logo
প্রকাশ: ১২:৩৩:০৪ AM, শনিবার, আগস্ট ১১, ২০১৮
ছন্দময় ব্যায়াম

 


ভাষান্তর : মাইনুল ইসলাম মানিক
সকাল-সন্ধ্যা কারফিউ জারির কয়েকদিনের মধ্যেই একটি আনন্দঘন পরিবারের সদস্যরা অনুভব করলেন, তারা ফুরিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অ্যাপার্টমেন্টে খাদ্য, পানি, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জামসহ জরুরি সেবার সব উপকরণই রয়েছে। এমনকি পড়াশোনা, টিভি দেখা, ভিডিও প্রোগ্রাম, ইন্টারনেটসহ পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থাও ছিল। ল্যান্ডফোন বা ব্যক্তিগত সেলফোনের কথা তো বলাই বাহুল্য। তবুও একটা কিছু তাদের সীমাহীন ক্লান্ত করে তুলল, তাদের ক্রমান্বয়ে এমন একটা অনুভূতির দিকে তাড়িত করল যেন তারা একটা বন্দিজীবনযাপন করছে। তাদের কাছে মনে হতে থাকল, তারা একটি প্রশস্ত অন্ধকূপে বসবাস করছে। এই অন্ধকূপের ভেতর তারা ধীরে ধীরে আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করলÑ তাদের সবার দেহ খুবই দ্রুততার সঙ্গে এমন মুটিয়ে যাচ্ছে যেন সময় তাদের শরীরে চেপে বসেছে। কোনো রকমের বিনোদনই তাদের প্রাণবন্ত করতে পারছিল না। উপরন্তু বারবার কানের কাছে গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসছিল আর সেসব শব্দ কল্পনাশক্তিতে বারবার স্নাইপার অপারেশন ও হত্যাকা-ের রক্তাক্ত দৃশ্যের অবতারণা করছিল। পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে ভীতিকর এ পরিস্থিতিতে সৃষ্ট হতাশার বিষয়ে অবগত করল। 
কীভাবে এই ভীষণ রকমের মুটিয়ে যাওয়ার হাত থেকে, হতাশার নরক থেকে রেহাই পাওয়া যায় তা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন পরামর্শ করল। সবার পরামর্শের মধ্যে বাবার দেওয়া পরামর্শটি পরিবারের সবার মনে ধরল। তাদের বাবা জানায়, একজন অ্যাথলেট হিসেবে তিনি তরুণ বয়সে যখন যেখানে সম্ভব হতো, একটি আরব্য ব্যায়ামের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসুরক্ষা করে থাকতেন। পরিবারের সবাই যার যার মতো করে এ ধারণাটির প্রয়োগ শুরু করলেন। খুব দ্রুতই ছেলে ও মেয়ের ব্যায়াম পদ্ধতি সবার কাছে প্রিয় হয়ে উঠল। তাদের ব্যায়ামের মধ্যে এক ধরনের ছন্দ ছিল। তাছাড়া এর জন্য খুব সামান্য জায়গাই যথেষ্ট ছিল। প্রথমে তারা কোনো আনন্দময় সংগীতের সুরের সঙ্গে ব্যায়াম করত। তাদের একজন ব্যায়াম করত এবং অন্যজন সংগীতের সুর তুলত। ধীরে ধীরে অন্যরাও তাদের এ ছন্দময় ব্যায়াম অনুসরণ করল এবং তাদের সঙ্গে যোগ দিল। এমনকি তাদের বাবা-মা পর্যন্ত, যদিও প্রথমে কিছুটা জড়তা ছিল তাদের মধ্যে। ধীরে ধীরে এ ছন্দময় ব্যায়াম ও সংগীতের সুর তাদের বন্দিদশার ভেতর অন্যরকম এক স্বাধীনতা হয়ে ওঠে। যখনই তারা অবসর সময় পেল, এ ব্যায়ামগুলোকে তারা নিজস্ব ছন্দে সন্নিবদ্ধ করে নিতে লাগল। সকালে দাঁত মাজার সময়, মুখ ধোয়ার সময়, প্রিন্টারে বেরিয়ে আসা পত্রিকায় চোখ বোলানোর সময়, বিষণœ সময়ে কফির পানি ফোটানোর সময়, দুপুরের খাবার টেবিল গোছানোর সময়, টেলিভিশনের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে এক পলক চোখ বুলিয়ে নেওয়ার সময় তারা কিছুটা নাচুনে ঢঙের ব্যায়াম চালিয়ে যেতে লাগল। আদতে তাদের ছন্দময় ব্যায়াম শুধু দাঁড়ানো অবস্থায়ই সীমাবদ্ধ থাকল না। তাদের কেউ কেউ বসে বসে এমনকি ঘুমানোর আগে শোয়া অবস্থায় পর্যন্ত চালিয়ে যেতে লাগল।
