logo
প্রকাশ: ০৭:৫৩:৫৫ PM, বুধবার, এপ্রিল ১১, ২০১৮
যাবে বৈশাখি মেলায় শখের হাঁড়ি
সোনা চৌধুরী, রাজশাহী

দুয়ারে কড়া নাড়ছে বাংলা নববর্ষ। দুই দিন পরই পহেলা বৈশাখ। বসবে প্রাণের বৈশাখি মেলা। সে মেলায় ঠাঁই করে নিতে সুশান্ত পালের বাড়িতে প্রস্তুত কয়েক হাজার দৃষ্টিনন্দন শখের হাঁড়ি। কিছু কিছু হাঁড়িতে পড়ছে শেষ মুহূর্তের রংতুলির আঁচড়। সুশান্ত পালের বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার বসন্তপুর গ্রামে।

এ গ্রাম থেকেই সুশান্ত নিজের নাম ছড়িয়েছেন দেশে-বিদেশে। কারুশিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য তার ঝুলিতে আছে বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদ, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, জাতীয় জাদুঘর, কারিকা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনসহ (বিসিক) সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ২০ থেকে ২৫টি সনদ। সুশান্ত রাষ্ট্রীয় স্বর্ণপদকও জিতেছেন ২০১১ সালে। এছাড়া ওই বছরই শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী হিসেবে তিনি অর্জন করেছেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সম্মাননা। এর আগে বিসিকের শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী নির্বাচিত হয়েছেন ১৯৯৯ সালে। ২০১৩ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত এক কারুশিল্পের প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সেবার জাপানের টাকামাশু শহরের সেতুছি টার্মিনালে ৪০ দিন ধরে চলেছিল তার শখের হাঁড়ির প্রদর্শনী।

এবার ঢাকায় বৈশাখি মেলায় নিজের পসরা নিয়ে হাজির হবেন ৫৬ বছর বয়সি রাজশাহীর খ্যাতিমান এ মৃৎশিল্পী। তার বড় ছেলে সঞ্জয় কুমার পাল আর ছোট ছেলে মৃত্যুঞ্জয় কুমার পালও থাকবেন আলাদা দুটি বৈশাখি মেলায়।

এজন্য তাদের বাড়িতে বানানো হয়েছে কয়েক হাজার শখের হাঁড়ি। নজরকাড়া মাটির হাতি, ঘোড়া আর পুতুলও থাকবে তাদের কাছে। মঙ্গলবার সকালে সুশান্ত কুমারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনায় কয়েক ধরনের শখের হাঁড়ি রোদে শুকাতে দেওয়া হয়েছে। সুশান্তের পুরো বাড়িটিতে যেন এখনই বসেছে বৈশাখি মেলা। বারান্দায় থরে থরে সাজানো নানা রং ও আকারের শখের হাঁড়ি। এগুলো এখন মেলায় যেতে পুরোপুরি প্রস্তুত। সুশান্ত তখন ব্যস্ত রংতুলি হাতে। সুনিপুণ হাতের ছোঁয়ায় শেষ মুহূর্তে তিনি রাঙিয়ে তুলছিলেন শখের হাঁড়িগুলোকে।

সুশান্ত জানান, আগে নান্দনিক এসব শখের হাঁড়ির চাহিদা ছিল ব্যাপক। কিন্তু দিন দিন এর কদর কমেছে। এখন এগুলো বিক্রি হয় শুধু মেলায়। তাই মেলার আগে তাদের ব্যস্ততাও বাড়ে। এবার বৈশাখি মেলায় পসরা সাজাতে তিন মাস ধরেই তাদের এমন ব্যস্ততা চলছে। তিনি জানান, শখের হাঁড়ির কারিগরদের বর্তমান অবস্থা খুবই শোচনীয়। শুধু মেলার ওপর নির্ভর করেই তাদের আয়ের পথ খুঁজতে হয়। তবে অনেক সময় মেলায় তাদের মাটির পণ্যসামগ্রী নিয়ে যেতে পরিবহন খরচ পড়ে অনেক বেশি। এক্ষেত্রে সরকারিভাবে মেলার আয়োজন করা হলে তারা কিছুটা আর্থিক সুবিধা পান। এতে তারা কিছুটা লাভের মুখ দেখেন। অন্যথায় গুনতে হয় লোকসান।

সুশান্ত পালের স্ত্রী মমতা রানি পাল বলেন, আগে গ্রামের নারীরা পাটের শিকেয় এসব শখের হাঁড়ি ঝুলিয়ে রাখতেন। তাতে রাখা হতো নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা জিনিস। গ্রামাঞ্চলে আগে মিষ্টির বদলে প্রচলন ছিল পিঠার। তখন শখের হাঁড়ি ভরে আত্মীয়দের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলত- কে কার বাড়িতে কত হাঁড়ি পিঠা পাঠাতে পারেন। এখন এ প্রচলনও নেই। তাছাড়া আগে বিয়েবাড়িতে শখের হাঁড়ির উপস্থিতি না থাকলে আয়োজনে এক রকম অপূর্ণতা থেকে যেত। এখন সে প্রচলনও নেই। ফলে প্রয়োজনও পড়ছে না শখের হাঁড়ির। এতে বেকায়দায় পড়েছেন মৃৎশিল্পীরা।

সুশান্ত পাল জানান, ২০ বছর আগেও তাদের গ্রামসহ পাশের সিন্ধু কুশনী, জেলা সদরের হড়গ্রাম ও কোর্ট স্টেশন এলাকা, গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী, হরিশংকরপুর কুমারপাড়া ও বালিয়াঘাট্টা, তানোরের রাতোল ও কালীগঞ্জ, বাগমারার মহতপুর ও বাঙালপাড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের বারোঘরিয়া এবং নওগাঁর মান্দা উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিবার দৃষ্টিনন্দন এসব মাটির শখের হাঁড়ি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন মানুষ এসব হাঁড়ি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। এজন্য এখন খুবই অল্পসংখ্যক পরিবার এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। বসন্তপুর গ্রামটির কুমারপাড়া হিসেবে পরিচিতি থাকলেও এ গ্রামে এখন একমাত্র মৃৎশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল। তিনি বলেন, বাপ-দাদার পেশা হিসেবে তিনি ছোটবেলা থেকেই এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। শৈল্পিক এ পেশার সঙ্গে নিজের ভালোবাসা জড়িয়ে থাকায় তিনি তা ছাড়তে পারেননি। তাই অনেক সংগ্রাম করেই এ পেশা টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে তাকে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]