logo
প্রকাশ: ১২:৩০:০৩ AM, শনিবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮
রানি বিলকিসের সিংহাসন সমাচার
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

ঈমানের স্বাদ গ্রহণের পর বিলকিসের কাছে তার অমূল্য সিংহাসনও মনে হবে আয়াজের ছেঁড়া আলখেল্লার মতো। মওলানা আরও বলেন, তুমি যদি তোমার অতীতকে স্মরণ করো, কীভাবে মাতৃগর্ভে শুক্রবিন্দু, ভ্রƒণ, জমাট রক্ত, গোশতপি-, অস্থি গঠন ও প্রাণ সঞ্চার হলো, তারপর কদর্যপথ অতিক্রম করে দুনিয়াতে এলে, তাহলে বুঝতে পারবে, মৃত্যুর পর তোমার পরকালও অকাট্য সত্য

 

আল্লাহর নবী, দুনিয়ার বাদশাহ সুলায়মান (আ.) এর রাজত্ব ছিল মানুষ, জিন ও পশুপাখির ওপর। তিনি সাবা রাজ্যের পশুপাখিসহ আমজনতাকে আহ্বান জানালেন আল্লাহর হুকুমের অনুগত হওয়ার। তার আহ্বানে চারদিকে প্রাণের জোয়ার বয়ে গেল। সবচেয়ে বেশি প্রাণিত হলো ‘সাবার রানি’ বিলকিস। মওলানা রুমি বলেন, 