 কোনো এক সময় মনে হচ্ছিল পুরো অ্যাপার্টমেন্টের আসবাবগুলোও যেন ছন্দের তালে নাচছে। বিস্ফোরণের ভয়ংকর শব্দের মাঝে, স্নাইপারে গোলাগুলির সময়, বিষণœ সংবাদের সময় এমনকি ক্রমবর্ধমান কারফিউয়ের সময়ও তা চলতে থাকল। চারতলার এ অ্যাপার্টমেন্টের পরিবর্তনটুকু কোনোভাবে বিপরীত পাশের দালানের কারও দৃষ্টিতে ধরা পড়ল। বিষয়টি পরিষ্কার নয়, ঠিক কীভাবে দেখতে পেল। কারণ এমনকি সবচেয়ে কাছের জানালা থেকেও খোলা চোখে কেউ বুঝতে পারবে না জানালার পেছনে কী ঘটছে। একটা বিষয় পরিষ্কার যে, পরিবারের মা যখন ছন্দের তালে তাল মিলিয়ে ব্যায়াম করতে করতে টিভি দেখছিলেন, ঠিক তখনই জানালার গ্লাসের একটি নির্দিষ্ট জায়গাকে লক্ষ্যবস্তু ধরে ভেতরের টিভিস্ক্রিনের ঠিক মাঝখানে কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো একটা গুলি অনুমান করে চালানো কখনোই সম্ভব নয়। তিনি বসেছিলেন, তার হাত দুপাশে প্রসারিত করছিলেন, গুটিয়ে নিচ্ছিলেন, আবার প্রসারিত করছিলেন, আবার গুটিয়ে নিচ্ছিলেন আর বাহু নুইয়ে নিতে নিতে ‘লেফট-রাইট, লেফট-রাইট’ পুনরাবৃত্তি করছিলেন।
গুলি যখন রাঁধুনির পেটে আঘাত করল, সস ও জুসের বোতল উড়িয়ে নিল, ঝনঝন আওয়াজে পাতিল গড়িয়ে নিল, রান্নাঘরের বাতিটি বিচূর্ণ করে দিল, যখন ধূসর জানালার কাচ ভেঙে তার ভেতর দিয়ে পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধ বেরিয়ে যেতে সাহায্য করল, তখন মা বসে বসে রান্নার অনুষ্ঠান দেখছিলেন। সুযোগ বুঝে কেউ একজন বিপরীত পাশের উঁচু জানালা বা ছাদ থেকে স্নাইপার রাইফেলে গুলি চালিয়েছেন। স্নাইপারের একটি মাত্র গুলি পরিবারের পাঁচ সদস্যের বুকের ভেতর বাজতে থাকা সব সুর থামিয়ে দেয়। ঘাতক এ ঘরটিতে চলমান সব ছন্দময় ব্যায়ামের যবনিকা টেনেছিলেন এবং সবাইকে এমন একটি দৃশ্যে আটকে দিয়েছিলেন যা এক মুহূর্ত আগের তুলনায় ভীষণ রকমের ভয়ংকর ছিল। তাদের ছানাবড়া চোখ এবং হাঁ হয়ে যাওয়া মুখে প্রচ- আঘাত ও আতঙ্ক ফুটে ওঠে। তবুও তাদের খোলা বাহু ডানেবামে দুলছে এবং তাদের কিছু সংখ্যক পা তখনও শূন্যে ছিল আর তাদের কোমর দুলছিল। তাদের শরীরগুলো নৃত্যের ভাবাবেশে স্ফুরিত হচ্ছিল। 

[মোহামেদ মাখজাঁগি একজন মিশরীয় লেখক ও চিকিৎসক। তিনি ১৯৫০ সালে মিশৌরি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মেডিসিনে পড়ার পর সাইকোলজিতে পড়াশোনা করে বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল বিপর্যয়ের সময় তিনি ইউক্রেনের কিয়েভ শহরে অবস্থানরত ছিলেন। সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘মেমোরিজ অব এ মেল্ট-ডাউন’ লিখেন। সাংবাদিক ও লেখক হওয়ার নেশায় মাখজাঁগি চিকিৎসা পেশা ছেড়ে দেন। কায়রোতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কুয়েতি শিল্প ও সংস্কৃতিবিষয়ক ম্যাগাজিন আল আরাবির জন্য কাজ করেন। তার বেশ কয়েকটি ছোটগল্প সংকলন ও উপন্যাস আছে]।

(গল্পটি ইয়াসমিন হানুসের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় ভাষান্তর করা হয়েছে)।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]