logo
প্রকাশ: ১২:৫৪:৩৪ AM, শনিবার, আগস্ট ২৫, ২০১৮
আলোচনা সমালোচনায় নাইপল
মা ই নু ল ই স লা ম মা নি ক

নাইপলকে ব্রিটেনের রানি কর্তৃক নাইট উপাধি প্রদান করা হয় ১৯৯০ সালে। ২০০১ সালে তিনি সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য সাহিত্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। পুরস্কারের কারণ হিসেবে নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, নাইপলকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, কেননা তার লেখায় রয়েছে ‘সৃজনশীলতায় অনুভবক্ষম ভাষাশৈলী ও শাশ্বত নিরীক্ষণ, যা আমাদের অবদমিত ইতিহাস দর্শনে বাধ্য করে।’ নোবেল ভাষণে নাইপল বলেন, ‘কিন্তু আমার সম্পৃক্ত যা কিছু মূল্যবান, তার সবটুকুই আমার ভেতরে রয়েছে। এর বাইরে আমার ভেতর যা কিছু আছে, তা এখনও সৃজিত হয়নি। এই বিষয়টা নিয়ে আমি খুব একটা অবগত নই। আমার ভেতরের অতিরিক্ত অংশটুকু পরের বইয়ের জন্য অপেক্ষমাণ।’

একজন মেক্সিকান মুসলিম যুবকের জন্য ট্রাম্প টাওয়ারে প্রবেশ করা যতটা দুঃসাধ্য কাজ, উইনস্টন চার্চিলের ইংল্যান্ডে একজন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানের পক্ষে প্রবেশ করা ছিল এর চেয়ে বহুগুণ কঠিন। মাত্র আঠার বছর বয়সে বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল নামের তরুণ এক শিক্ষার্থী চার্চিলের অক্সফোর্ডে পড়তে গিয়েছিলেন স্কলারশিপ নিয়ে। উপনিবেশবাদের চিন্তন ও মননকে ধারণ করে বয়সের সঙ্গে একই সমান্তরালে বেড়ে উঠেছিল তার মনোজগৎ। লেখালেখিতেও সে প্রভাব সুস্পষ্ট লক্ষণীয়। অক্সফোর্ডে পড়াশোনাকালীন তিনি আত্মপরিচয় নিয়ে মর্মপীড়ায় ভুগতেন, সীমাহীন হতাশা, বিষণœতা ও একাকিত্ব বোধ করতেন। মাতৃভূমি ত্রিনিদাদকে তিনি, ‘এক গুরুত্বহীন, সৃজনশীলতাবর্জিত, অসূয়ক... মানচিত্রের একটি বিন্দু’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, ত্রিনিদাদে জন্ম নেওয়াটা তার জীবনের এক অনিচ্ছাকৃত বৃহৎ ভুল ছিল। ত্রিনিদাদের মানুষের জীবনকে ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন প্রথম উপন্যাস ‘দ্য মিস্টিক ম্যাচিউর’। শুধু ত্রিনিদাদই নয়, জগতের সব উপনিবেশভুক্ত জনপদের প্রতি ছিল তার চরম নেতিবাচক, বিদ্বেষমূলক, তাচ্ছিল্যসূচক দৃষ্টিভঙ্গি। সমালোচকরা তাকে হার্ট অব ডার্কনেসের লেখক যোসেফ কনরার্ডের উত্তরসূরি হিসেবে অভিহিত করেন। তার লেখালেখি ও বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ  দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। নেতিবাচক সমালোচনা সংবলিত লেখা ‘অ্যান অ্যারিয়া অব ডার্কনেস’ বা ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চল’ এর কারণে তেত্রিশ বছর বয়সি অক্সফোর্ড ফেরত নাইপল নিষিদ্ধও হয়েছিলেন ভারতবর্ষে। তবে নিজের লেখার সৌকর্যে এসব সমালোচনাকে পেছনে ফেলে নাইপল নিজেকে তুলে ধরেছেন কালজয়ী লেখকদের কাতারে, অনন্য এক উচ্চতায়।

