logo
প্রকাশ: ১২:২৩:৫০ AM, শনিবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮
জীবে দয়া করে যেইজন
মুফতি হেলাল উদ্দীন হাবিবী

পৃথিবীর সব সৃষ্টিজীব মহান আল্লাহ তায়ালার মাখলুক। প্রত্যেক সৃষ্টিজীবই মহান স্রষ্টার সৃষ্টি নৈপুণ্যের বহিঃপ্রকাশ। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র প্রতিটি প্রাণী তাঁর অনেক আদরের এবং তিনি সব জীবের রিজিকদাতা। বৈচিত্র্যময় হাজারও মাখলুক সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি সাজিয়েছেন এ বিশাল জগৎ সংসার। দয়াময় প্রভুর এসব আয়োজন মানবজাতির কল্যাণের জন্য এবং তিনিই এ জগৎ সংসারের একমাত্র অভিভাবক। পাহাড়, নদী কিংবা সাগরতলের প্রতিটি প্রাণীর তিনি খবর রাখেন। সব সৃষ্টিজীবই দিবা-রাত্রি তাঁর তসবিহ পাঠে মশগুল। 

মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন, ‘তারা কি লক্ষ্য করে না; তাদের মাথার ওপর উড়ন্ত পখিদের প্রতি, তারা (কখনও) ডানা বিস্তারকারী এবং (কখনও) ডানা সংকোচনকারী? রহমান আল্লাহ তায়ালাই তাদেরকে স্থির রাখেন। তিনি সর্ববিষয় দেখেন।’ (সূরা মুলক : ১৯)।
মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী : ‘নভোম-ল ও ভূম-লে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করে। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁরই। তিনি সর্ব-বিষয়ে শক্তিমান।’ (সূরা তাগাবুন : ১)।
কোনো জীবকে কষ্ট দেওয়া মানে মহান মালিকের সৃষ্টি পরিবারকে কষ্ট দেওয়া। পক্ষান্তরে কোনো জীবের প্রতি দয়া করা মানে মহান স্রষ্টার পরিবারের প্রতি দয়া করা। আর যে মহান স্রষ্টার পরিবারের ওপর দয়ার্দ্র হয়, রাব্বুল আলামিন তার ওপর অসীম দয়ার ভা-ার খুলে দেন। 
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘অনুগ্রহকারীদের প্রতি পরম করুণাময় অনুগ্রহ করে থাকেন। তোমরা দুনিয়াবাসীর ওপর অনুগ্রহ কর, এতে আসমানে অবস্থানকারী তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করবেন।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, নবীদের মধ্যে কোনো এক নবীকে একটি পিপীলিকা দংশন করলে তিনি পিপীলিকাদের গোটা বস্তি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং তা জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। অতঃপর মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর কাছে ওহি পাঠালেন, তোমাকে একটি পিপীলিকা দংশন করল, আর তুমি আল্লাহর প্রশংসাকারী একটি উম্মতকেই পুড়িয়ে ফেললে! (বোখারি, মুসলিম)।
যারা সৃষ্টিজীবের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করে, দয়াময় প্রভু তাদের দিকে ক্ষমার হস্ত প্রসারিত করেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলছিল; সে খুব পিপাসার্ত হয়ে পড়ল এবং সামনে একটি কুয়া পেল। সে তাতে নেমে পানি পান করল। কুয়া থেকে ওঠে দেখল, একটি কুকুর পিপাসার কারণে জিহ্বা বের করে কাদামাটি চাটছে। লোকটি বুঝতে পারল যে, পিপাসার কারণে আমার যে অবস্থা হয়েছিল কুকুরটিরও সে অবস্থা হয়েছে। অতঃপর সে আবার কুয়ায় নেমে নিজের পা-মুজায় পানি ভরে ওপরে নিয়ে এলো এবং কুকুরটিকে তা পান করাল। এ কারণে মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে পুরস্কৃত করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। সাহাবিরা আরজ করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! চতুষ্পদ প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনেও কি আমাদের জন্য সওয়াব রয়েছে?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, প্রত্যেক জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শনে সওয়াব রয়েছে।’ (বোখারি, মুসলিম)।
পক্ষান্তরে অন্যায়ভাবে কোনো জীব-জানোয়ারকে কষ্ট দেওয়া অপরাধ ও গোনাহের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘এক মহিলা একটি বিড়ালের ওপর জুলুম করার কারণে জাহান্নামি হয়ে গেছে। সে বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল অথচ কোনো খাবার দেয়নি।’ (বোখারি, মুসলিম)।
সৃষ্টিজীবের প্রতি মহানবী (সা.) এর ভালোবাসা দয়া ও অনুগ্রহ ছিল অতুলনীয়। অহেতুক কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেওয়াকে তিনি খুব অপছন্দ করতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আমরা এক সফরে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে ছিলাম। এক জায়গায় একটি চড়–ই পাখিকে দুটি বাচ্চাসহ দেখতে পেলাম। আমরা বাচ্চা দুটিকে হাতে তুলে নিলাম। ফলে মা পাখিটি অস্থির হয়ে আমাদের মাথার ওপর ঘোরাঘুরি করতে লাগল। মহানবী (সা.) তখন বললেন, পাখিটির বাচ্চা ছিনিয়ে নিয়ে কে তাকে কষ্ট দিয়েছে? তার বাচ্চা তাকে ফিরিয়ে দাও। (আবু দাউদ)। 
একদিন মহানবী (সা.) এক আনসারি সাহাবির বাগানে প্রবেশ করলে একটি উট তাকে দেখে কাঁদতে লাগল। মহানবী (সা.) উটটির কাঁধ ও মাথার পেছনের অংশে হাত বুলিয়ে দেওয়ার পর সে কান্না বন্ধ করল। মহানবী (সা.) বাগানের মালিকের কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, এ উটটি কার? তখন আনসারি সাহাবি বললেন, আমার। অতঃপর মহানবী (সা.) তাকে বললেন, মহান আল্লাহ তায়ালা তোমাকে এ উটের মালিক বানিয়েছেন, অথচ তুমি কি এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো না? এ উটটি তোমার বিরুদ্ধে আমার কাছে অভিযোগ করেছে, তুমি তাকে দিয়ে অধিক বোঝা বহন করাও; কিন্তু তাকে চাহিদা মোতাবেক খাবার দাও না। (আবু দাউদ)।
মহান স্রষ্টার সৃষ্ট প্রতিটি জীবের প্রতি সর্বোচ্চ অনুগ্রহ প্রদর্শন করা প্রত্যেক মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও ইসলামের মৌলিক দীক্ষা। সৃষ্টিজীবকে কষ্ট দিয়ে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় না। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের মানবিক হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]