logo
প্রকাশ: ০১:৪৯:১৩ AM, শনিবার, জুন ৩০, ২০১৮
মঞ্জু মামার মোটরসাইকেল
আহমেদ জাকির



আর একবার ঘুরে এলেই কাকুকিদের ওঠার পালা। মঞ্জু মামা মোটরসাইকেলে ছুটিয়ে চলল। অল্প একটু যেতেই ছোট্ট একটা গর্তে পড়ে মোটরসাইকেলটা বন্ধ হয়ে গেল। সেই সঙ্গে মট করে একটা শব্দ হলো। মঞ্জু মামাকে প্রথমে কেমন বোকা বোকা দেখাল। 
তারপরই তার মুখটা উজ্জ্বল হাসিতে ভরে উঠল
মঞ্জু মামা মোটরসাইকেল কিনেছেন। এ খবরটা সারা গ্রাম জানতে সময় লেগেছে ১০ মিনিট। এখন সবার মুখে মুখে একই কথা, মঞ্জু মামার মোটরসাইকেল। কাকুকিকে খবরটা দিয়েছে ইভা। সকালবেলা এসে কাকুকিকে ডেকে নিয়ে মঞ্জু মামার মোটরসাইকেলটা দেখাল। রাস্তায় বের হতেই প্রচ- ভটভট শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। সামনে তাকাতেই দেখা গেল, মঞ্জু মামা মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন। আর তার পেছন পেছন অনেক ছেলেমেয়ে দৌড়াচ্ছে। সবাই কাকুকির বয়সি। কাকুকি ওদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে করলেও দূরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল।
কাকুকি মঞ্জু মামাকে চিনত না। কিন্তু মঞ্জু মামা মোটরসাইকেল কিনেছেন শোনার পর বুঝতে পারল, এ হচ্ছে মঞ্জু মামা। আর এই তার বিখ্যাত মোটরসাইকেল।
ইভা বলল, মঞ্জু মামা একটু পাগলাটে। তবে গ্রামের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তার দারুণ ভাব। সেই মঞ্জু মামা মোটরসাইকেল কিনেছে। যদিও তা পুরানো। তাতেও তার দেমাগ একটুও কম নয়। এখন পর্যন্ত কাউকে মোটরসাইকেলে হাতই দিতে দিচ্ছে না। বলে কি না হাত দিলে তাতে তার মোটরসাইকেলের অমঙ্গল হবে। যাদের সঙ্গে তার গলায় গলায় ভাব, তাদেরও দূরে ঠেলে রাখছেন।
ভটভট থামিয়ে নদীর পাড়ে মোটরসাইকেলটাকে দাঁড় করিয়ে পরিষ্কার করছেন এখন। দুই-তিনটি ছেলে নদী থেকে বোতলে ভরে পানি এনে দিচ্ছে। তাদের মনে আশা, এতে তারা মঞ্জু মামার সুনজরে পড়বে। আর তার মহামূল্যবান মোটরসাইকেলটা ধরতে দেবেন। ভাগ্য ভালো হলে পেছনে বসিয়ে ঘুরাতেও পারেন!
এ গ্রামে মঞ্জু মামার ওই একখানা মোটরসাইকেল তা কিন্তু নয়। তবে কথা হচ্ছে, এ মঞ্জু মামার মোটরসাইকেল। বিষয়টাই আলাদা। যে একবার ওই মোটরসাইকেলে উঠতে পারবে তার জীবন ধন্য না হয়ে পারেই না! কারণ এ রকম পরিস্থিতিতে সবাই মঞ্জু মামার সুনজরে পড়ে না।
সবারই জানা, মঞ্জু মামা একটু পাগলাটে স্বভাবের। ছেলেপুলেকে তিনি দারুণ ভালোবাসেন। মন ভালো থাকলে সবাইকে আইসক্রিম কিনে খাওয়ান। কোথায় কবে গভীর রাতে ভূতের সঙ্গে দেখা হয়েছে, সে গল্পও করেন। নদীর পাড়ে ছনবনে কয়েক দিন আগেও একটা বাঘ থাকত! এমন গল্প করেন। আর মন খারাপ হলে তুমি তার পিছু নিয়েছ তো এমন দাবড়ানি দেবেন, তুমি তেরো নদী পাড়ি দিয়ে লক্ষ্মীটি হয়ে বসে থাকবে। ভুলেও এ মুখো হতে চাইবে না।
সত্যি বলতে মঞ্জু মামা যেমন সবাইকে খুব ভালোবাসেন, তেমনি ছেলেমেয়েরাও তাকে অনেক ভালোবাসে। তাই মঞ্জু মামার সবকিছুতেই তাদের এমন আগ্রহ।
কিন্তু কী মনে করে কাউকে তার ওই বিখ্যাত মোটরসাইকেলে উঠানোকে বিপদ মনে করছেন, তা সে নিজেই জানে।
কাকুকি ভালো করে দেখল। যাকে বলে একেবারে হাড় জিরজিরে একখানা মোটরসাইকেল। ভাঙাচোরা একখানা সিট। ডানপাশের গ্লাসটা ভাঙা। পেছনে একটা লাইটও আস্ত নেই। সামনের হেডলাইটও কেমন লক্কড়ঝক্কড় মনে হচ্ছে। চাকার রিংগুলোতে জং ধরেছে। জায়গায় জায়গায় রং উঠে গেছে। এমন কিছু নেই, যেটাকে ঠিক বলা যায়।
কাকুকির মনে হচ্ছে, মোটরসাইকেলটাকে কেউ পানির নিচে চুবিয়ে রেখেছিল। আর এখন সেটা মঞ্জু মামার কাছে বিক্রি করেছে। মঞ্জু মামারও হয়তো তাতেই ভয়। যে-কোনো সময় যে তা ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়বে না, তা কে বলতে পারে!