প্রথম উপন্যাস ‘দ্য মিস্টিক ম্যাচিউর’ প্রকাশের পর লেখেন তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘মিগুয়েল স্ট্রিট’। গল্পগ্রন্থটি মিগুয়েল স্ট্রিটে বসবাস করা লোকজনের জীবন নিয়ে পরম্পরায় লেখা। এই গল্পগ্রন্থটি প্রকাশিত হলে ব্যাপক সাড়া পড়ে এবং তিনি ১৯৬১ সালে গল্পগ্রন্থটির জন্য সমারসেট মম পুরস্কার লাভ করেন। তবে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘অ্যা হাউজ ফর মি. বিশ্বাস’ লিখেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এই উপন্যাসটিও ত্রিনিদাদের জীবনভিত্তিক। উপন্যাসের চরিত্র মহুন বিশ্বাস, যে জন্মগ্রহণ করে ভুল সময়ে ভুল স্থানে। সে সংগ্রাম করতে থাকে তার অস্তিত্বের তাগিদে, তার পরিচয়ের তাগিদে, তার সম্মানজনক জীবনের তাগিদে। উপন্যাসটি উপনিবেশ-উত্তর সময়ের পারিবারিক জীবন, দরিদ্রতা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা সংগ্রামকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে। এই উপন্যাসটি নাইপলের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। উপন্যাসটি টাইম ম্যাগাজিনের জরিপে গত শতাব্দীর ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ একশত উপন্যাসের তালিকায় স্থান পায়।

উপনিবেশ-উত্তর ভূখ-গুলোতে নাইপল অসংখ্যবার ভ্রমণ করেছেন, তাদের সমাজ-সংস্কৃতিকে তুলে আনার প্রয়াস দেখিয়েছেন নিজের লেখায়। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করার আকুলতাও তার ভ্রমণের উদ্দেশ্য হয়ে থাকতে পারে। ভারতীয় উপমহাদেশ নিয়ে তিনটি ভ্রমণ কাহিনি তিনি লিখেছেন, যা ইন্ডিয়ান ট্রিলজি হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছে। ইন্ডিয়ান ট্রিলজির প্রথমটি ‘অ্যান অ্যারিয়া অব ডার্কনেস’ প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে। এটি তার ভ্রমণের ঘটনাপঞ্জি। নাইপল এক বছর ভারতে অবস্থান করেছিলেন। ভারত থেকে ফিরে গিয়ে তিনি এই বইটি লিখেন। বইটিতে উপনিবেশ-উত্তর ভারতের জীবন নিয়ে নাইপল চরম হতাশা, তাচ্ছিল্য ও শ্লেষ ঢেলে দেন। উপনিবেশবাদের পতনের পর জওহরলাল নেহেরু যখন ভারতকে নতুন করে বিনির্মাণের চেষ্টায় ব্রত, তখন এটিকে এক ধরনের ভাঁড়ামি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন নাইপল। তিনি মনে করতেন, ভারতীয় ইংল্যান্ড ইতিহাসের একটি অংশ যা এখন মৃত। উপনিবেশবাদের চিহ্ন থেকে ভারতীয়দের বের হয়ে আসার প্রচেষ্টাকে তিনি চরম বিদ্রƒপ করে লিখেন, ‘ভারতীয়রা দেশকে সরাসরি দেখতে অক্ষম, দেশের ইতিহাসবোধ ধারণে অক্ষম। এগুলো ধারণ করার জন্য যে পরিমাণ ব্যথা-বেদনাকে পাড়ি দিতে হয় সে সক্ষমতা তাদের নেই। নইলে তারা ইতিহাসের ধ্বংসাবশেষকে লুপ্ত করতে পারে কীভাবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘বাল্যকালের দেশটি অন্ধকারাচ্ছন্নই রয়ে গেল। হিমালয়ের গিরিখাদের মতো দেশটিকে আমি কোনো দিনই ভেদ করতে পারব না।’ এটি প্রকাশিত হলে উপমহাদেশে বিতর্কের আগুন জ্বলে ওঠে। নাইপলের বিরুদ্ধে ভুলভাবে ভারতকে উপস্থাপনের অভিযোগ ওঠে। নাইপল নিষিদ্ধ হন ভারতীয় উপমহাদেশে। 

