logo
প্রকাশ: ১২:২৪:৩৩ AM, রবিবার, সেপ্টেম্বর ২, ২০১৮
প্রস্তুতির সময় এখনই
রাইসুল সৌরভ

কৃচ্ছ্রসাধনের এ যুগে এখনও ব্রিটিশ সরকার সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীদের জন্য বিলাতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ অব্যাহত রেখে যে স্বল্পসংখ্যক পূর্ণ তহবিল বৃত্তি চালু রেখেছে শিভনিং স্কলারশিপ তার মধ্যে অন্যতম। মেধাবী ও নেতৃত্বে যোগ্যতাসম্পন্ন তরুণদের সারা পৃথিবী থেকে বাছাই করে এ বৃত্তির আওতায় যুক্তরাজ্যে বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। সারা পৃথিবীতে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন এবং মর্যাদাপূর্ণ এ বৃত্তি ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে বিশ্বের ১৪১ দেশের প্রায় ৭০ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে মাত্র ১ হাজার ৭০০’র মতো শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স করার সুযোগ পেয়েছেন। তার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ৭০০ আবেদনকারীর ১৫ জন ২০১৭ সালে শিভনিং বৃত্তির জন্য মনোনীত হয়ে এরই মধ্যে ব্রিটেনে তাদের পড়ালেখার পাট প্রায় চুকিয়ে ফেলেছেন। 
মূলত যুক্তরাজ্য সরকারের ফরেন ও কমনওয়েলথ (এফসিও) অফিস এবং সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত এ স্কলারশিপে একজন শিক্ষার্থীকে তার পড়ালেখার পূর্ণ খরচ (ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে ১৮ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত), ব্রিটেনে বসবাস ও জীবনধারণের জন্য এক বছর পর্যন্ত মাসিক ভাতা; নিজ দেশ থেকে যাওয়া-আসার বিমান টিকিটসহ বিভিন্ন ভাতা, এমনকি এ স্কলারশিপের আওতায় প্রযোজ্য ভিসা ফি মওকুফ এবং ভিসা পেতে যে মেডিকেল টেস্ট করতে হয় তার ফিও বহন করা হয়। অর্থাৎ এক বছরের পড়াশোনার প্রাসঙ্গিক মোটামুটি সব খরচ এ স্কলারশিপের আওতায় বহন করা হয়। 
আবেদনের সময় : শিভনিং বৃত্তির জন্য মূলত অনলাইনে (িি.িপযবাবহরহম.ড়ৎম/নধহমষধফবংয) আবেদন চালু হয় আগস্ট মাসে (এ বছর ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের জন্য আবেদন চালু হয়েছে ৬ আগস্ট থেকে যা চলবে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত) এবং ক্লাস শুরু হয় পরবর্তী বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। তাই মোটামুটি এক বছরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া হিসেবে ধরে নেওয়া যায় একে। আগে ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে হলেও এখন স্বতন্ত্র সচিবালয় ও স্থানীয় দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে পুরো বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
আবেদনের যোগ্যতা : শিভনিং যেসব দেশের নাগরিকদের বৃত্তি দেয়, সেসব দেশের যে-কোনো একটির নাগরিক হতে হবে। বাংলাদেশিরা সে তালিকায় আছে; তবে ব্রিটেনে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে তিনি এক্ষেত্রে বিবেচিত হবেন না। ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি থাকতে হবে, যা দিয়ে বিলাতের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হওয়া যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। কমপক্ষে দুই বছরের কাজে অভিজ্ঞতা লাগবে; তাই সদ্য স্নাতক পাস করা ছাত্রছাত্রীরা আবেদনের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না; যদি ছাত্রাবস্থায় কাজের অভিজ্ঞতা (ইন্টার্নশিপ, তবে কোর্স সম্পন্ন করার জন্য নয়; পূর্ণকালীন; খ-কালীন; মজুরির বিনিময়ে বা ছাড়া, যাই হোক না কেন) বা স্বেচ্ছাসেবার দুই বছরের অভিজ্ঞতা না থাকে। ব্রিটেনে কাজের অভিজ্ঞতা গণনা করা হয় ঘণ্টা হিসেবে; তাই দুই বছরের অভিজ্ঞতা প্রমাণে ন্যূনতম ২ হাজার ৮০০ ঘণ্টা কাজের অভিজ্ঞতা দেখাতে হবে।