চোঁকে বিলকিস আয দিলও জা’ন আযম কর্দ
বর যমা’নে রাফতে হাম আফসোস খার্দ
বিলকিস যখন প্রাণাসক্ত হলো হৃদয় মনে
আফসোস করল অতীতের দিনগুলো স্মরণে।
অতীতে ক্ষমতা চর্চার পেছনে যে অনর্থক সময় চলে গেল তার জন্য বিলকিস অনুশোচনায় জ্বলতে লাগল। অনুতাপে ধন-দৌলত রাজত্ব ছেড়ে দিল। প্রেমের পথে প্রেমিক যেভাবে নামধামকে ঘৃণা করে, বিলকিসের মনেও সে ধরনের ঘৃণা জাগল সুনাম সুখ্যাতির প্রতি। বিলকিসের চোখে-মুখে এখন বেঘোর অবস্থা। এতদিনকার দাসদাসী, দরবার, শান-শওকত তার চোখে এখন কতক পচা পেঁয়াজ। বাগান, রাজপ্রাসাদ, নদী, ঝরনা বিনোদনের নানা আয়োজন তার চোখে হাম্মামের পানি গরম করার লাকড়ির চেয়ে বেশি মূল্য রাখে না। আসলে প্রেম যখন প্রবল হয় প্রিয়তম ছাড়া যত মূল্যবান জিনিস ঘৃণ্যরূপেই প্রতীয়মান হয়। প্রেমের প্রতাপে চুনি-পান্না, মণিরতœ পচা সবজির মতো আকর্ষণ হারায়। মওলানা বলেন একেই বলে ‘লা’Ñ না, নাই, নয়। 
লা ইলাহা ইল্লাহু ঈনাস্ত আই পানা’হ
কে নমা’য়দ মাহ তো রা’ দীগে সিয়া’হ
লা ইলাহা ইল্লাহুর অর্থ এটাই ওহে আশ্রয়প্রার্থী!
আলোকিত চাঁদকে মনে হবে কুচকুচে ডেকচি।
‘লা ইলাহা ইল্লাহু’ (নেই কোনো উপাস্য তিনি ব্যতীত) অথবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (নেই কোনো উপাস্য একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত) জিকির হলো সুফি সাধনার প্রধান জপনা। দুনিয়ার সব সম্পর্ক আকর্ষণ ছিন্ন করে তার জন্য প্রেমাসক্ত হওয়ার এ জপনার মাঝেই লুকায়িত হৃদয়ের সান্ত¡না। রানি বিলকিস এখন সেই প্রেমে হাবুডুবু খায় বাদশাহ সুলায়মানকে পাওয়ার আশায়। ধনসম্পদ, কোষাগার, সৈন্যসামন্ত কোনো দিকে তার মনোযোগ নেই। তবে একটি আকর্ষণ এখনও দখলে রেখেছে তার মনের আসন। সেই আকর্ষণ হলো তার মহামূল্যবান সিংহাসন।
সুলায়মান (আ.) দূর থেকে বুঝতে পারলেন বিলকিসের মনের না বলা কথা। কথায় বলে ‘দিলে দিলে রাস্তা আছে, মনের কথা জাগে মনে।’ সুলায়মান তো পিঁপড়ার আলাপচারিতাও দূর থেকে বুঝতে পারেন, কাজেই বিলকিসের মনের কথা বোঝা তো অসাধ্য কিছু নয়। কোরআন মজিদে এরশাদ হয়েছে, ‘একবার তিনি (সুলায়মান) সেনাবাহিনী নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন যখন তারা পিপীলিকা অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছল, তখন একটি পিপীলিকা (পিপীলিকার রানি অন্য পিপীলিকাদের) বলল, হে পিপীলিকার দল! তোমরা তোমাদের নিজ নিজ গর্তে প্রবেশ করো। অন্যথায় সুলায়মান ও তার বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদের পায়ের তলায় পিষ্ট করে ফেলবে।’ (সূরা নামল : ১৮)।
বস্তুত সুলায়মান (আ.) দূর থেকে দেখলেন, বিলকিস মনে প্রাণে সমর্পিত হলেও সিংহাসনের মায়ায় এখনও বন্দি। মওলানা বলেন, তাওহিদের আহ্বানে দুনিয়ার সব বন্ধন ছিন্ন করার পরও বিলকিস সিংহাসনের মায়া ছাড়তে পারেনি কেন, তার ব্যাখ্যা দিতে গেলে মসনবির গল্প অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। সংক্ষেপে এতটুকু বলি, হাতের কলমের কোনো প্রাণ নেই, অনুভূতি নেই। এরপরও কলমের সঙ্গে লেখকের সখ্য ও অটুট আকর্ষণ কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সিংহাসনের সঙ্গে বিলকিসের সম্পর্কও এরকমই। মওলানা বলেন, সবচেয়ে বড় কথা, তার সিংহাসন ছিল শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো বিভিন্ন অংশের সংযোজন। খুলে আনার সুযোগ ছিল না, তুলে আনাও অসাধ্য ছিল বিরাট সিংহাসন। 
সুলায়মান মনে মনে বললেন, বিলকিস যখন তাওহিদের পানপেয়ালা আকণ্ঠ পান করবে, এ সিংহাসনের মায়াও অবশেষে ত্যাগ করবে। তবুও শিশুদের মনে খেলনার আকর্ষণের মতো সিংহাসনের মায়া তার মনে গেঁথে আছে। এর আকর্ষণ ছিন্ন করতে হলে তার সামনে সিংহাসনটি হাজির করতে হবে সাক্ষাৎকালে। যাতে সে বুঝতে পারে যে, এ সিংহাসনও আয়াজের ছেঁড়া জামার চেয়ে বেশি কিছু নয়। 
ভারতবিজয়ী সুলতান মাহমুদের প্রিয় গোলাম ছিল আয়াজ। প্রতিদিন ভোরে আয়াজ তার কামরায় ঢুকে তারপর দরবারে হাজির হয়। হিংসুকরা আয়াজের ব্যাপারে সুলতানের কান ভারি করে। সুলতান মাহমুদ জিজ্ঞাসা করেন, কী হে আয়াজ! রোজ রোজ দরবারে আসার আগে তোমার কামরায় গিয়ে কি কর। আয়াজ জবাব দেয়। জাহাঁপনা! আপনার নেক নজরে আমার সেতারা আজ বুলন্দ। কিন্তু একদা এখানে আমার দাসত্বের জীবন ছিল। তখন আমার পরিধেয় ছিল ছেঁড়া আলখেল্লা। সেটি আমার কামরায় ঝুলিয়ে রেখেছি। আমি সেই জামায় চুমো দেই, যাতে অতীত আমার সামনে থাকে আর আপনার দয়া অনুগ্রহে আমার এত যে সম্মান, তা ভুলে না যাই। 