ভারত নিয়ে সীমাহীন বিদ্বেষ সত্ত্বেও দেশটি থেকে তিনি ফিরিয়ে নেননি দৃষ্টি। বারবার এসেছেন দুর্ভেদ্য এই গিরিখাদ জয় করতে। সে প্রয়াসের ধারাবাহিকতায় নাইপল ইন্ডিয়ান ট্রিলজির দ্বিতীয় ভ্রমণ কাহিনি ‘ইন্ডিয়া : অ্যা উন্ডেড সিভিলাইজেশন’ লেখেন ১৯৭৭ সালে। এই বইটিতেও তিনি ছিলেন নিস্পৃহ। চরম হতাশার হেমলক উগড়ে দিয়েছেন সারা বইটিতে। ইন্দিরা গান্ধীর ভারতে জরুরি আইন জারি হলে স্থবির হয়ে পড়ে সমগ্র ভারত। এ স্থবির ভারতকে তিনি ‘আনস্ট্রাকচারড’ জাতিগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করেন এবং বলেন, ‘এটি এক চরম উত্তর-উপনিবেশিক নৈরাজ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।’ ইন্ডিয়ান ট্রিলজির তৃতীয় গ্রন্থটি ‘অ্যা মিলিয়ন মাটিনিজ নাউ’ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। এই গ্রন্থটিতে তিনি চিরায়ত চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসেন। তাচ্ছিল্য, হতাশা আর বিদ্রুপের পরিবর্তে তিনি বেছে নেন সহনীয় কোমলধারার পর্যবেক্ষণ নীতি। ব্যাপক পর্যবেক্ষণের পর তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, ঘুমন্ত ভারতীয় সংস্কৃতিতে প্রত্যাশার বারুদ লুকায়িত আছে। তিনি এই চিরায়ত ইন্ডিয়ান সংস্কৃতির জাগরণ প্রত্যাশা করেন যেখানে, সেখানে এক ঐকান্তিক স্পৃহা লক্ষণীয়।

নাইপল বুকার পুরস্কার পেয়েছিলেন একই বিষয়বস্তু সংবলিত পাঁচটি  খুদে সাহিত্যকর্মের যুগ্ম সংকলন ‘ইন অ্যা ফ্রি স্টেইট’ এর জন্য। বইটিতে দুটি ছোটগল্প, চল্লিশ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাসিকা এবং একশত চল্লিশ পৃষ্ঠার একটি ছোট উপন্যাস রয়েছে। গল্প দুটিকে রাখা হয়েছে পরিশিষ্টের স্থানে। এই দুটি গল্প একজন অভিজ্ঞ লেখকের বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতার নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ নিয়ে নাইপল লিখেছিলেন ‘অ্যামাং দ্য বিলিভারস’। এ দেশগুলোতে ভ্রমণের সময় তিনি বৃদ্ধ-যুবক, নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন স্তরের লোকের সঙ্গে একত্রিত হন যাদের তিনি বিলিভার হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি অনুভব করেন এসব লোক তাদের বিশ্বাসের প্রকৃত পবিত্রতা পুনরুদ্ধারে নিরন্তর সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

নাইপলকে ব্রিটেনের রানি কর্তৃক নাইট উপাধি প্রদান করা হয় ১৯৯০ সালে। ২০০১ সালে তিনি সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য সাহিত্যের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। পুরস্কারের কারণ হিসেবে নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, নাইপলকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, কেননা তার লেখায় রয়েছে ‘সৃজনশীলতায় অনুভবক্ষম ভাষাশৈলী ও শাশ্বত নিরীক্ষণ, যা আমাদের অবদমিত ইতিহাস দর্শনে বাধ্য করে।’ 

নোবেল ভাষণে নাইপল বলেন, ‘কিন্তু আমার সম্পৃক্ত যা কিছু মূল্যবান, তার সবটুকুই আমার ভেতরে রয়েছে। এর বাইরে আমার ভেতর যা কিছু আছে, তা এখনও সৃজিত হয়নি। এই বিষয়টা নিয়ে আমি খুব একটা অবগত নই। আমার ভেতরের অতিরিক্ত অংশটুকু পরের বইয়ের জন্য অপেক্ষমাণ।’ 

অর্ধশতাব্দীর লেখালেখি জীবনে নাইপলের ত্রিশটিরও বেশি সাহিত্যকর্ম রয়েছে যার মধ্যে কথাসাহিত্য, গদ্য, আত্মজীবনী ও ভ্রমণ কাহিনি। নাইপলের মধ্যে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি দেখা যেত, বিশেষত তিনি যখন কোনো বই লেখা সম্পন্ন করতেন তিনি বলতেন, লেখার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। নাইপল লিখে গেছেন অকাতরে। বিশ্বসাহিত্যের ডানায় যোগ করেছেন অসংখ্য নতুন পালক। সাহিত্যপ্রেমীদের মনে তিনি চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন নিরন্তর। 

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]