মোটরসাইকেল ধোয়া-মোছা শেষ। সামনের বালুর মাঠে এনে দাঁড় করিয়েছেন। মোটরসাইকেলের ওপর বসে বেশ ফুরফুরে মনে সুর করে ছড়া কাটছেন মঞ্জু মামা। চারপাশে জড়ো হওয়া ছেলেমেরাও তার সঙ্গে ছড়া কাটছে। ছড়া কাটা শেষ হতেই মঞ্জু মামাকে কেমন অন্যরকম লাগল। একটু আগের মঞ্জু মামা আর এখনকার মঞ্জু মামা বিলকুল আলাদা। কেমন ফুর্তিবাজ ফুর্তিবাজ মনে হচ্ছে তাকে।
সিপাহি!
চিৎকার করে উঠল মঞ্জু মামা। 
সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের যত ছেলেমেয়ে ছিল সবাই তার পাশে এসে জড়ো হলো। ইভাও কাকুকিকে টেনে নিয়ে চলল। যেতে যেতে বলল, মঞ্জু মামা এবার সবাইকে মোটরসাইকেলে উঠাবে।
বাহ্, ভালো তো। সিপাহি বললে বুঝতে হবে মঞ্জু মামা এখন বেজায় খুশি। এবার তোমাদের ইচ্ছা পূরণ হবে। কথাটা ভাবতে কাকুকিরও ভালো লাগল। মনে মনে তারও সাধ জাগছে মঞ্জু মামার মোটরসাইকেলে ওঠার।
ইভার সঙ্গে এগিয়ে যেতে যেতে কাকুকি মনে মনে বলছে, সিপাহি, সিপাহি, সিপাহি। কথাটা বলতে ভারি আনন্দ হচ্ছে তার।
মঞ্জু মামা মোটরসাইকেলে উঠে বসতেই ছয়-সাতজন ছেলে হুড়োহুড়ি করে উঠে বসল। মঞ্জু মামা দুজনকে নামিয়ে বাকিদের নিয়ে মোটরসাইকেল ছুটিয়ে চলল। বড় মাঠটায় দুইটা চক্কর দিয়ে নামিয়ে দিল। যদিও নামার ইচ্ছে কারও নেই। তবু নামতে হলো। মঞ্জু মামা ফের অন্যদের নিয়ে ছুটল। সবাইকে একইভাবে ঘুরিয়ে নামিয়ে দিচ্ছে। নেমে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। যদি আবারও তাদের একটু ঘুরায়।
আর একবার ঘুরে এলেই কাকুকিদের ওঠার পালা। মঞ্জু মামা মোটরসাইকেলে ছুটিয়ে চলল। অল্প একটু যেতেই ছোট্ট একটা গর্তে পড়ে মোটরসাইকেলটা বন্ধ হয়ে গেল। সেই সঙ্গে মট করে একটা শব্দ হলো। 
মঞ্জু মামাকে প্রথমে কেমন বোকা বোকা দেখাল। তারপরই তার মুখটা উজ্জ্বল হাসিতে ভরে উঠল।
কাকুকি দেখল, সামনের চাকার দুইপাশটা ভেঙে মাটিতে গেঁথে আছে। আর চাকাটা গড়িয়ে গড়িয়ে চলছে। সামনে গিয়ে একদিকে হেলে কয়েকটা চক্কর খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল চাকাটা।
চাকার দুইপাশটা ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে কাকুকির মনটাও ভীষণ রকম ভেঙে পড়ল। আপনা-আপনিই তার দুই চোখ বন্ধ হয়ে এলো।
ছেলেদের চিৎকারে চোখ তুলে তাকাল কাকুকি।
ভাঙা মোটরসাইকেলের পেছনটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। আর মঞ্জু মামা ছেলেদের সঙ্গে মিলে সামনের চাকাটাকে গড়িয়ে গড়িয়ে ছুটিয়ে নিয়ে চলছে আর ছড়া কাটছে।
তাদের হইহুল্লোড় আর চিৎকারে ভরে উঠেছে চারপাশ। কাকুকি আর ইভা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। মঞ্জু মামা ছেলেদের সঙ্গে ছড়া কাটতে কাটতে রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে গেল। কাকুকি আর ইভা বাড়ির পথ ধরল। 
ভীষণ রকম মন খারাপ তাদের। বারবার ফিরে তাকাচ্ছে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে মঞ্জু মামার ভাঙা মোটরসাইকেল। মঞ্জু মামার মোটরসাইকেলে ওঠার দুঃখটা মন থেকে মুছতে পারছে না কাকুকি। হয়তো কোনোদিনই তা আর মুছবে না! হ

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]