ঈমানের স্বাদ গ্রহণের পর বিলকিসের কাছে তার অমূল্য সিংহাসনও মনে হবে আয়াজের ছেঁড়া আলখেল্লার মতো। মওলানা আরও বলেন, তুমি যদি তোমার অতীতকে স্মরণ করো, কীভাবে মাতৃগর্ভে শুক্রবিন্দু, ভ্রƒণ, জমাট রক্ত, গোশতপি-, অস্থি গঠন ও প্রাণ সঞ্চার হলো, তারপর কদর্যপথ অতিক্রম করে দুনিয়াতে এলে, তাহলে বুঝতে পারবে, মৃত্যুর পর তোমার পরকালও অকাট্য সত্য। নাস্তিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরা যে পরকালীন জীবনকে অস্বীকার কর, এ অস্বীকারের মধ্যেই আছে পরকালের স্বীকারোক্তি। এক ব্যক্তি কোনো বাড়ির সামনে গিয়ে ডাক দিল, বাড়িতে কেউ আছে? ভেতর থেকে জবাব দিল, বাড়িতে কেউ নেই। আগন্তুক বুঝতে পারে নিশ্চয়ই বাড়ির ভেতরে লোক আছে। নিজেকে লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। নচেৎ জবাব শোনা যায় কীভাবে। পরকাল নেই নেই যারা বলে, আসলে তারাই সাক্ষী দেয় যে, পরকাল অবশ্যই আছে। মওলানা তাদের উদ্দেশে বলেন, শুরু থেকে তোমার জীবনের প্রতিটি ধাপকে মনে করতে এটিই একমাত্র জীবন। চলনে-বলনে হাবভাব ছিল, পরের কোনো ধাপ নেই, তার জন্য তুমি প্রস্তুত নও। 
মায়ের গর্ভের কবর ছেড়ে দুনিয়াতে এসেছ। তারপর আবারও কবরে গিয়ে পরকালে উত্থিত হবে, এখনও এ বাস্তবতা অস্বীকার কর অযৌক্তিকভাবে। সুলায়মান (আ.) এর জবানিতে মওলানা বলেন, খেলনার প্রতি শিশুর আসক্তির মতো সিংহাসনের প্রতি বিলকিসদের আসক্তিও একদিন শেষ হয়ে যাবে। এ সত্যটি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আপাতত সিংহাসন এখানে হাজির করে দেখাতে হবে। বিলকিস যেন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়। 
‘সুলায়মান বলল, হে আমার পারিষদবর্গ! তারা আত্মসমর্পণ করে আমার কাছে আসার আগেই তোমাদের মধ্যে কে তার সিংহাসনটি আমার কাছে নিয়ে আসতে পারবে?’ একটি শক্তিশালী জিন (ইফরিত) বলল, আপনি আপনার এ বৈঠক থেকে ওঠার আগেই আমি তা এনে দেব এবং এ ব্যাপারে আমি অবশ্যই ক্ষমতাবান, বিশ^স্ত। (সূরা নামল : ৩৮, ৩৯)।
সুলায়মান (আ.) এর সভাসদদের মধ্যে একজন ছিল আসেফ, ইসমে আজমের জ্ঞান ছিল তার কাছে। জিন ইফরিত ছিল জাদুর ওস্তাদ; আর আসেফ ছিলেন আল্লাহর পবিত্র মহানাম ‘ইসমে আজম’ এর আমানতদার। তিনি বললেন, এ কাজে এত বেশি সময় লাগবে কেন? 
গোফত আসেফ মন বে ইসমে আ’জামাশ
হা’জের আরম পীশে তো দর য়্যক দামাশ
আসেফ বলল, আল্লাহর ইসমে আজমের গুণে
হাজির করব সিংহাসন চোখের পলকে মুহূর্তে।
কোরআন মজিদের ভাষায়, ‘যার কিতাবের জ্ঞান ছিল সে বলল, আপনি চোখের পলক ফেলবার আগেই আমি তা আপনাকে এনে দেব। সুলায়মান যখন তা সম্মুখে রক্ষিত অবস্থায় দেখতে পেল তখন বলল, এটি আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করতে পারেনÑ আমি কৃতজ্ঞ না অকৃতজ্ঞ। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে তো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিজেরই কল্যাণের জন্য। এবং যে অকৃতজ্ঞ সে জেনে রাখুক যে, আমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত, মহানুভব।’ (সূরা নামল : ৪০)।
হজরত সুলায়মান (আ.) এমন অসাধ্য সাধনের জন্য আল্লাহর শোকর করলেন। সিংহাসনটির  দিকে এক নজর তাকিয়ে বললেন, এত কতক কাঠের সংযোজন। অথচ এই চেয়ার, এই গদি, তার মায়ার জালে কত লোককে আবদ্ধ করে, কতশত আহম্মককে বধ করে। কত আহম্মক সিংহাসন পূজার মতোই মূর্তির পায়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে। অথচ যে সিজদা করে, যাকে সিজদা করে কেউ জানে না, বুঝতে চেষ্টা করে নাÑ এগুলো যে কতক জড়।
‘সুলায়মান বলল, তার সিংহাসনের আকৃতি পরিচয় না পাওয়ার মতো বদলে দাও; দেখি সে সঠিক দিশা পায়, নাকি সে বিভ্রান্তদের শামিল হয়। সেই নারী (বিলকিস) যখন এলো তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, তোমার সিংহাসন কী এরূপই? সে বলল, এটি যেন সেটিই। আমাদের এর আগে  (আপনার ক্ষমতা ও মর্যাদা সম্পর্কে) প্রকৃত জ্ঞান দান করা হয়েছে এবং আমরা আত্মসমর্পণও করেছি।’ (সূরা নামল : ৪১, ৪২)।

(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৪খ. বয়েত, ৮৫৯-৯১৪)

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]