তবে ব্রিটিশ হাইকমিশন, ব্রিটিশ কাউন্সিল, অ্যাসোসিয়েশন অব কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটিস বা ব্রিটিশ সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের সাবেক বা বর্তমান কর্মী বা তাদের আত্মীয় এ বৃত্তির আওতাভুক্ত হবেন না। বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা প্রমাণে অবশ্যই আইইএলটিএসে গড়ে কমপক্ষে ৬.৫ (তবে কোনো মডিউলেই ৫.৫ এর কম নয়) থাকতে হবে (এক্ষেত্রে আপনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চান সেখানে স্কোর আরও বেশি চাইলে সেখানে ভর্তির জন্য তা পেতে হবে)। তবে আইইএলটিএস ছাড়াও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা প্রমাণের জন্য নির্ধারিত অন্যান্য যে-কোনো পরীক্ষার (বিস্তারিত জানা যাবে িি.িপযবাবহরহম.ড়ৎম/নধহমষধফবংয ওয়েবসাইটে) একটিতে কাক্সিক্ষত নম্বর পেলেও চলবে। শিভনিংয়ে আবেদন করার একটা বড় সুবিধা আবেদনের সময়ই আইইএলটিএস স্কোর ওয়েবসাইটে আপলোড করা লাগে না। স্কলারশিপের জন্য শর্তাধীনভাবে বিবেচিত হওয়ার পর এ বছরের আবেদনকারীরা সর্বশেষ ১১ জুলাই ২০১৯ পর্যন্ত তা শিভনিংয়ের নির্ধারিত পোর্টালে আপলোড করতে পারবে। তবে প্রস্তুতি নিতে হবে আগে থেকেই। তবে আবেদনকারীকে মনে রাখতে হবে, শিভনিংয়ে স্কলারশিপ পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ব্রিটেনে ডিগ্রি শেষ করে নিজ দেশে কমপক্ষে দুই বছর অবস্থান করতে হবে।
পড়ার বিষয় : আপনি যে বিষয়ে পড়তে ইচ্ছুক শিভনিংয়ের তালিকাভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৫০০ স্নাতকোত্তর কোর্স থেকে যে-কোনো তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে আবেদনের সময়ই ঠিক করে দিতে হবে। চাইলে আপনি একই বিষয় তিনটি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারণ করে দিতে পারেন বা তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ও হতে পারে। এক্ষেত্রে আপনি যেসব বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দের তালিকায় ঠিক করে দিচ্ছেন পরবর্তী সময়ে বৃত্তির জন্য সাময়িকভাবে মনোনীত হলে সেখানকার যে-কোনো একটি থেকে বিনা শর্তে ভর্তির অফার লেটার আপনাকেই জোগাড় করতে হবে। তাই আবেদন করার পাশাপাশি একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গেও ভর্তির ব্যাপারে যোগাযোগ করা ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মূলত বিষয় পছন্দ করে অনলাইনে আপনার আগের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার প্রমাণপত্র পাঠানোর প্রয়োজন পড়ে। এর বাইরে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আপনার নির্ধারিত বিষয়ে পড়ার আগ্রহের কারণ প্রবন্ধাকারে জানতে চাইতে পারে। শর্তাধীনভাবে বৃত্তি পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে জানালে সাধারণত বিনা খরচে ও শর্তে ই-মেইলে অফার লেটার পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা দেখিয়ে আপনি চূড়ান্তভাবে শিভনিং বৃত্তি পেতে পারেন। এমনিতে আগের কোনো ব্রিটিশ ডিগ্রি থাকলে কোনো অসুবিধা নেই; তবে ব্রিটিশ সরকারের কোনো বৃত্তি পেয়ে সেখানে পড়ে থাকলে শিভনিংয়ের জন্য আর আবেদন করা যায় না। 
