logo
প্রকাশ: ১১:৫৬:৩৪ PM, শুক্রবার, জুলাই ৬, ২০১৮
একটি তালগাছের কথা
সোহেল বীর

এদিকে তানিয়ার বাবা তাদের বলেন, সবুজ এ গাছপালা আমাদের অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। সেই সঙ্গে বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও রক্ষা করে। শুধু তালগাছ নয়, প্রতিটি গাছই আমাদের বন্ধু। প্রতি বছর অন্তত একটি করে গাছ লাগানো উচিত

তানিয়ার বাবা মতিন সাহেব। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে মেয়ের সঙ্গে গল্প করেন। আজ গল্প বলবেন তালগাছ নিয়ে। বাড়ির পাশের তালগাছটার বয়স ১০০ বছর। তানিয়ার যেন বিশ্বাসই হতে চায় না। তার বাবা বলেন, মামণি শোন, আমার দাদি নিজ হাতে এ তালগাছ লাগিয়েছিলেন। তালগাছ নিয়ে দাদি প্রায়ই গল্প বলতেন। বাড়ির আশপাশে গাছ লাগানো ছিল দাদার নেশা। তিনি গাছ খুব ভালোবাসতেন। 
দাদি এ বাড়ি আসার কিছুদিন পর দাদির জন্য উপহারস্বরূপ একটি তালগাছ কিনে আনেন দাদা। সেই তালগাছ দাদি নিজে হাতে লাগান। একদিন সেই তালগাছ বড় হলো। তাল ধরল। প্রতি বছর আশপাশের সবাইকে তাল দেওয়া হয়। তালের পিঠা খেতে কী যে মজা, না খেলে কেউ বুঝবে না। তালের রসও খেতে মজা। তালের শুকনো পাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর তালপাখার বাতাসে প্রাণটা জুড়িয়ে যায়! আমার তিন পুরুষ এ গাছের তাল খেয়েছে।
এতক্ষণ তানিয়া খুব মনোযোগ দিয়ে বাবার গল্প শুনছিল। তার বাবা আরও বলেন, তালগাছের আরও একটি উপকারী দিক হলো বজ্রপাত থেকে রক্ষা করে। তানিয়া বাবার কাছে জানতে চায়, বজ্রপাত কী? বাবা বলেন, বজ্রপাত হলো ডাকপড়া। মেঘে মেঘে ঘর্ষণ হলে অনেক ভোল্টেজের বিদ্যুৎ মাটিতে পড়ে। মানুষের গায়ে বজ্রপাত পড়লে এতে মানুষ মারা যায়। তালগাছ উঁচু হওয়ায় এটি বজ্রপাত প্রতিরোধ করে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে তালগাছ লাগানো হচ্ছে। গেল আট বছরে আমাদের দেশে প্রায় দেড় হাজারের মতো মানুষ মারা গেছে। গেল তিন বছর ধরে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বেড়েছে। বাবার কথাগুলো চিন্তাবিদের মতো শুনতে থাকে তানিয়া।
আজ দু-দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। খবরে দেখাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বজ্রপাতে মানুষ মারা গেছে। এদিকে তানিয়ার খুব ইচ্ছে হচ্ছে বৃষ্টিতে ভিজতে। কিন্তু ভিজতে পারছে না। মায়ের কড়া নির্দেশ, বৃষ্টির মধ্যে ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না। তানিয়ার মন খারাপ হয়। 
তানিয়ার বাবা ঘুম থেকে উঠলেন। ঝড়-বৃষ্টির কারণে গ্রামে বিদ্যুতের অবস্থা ভালো নয়। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ আসে। মতিন সাহেব ঘড়ি দেখলেন। মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো আজান শোনা যায়নি।
বারান্দায় পাটি বিছিয়ে নামাজ পড়তে লাগলেন বাবা। সালাম ফেরানো শেষে তালগাছে চোখ পড়তেই দেখলেন, গাছের মাথায় আগুন জ্বলছে। অমনি চমকে উঠে তানিয়ার মাকে ডাকলেন, এই নূরবানু, এদিকে এসে দেখে যাও...।
বিদ্যুৎ গতিতে তানিয়ার মা বারান্দায় এলেন। সঙ্গে তানিয়াও। বাহ্, কী সুন্দর, তালগাছের মাথায় আগুন। তানিয়া এরকম দৃশ্য এর আগে কখনও দেখেনি। নতুন এ দৃশ্য বেশ উপভোগ করছিল সে। এদিকে তার বাবার মনটা খারাপ। স্মৃতিবিজড়িত তালগাছে আগুন! বুঝতে বাকি থাকল না, তালগাছে ডাক পড়েছে। বজ্রপাতকে তারা আঞ্চলিক ভাষায় ডাকপড়া বলে থাকেন। শত বছরের পুরানো তালগাছে আগুন দেখে মতিন সাহেবের ভেতরেও এক ধরনের কষ্টের আগুন জ্বলতে লাগল। হৃদয়টা হু হু করে উঠল। সবাই বলে, তালগাছে ডাক পড়লে সেই গাছ নাকি ধীরে ধীরে মরে যায়। বিষয়টা ভাবতেই আরও একবার তানিয়ার বাবার ভেতরটা কেঁদে ওঠে। তানিয়াকে সবকিছু বুঝিয়ে বললে বাবার কথা শুনে তারও খুব কষ্ট হয়।
এক মাস পর সেই তালগাছটা যেখানে ছিল, সেই জায়গাটা পুরোপুরি ফাঁকা। এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়। বাবার চোখে জল দেখে তানিয়ারও খুব কষ্ট হয়। কচি হাতে বাবার চোখের পানি মুছে দেয় তানিয়া। বাবাকে বলে, আচ্ছা বাবা, চলো আমরা আবার একটা নতুন তালগাছ লাগাই। মেয়ের কথায় যেন সম্বিত ফিরে পান তিনি। মনে পড়ে যায় হরিণাকু-ুতে চলমান কৃষিমেলার কথা। 
সেদিনই বিকেলে প্রিয় ফনিক্স সাইকেলটা নিয়ে হরিণাকু-ুর দিকে যাত্রা শুরু করেন। সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরে আসেন। সঙ্গে করে নিয়ে আসেন একটি তালগাছের চারা। মাগরিবের আগে আগেই চারাটি রোপণ করেন ঠিক আগের জায়গায়। 
এদিকে তানিয়ার বাবা তাদের বলেন, সবুজ এ গাছপালা আমাদের অক্সিজেন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। সেই সঙ্গে বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকেও রক্ষা করে। শুধু তালগাছ নয়, প্রতিটি গাছই আমাদের বন্ধু। প্রতি বছর অন্তত একটি করে গাছ লাগানো উচিত। 
তানিয়া হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসেছে। মা রান্না ঘরে। হঠাৎ তার বাবার তালগাছের কথা মনে পড়ে। তালগাছের জন্য খুব কষ্ট হয়। সদ্য রোপণ করা চারাগাছের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে, গাছের মতো প্রকৃত বন্ধু নেই; সবসময় নিজে জ্বলে আমাদের বাঁচায়। চারাগাছটা একদিন বড় হবে, আশপাশের সবাই তাল খাবে, রস খাবে, তালের পিঠা খাবে।  এরপর হয়তো একদিন সবাই এ তালগাছের গল্পও ভুলে যাবে। হ

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]