী আজ যেন শীর্ণকায় বৃদ্ধা। নদীর জন্য গাছ নেই, মাটি নেই, কৃষি নেই; নেই পাখপাখালির কোনো কোলাহল। তাই নেই আমাদের খাদ্য জোগানের এতটুকু নিরাপত্তা।

১৮৯১ সালে পদ্মার যে মোহিনী রূপ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘরছাড়া করেছিল, ফারাক্কা নামের এক অভিশপ্ত বাঁধের কারণে সে প্রমত্তা পদ্মা নদী এখন আর নেই। আজ যেন শত শতাব্দীর সেই পদ্মার কণ্ঠে এখন বেদনার সুর। ফারাক্কার জন্য পদ্মা মরেছে। জীবন্ত-প্রমত্তা পদ্মাকে দেখলে মনে হয় সে যেন আত্মাহুতি দিয়েছে। মৃত পদ্মার জন্য মরেছে তার মায়া এবং ছায়া দিয়ে জন্ম দেওয়া অসংখ্য নদী, খাল, বিলও। গ্রীষ্মের ফেরারি মেঘ এখনও আসে, এখনও বয়ে যায়, তবে পদ্মার জলস্রোতের কলকল গানের সুর এখন আর কণ্ঠ মেলায় না। বলতে গেলে ফারাক্কা বাঁধের বদৌলতে গ্রীষ্মে এসে পদ্মা আমাদের যেন আত্মাহুতি দিয়ে মুক্তিদান করেছে। 

কবিগুরুর পাঁচক গফুর মিঞা। পদ্মা থেকে ইলিশ এনে কবিকে রান্না করে দিতেন। স্বাদের এই মাছ কবির খুব পছন্দের ছিল। কালের প্রবাহে কবি নেই। নেই পদ্মা নদী। মা পদ্মা আজ পানিশূন্য, ইলিশের দেখা মিলবে কেমন করে? পদ্মা এখন ইলিশের নদী নয়, ধু-ধু বালুকাময় পদ্মা এখন নির্জন চরে উত্তপ্ত বালুকণার নদী। বালুতে পেট ফোলা নদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে মধ্যচর কর্ষণ করে উৎপাদন চেষ্টা করা হচ্ছে ফসলের জন্য, আবাদের জন্য। ঠিক শত বছর আগেও পদ্মার দুই পাড়ের এই স্থান অর্থাৎ পাবনার সাঁড়ারঘাট থেকে কুষ্টিয়ার তালবাড়িয়া পদ্মা-গড়াই মোহনা পর্যন্ত এলাকা ছিল ইলিশ অভয়ারণ্যের জন্য জনকেন্দ্রিক এলাকা। এখানে যে কারণে কোলাহল ছিল। ছিল বাঙালি বাদ্যে গানবাজনা, ভজন-কীর্তন। আজ পদ্মার পেটে যেমন ফসল বুনন হয়, আবার জলশূন্যতা নদীর অতীত ঐতিহ্যকে মিলিয়ে দিয়েছে নীরব নিথরে। দিন দিন পদ্মা ছোট হয়ে আসছে। হারিয়ে যাচ্ছে হরেক রকমের মাছ। এই মাছনির্ভর মানুষ পেশা বদলে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। শীর্ণ পদ্মা নদীর প্রশস্ততা কমে এখন কোথাও ২৫০ মিটারে ঠেকেছে। ফারাক্কার নির্দয়তা পদ্মাকে দিন দিন হত্যা করে ফেলেছে। ১৯৯৬ সালের পানি চুক্তির আলোকে প্রাপ্য পুরো পানি না পেলেও পদ্মায় পানি গড়িয়েছে। যে পানি গড়িয়েছে তাতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১৫টি স্প্যানের ছয়টি পানি পেলেও ৯টি স্প্যানই পানির ছোঁয়া পায়নি বিগত দিনে। তীব্র পানি সংকটের কারণে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের অস্তিত্ব সংকটের ধাক্কা লেগেছে বারবার। শুষ্ক মৌসুম অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রতি মাসকে তিনটি চক্র ধরে কোন চক্রে কতটুকু পানি সরবরাহ করতে হবে, তা চুক্তিতে নির্দেশিত করা আছে স্পষ্ট। এই পরিমাণ পানি প্রাপ্যতার বিষয়টি যৌথ নদী কমিশনের সদস্যরা বাংলাদেশ-ভারত সফর করে সরেজমিন দেখভাল করবেন এটাই নিয়ম। সে হিসেবে দু-দেশের দুটি বিশেষজ্ঞ দল এই কাজ করে থাকেন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক হিসাব মতে জানা যায়, ২০১৫ সালের ১ থেকে ১০ জানুয়ারি ফারাক্কা পয়েন্টে পানি পাওয়া গেছে ৯৬ দশমিক ১৭৯ হাজার কিউসেক। এই পানির মধ্যে ভারতের প্রাপ্য ৪০ হাজার কিউসেক, বাংলাদেশের ৫৬ হাজার। ফারাক্কার নিয়ম মতে পানি পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে এই দেশের হিস্যা ৬৭ দশমিক ৫১৬ হাজার কিউসেক পানি। তবে এই সময়ে পানি এসেছে ৬৩ দশমিক ৮৫৭ হাজার কিউসেক, যা চুক্তির দাবির চেয়ে ৩ দশমিক ৬৫৯ হাজার কিউসেক পানি কম। আবার ১১ থেকে ২০ জানুয়ারি ১০ দিনে ফারাক্কা পয়েন্টে পানি পাওয়া গেছে ৮৮ দশমিক ০৩৬ হাজার কিউসেক পানি। চুক্তিমতো আমরা পাব ৪৮ হাজার কিউসেক পানি, ভারতের ৪০ হাজার কিউসেক। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে আমাদের পাওনা ছিল ৫৭ দশমিক ৬৭৬ হাজার কিউসেক পানি। আমরা পেয়েছি ৫১ দশমিক ৬৪১ হাজার কিউসেক পানি, যা চুক্তির দাবির চেয়ে ৬ দশমিক ০৩২ হাজার কিউসেক পানি কম। পানির প্রাপ্যে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের ৪.৮৮ লাখ একর জমিতে সেচ সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও পানির অভাবে সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগের বিকল্পে এই সুবিধা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে মাত্র ১.১৬ লাখ একর জমি। যে কারণে তিন জেলার প্রায় ১৩টি উপজেলার কৃষি উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে জোঁক হিসেবে জেঁকে বসেছে তামাকের ভুঁই।

ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ ছেড়ে দেওয়া পানিতে আমাদের এখানে বন্যা হয়। যে জন্য নদীভাঙন, বাড়তি পানির জন্য আমাদের জনজীবনে দুর্বিষহ পরিণতি নেমে আসে। আমাদের ঘরবাড়ি, খেতের ফসল, জমাজমি তছনছ হয়ে যায়। এভাবে বছরে প্রায় ২০ হাজার মানুষ সব হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। তাদের ঠিকানা সংযুক্ত হয় ভাসমান মানুষ হিসেবে। ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ২০০৪ এবং ২০১৭ সালে এভাবেই এসেছে বন্যা। সম্পদ হারালেও আমরা সাম্মলিতভাবে মোকাবিলা করেছি ভয়াবহ এসব বন্যা। 

১৯৭১ সাল। স্বাধীনতার সময়ের কথা। দেশে নদী ছিল প্রায় ৭০০টি। এখন সরকারি হিসাবে মিলছে ৪০৫টি। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে নদীর সংখ্যা নাকি ২৩০। যদি নদীপথের তথ্যচিত্রে দৃষ্টি ফেরাই, তবে ১৯৭১ সালেও দেশে নৌপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। এখন নাকি মাত্র ৬ হাজার কিলোমিটার। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নদীপথের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮২৪ কিলোমিটার (তথ্য ঋণ : দৈনিক কালের কণ্ঠ, ঢাকা ১৭ জানুয়ারি ২০১৮)। এখন আমাদের নদী আছে, গতি নেই। নেই তাতে পানি। নদীর জন্য কান্না হয়। আমরা যদি বর্ষাকালে সমুদ্রপথে বয়ে যাওয়া মিষ্টি পানিটুকু সময়ের অপেক্ষায় ধরে রাখতে সক্ষম হই, তবু আমাদের নদী বাঁচে। আমরা পানি পাই। আমাদের হাহাকার করতে হয় না পানির জন্য, মাছের জন্য, ফল ও ফসলের জন্য। ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে অনেক মাছের কথা চলে এসেছে কিতাবে কিংবা ছবিতে। পানির অভাবের জন্য আমাদের কৃষ্টি, সভ্যতা এবং সম্পদে পরিবর্তন এসেছে। নদীপথের যোগাযোগকে কেন্দ্র করে এবং মিষ্টি পানির আধার হিসেবে নদীকে ভালোবেসে এখানে মানুষ বসতি গেড়েছিল। এখন পানির অভাবের জন্য মরুময়তা থেকে বাঁচতে মানুষ নদীতীরবর্তী হতে চায় না। নদীকে মুক্ত রাখতে আমাদের আইন করতে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কুষ্টিয়ায় জনপ্রতিনিধিদের কাউকে কাউকে ভূমিখেকো হয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। তাদের কাজ হলো ভেজাল জমি এবং জলাশয় ভরাট করতে চুক্তিতে দখল বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ করা। এদের সঙ্গে চুক্তি না করলে আইনের হুংকার দেওয়া হয়। চুক্তি করলে আইন যেন তাদের কাছে নস্যি বনে যাওয়া। এই কাজে রাজনৈতিক আদর্শের বাইরের পেশিশক্তির মানুষকে সঙ্গে রাখা হয়েছে। তবে এতে মার খাচ্ছে আদর্শিক নিরীহ মানুষ। এদের পেছনে কিছু প্রভাবশালীর প্রচ্ছন্ন আশীর্বাদ আছে। বেপরোয়া কিছু এই ভেজাল সম্পদখোর রাজনৈতিক শক্তিধরদের জন্য জলাশয় টিকছে না। নদী থাকছে না। খোঁজ নিয়ে দেখা মেলে, চলতি সময়ে কুষ্টিয়া শহরের প্রায় ২০টি জলাশয় এবং নদীর কিছু এলাকা আজ নিঃশেষের পথে। প্রতিবাদ করলে এরা প্রতিবাদকারীকে বাড়াবাড়ি কাজ বলে থাকে। কোথাও এই অপকর্মের আইনি প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি সংবাদ কর্মীদের কেউ কেউ ঘটনা জেনে বেমালুম চেপে যাচ্ছেন এক অদৃশ্য কারণে। 

ভাবুন নদীতে পানি নেই। নদীর সংজ্ঞা গিয়ে ঠেকেছে দখলের সীমারেখায়। নদী যেন স্বাস্থ্য সমস্যার এক নজির। আমরা কেন বুঝতে পারছি না, নদীর উদারতায় আমাদের জীবনযাত্রা। আমরা কেন ভাবছি না, নদী না থাকলে আমাদের অস্তিত্ব টিকবে না। 

-গৌতম কুমার রায়, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও পরিবেশবিদ

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]