আবেদনে পূর্ণতা আনার জন্য দুটি রেফারেন্স লেটার আপলোড করা লাগে; তবে তা প্রাথমিক বাছাইয়ের পর ইন্টারভিউয়ের জন্য বিবেচিত হলে ইন্টারভিউ বোর্ডে বা তার আগে নির্ধারিত ওয়েব পেজে আপলোড করতে হয়। রেফারেন্স লেটারে একাডেমিক ও প্রফেশনাল দুই ধরনের সমন্বয়ই থাকতে পারে। তবে লক্ষ রাখতে হবে শিভনিং যেহেতু নেতৃত্বদানে যোগ্যতাসম্পন্নদের স্কলারশিপ দিয়ে থাকে; তাই রেফারেন্স লেটারে যেন আপনার সে যোগ্যতা প্রয়োজনে উদাহরণসহ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এক্ষেত্রে আপনি যার কাছ থেকে রেফারেন্স লেটার সংগ্রহ করবেন তাকে আপনার ও শিভনিংয়ের চাহিদা ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে যেন আপনার কাক্সিক্ষত সব দিক সেখানে উঠে আসে।
বৃত্তি পেতে : শিভনিং বৃত্তি পেতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর (যদি কারও করা থাকে) পর্যায়ে অসাধারণ ফলাফল খুব গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয় না, এমনকি আপনি সরকারি না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন তা-ও বিবেচ্য বিষয় নয়। বরং আপনি যে বিষয় এখন পড়তে ইচ্ছুক তার সঙ্গে আপনার আগের পড়ালেখা বা কর্মের সংযোগ; ইংরেজি ভাষায় লিখতে ও গুছিয়ে বলতে পারার ভালো দক্ষতা; ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে আপনি যে বিষয়ে পড়তে চাচ্ছেন তার প্রাসঙ্গিকতা এবং তার সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে সরকারের অগ্রাধিকার ক্ষেত্রের সংগতি প্রভৃতি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয় বেশি। তাই আবেদন করার আগে বাংলাদেশে যুক্তরাজ্য হাইকমিশনের ওয়েব পেজ থেকে অগ্রাধিকার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে পারলে ভালো হয়। শিভনিংয়ের নিজস্ব ওয়েব সাইটেও দেশভিত্তিক অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো উল্লেখ থাকে।
অনলাইন আবেদন ফরমে নিজের সম্পর্কে তথ্য, যোগাযোগের ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রভৃতি বিষয়ের পাশাপাশি নিজের জীবনের উদাহরণসহ সর্বোচ্চ ৫০০ শব্দের মধ্যে চারটি প্রবন্ধ লিখতে হয়; নেতৃত্ব ও অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতা; নেটওয়ার্কিং দক্ষতা; আপনি পড়ার জন্য যে বিষয় নির্ধারণ করেছেন তার সঙ্গে আপনার আগের পড়ালেখা ও কর্মের সংযোগ এবং সে বিষয়ের ওপর ভবিষ্যৎ ভাবনা ও আগামীর কর্মপরিকল্পনা এ চারটি বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে হয়। আপনি বাছাইয়ের পরবর্তী পর্যায় অর্থাৎ ইন্টারভিউয়ের জন্য বিবেচিত হবেন কি না, তা মূলত নির্ধারণ করে এ চারটি প্রবন্ধে কত চমৎকারভাবে বাস্তব উদাহরণসহ বক্তব্য উপস্থাপন করা হচ্ছে তার ওপর। তাই সময় নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে একেবারেই নিজের কথাগুলো সাজিয়ে এখানে লেখা উচিত। কারও আগের আবেদনপত্র দেখে বা কোনো ওয়েবসাইটের সাহায্য নিয়ে না লেখাই ভালো। তাতে স্বকিয়তা বজায় থাকবে বেশি এবং অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কাও কমে যাবে। তাছাড়া আপনি নিজেই নিজের বক্তব্য সবচেয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন, যা অন্যের দ্বারা সম্ভব হবে না। এছাড়া ইন্টারভিউ পর্যায়ে মূলত আবেদনে উল্লিখিত বিষয়গুলো থেকেই প্রশ্ন করা হয়। তাই তখন আপনার দ্বারা সবকিছু ব্যাখ্যা করাও অনেক সহজ হবে। আপনাকে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে সবসময় সবার আগে প্রাধান্য দিয়ে হবে। প্রবন্ধগুলোতে খুব ভালোভাবে নিজের জীবনের উদাহরণ সহকারে নেতৃত্বের গুণাবলি ও অন্যান্য বিষয় তুলে ধরতে হবে। 
বিস্তারিত :www.chevening.org

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]