logo
প্রকাশ: ০৪:৫০:৪০ AM, মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০১৮
ইমরান খানকে আমি যতটুকু জানি
হামিদ মীর

১৯৯৪ সালে হাসপাতালটির উদ্বোধন হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানটি ইমরান খানের পূর্ণ মনোযোগ দাবি করেছিল। নওয়াজ শরিফ তাকে ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ২০ আসনের একটি জোট প্রস্তাব করেছিলেন; কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন

২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করার কয়েকদিন পর সাম্প্রতিক বৈঠকের শুরুতে ইমরান খান আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনার কি মনে আছে যে, আমি আমার রাজনৈতিক দলকে কীভাবে তৈরি করেছি এবং আমার সংগ্রামের দিনগুলোর কথা আপনার মনে আছে কি?’ এটা আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার ছিল না; বরং তার বনিগালার অফিসে কফি পানের নিমন্ত্রণ ছিল। তার আনুষ্ঠানিক শপথের কয়েকদিন আগে এখানে একটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। আমাকে তার অফিসের বাইরে আমার মোবাইল ফোন জমা দিতে বলা হয়েছিল। তিনি ইসলামাবাদের ইউফ্রেটিস এলাকা থেকে পাহাড়ে অবস্থিত বনিগালায় চলে যাওয়ার পর কয়েক বছরের মধ্যে আমার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেনি। আমি হঠাৎ বুঝতে পারি, আমি পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।

সাক্ষাতের আগে আমি খাইবার পাখতুনখোওয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পারভেজ খটক, তার পুরানো সহকর্মী ড. আরিফ আলভি এবং মুনিযা হাসান ইমরান খানের কার্যালয়ের একটি সজ্জিত ওয়েটিংরুমে বসেছিলাম। এই সপ্তাহের শেষ দিনে এটি নতুন প্রধানমন্ত্রীর ক্যাম্প অফিস হবে, কারণ ইমরান খান সপ্তাহের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে থাকবেন না। ইমরান খান আমার সঙ্গে হাসিমুখে মিলিত হলেন।
আমাদের কথোপকথনের সময় তিনি মুচকি হেসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সামনে আসন্ন চ্যালেঞ্জগুলোর কথা উল্লেখ করছিলেন। এবার তিনি নওয়াজ শরিফ বা আসিফ জারদারি সম্পর্কে কথা বলছিলেন না। তিনি জ্বালানি সংকট, পানি সংকট ও ঋণ সম্পর্কে কথা বলছিলেন। আমি বললাম, সমস্যাগুলো বড় এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দলও বড়। তিনি বলেন, ‘অনেকে বলেছিলেন যে ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না এবং এখন একই লোকরা বলছেন যে ইমরান খান আমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারেন না। কিন্তু আপনি অপেক্ষা করুন, দেখবেন যে আমি এসব সমস্যার সমাধান করব।’
ইমরান খানের ভালোভাবে জানা আছে যে, তাকে জাতীয় পরিষদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচনে কিছুটা সমস্যা মোকাবিলা করতে হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন খোলাখুলি হবে; কিন্তু স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার গোপন ভোটে নির্বাচিত হবেন। তিনি পূর্ণ আস্থাশীল ছিলেন যে, তিনি স্পিকারের নির্বাচনে সহজেই জয়ী হবেন। ‘আমি এই বিরোধিতা ভয় করি না, এটি একটি স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ বিষয়।’ এ কথা বলে তিনি আমাকে অবাক করে দেন যে, তিনি বেলুচ নেতা আখতার মেঙ্গলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার এবং তার ছয়টি দাবি সমর্থন করার জন্য প্রস্তুত। বেলুচিস্তান ন্যাশনাল পার্টি (বিএনপি) প্রধানের প্রথম দাবিটি হচ্ছে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে। নিখোঁজ সবাইকে আদালতে হাজির করার দাবি তারা উত্থাপন করবে।
জাতীয় পরিষদে তিনি মাত্র তিনটি আসন পেয়েছেন; কিন্তু ইমরান খান তিনটি আসনের কারণে তার দাবি সমর্থন করেননি। তিনি বলেন, ‘২০১২ সালে আমি আখতার মেঙ্গলের ছয়টি পয়েন্টকে সমর্থন দিয়েছিলাম এবং ২০১৮ সালে আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দাবিগুলো সমর্থনের চেষ্টা করব, কারণ আমি তাদের দাবি ভুল মনে করি না।’ যারা ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে খোলাখুলিভাবে কথা বলেছেন আখতার মেঙ্গল তাদের একজন। তিনি সামরিক বাহিনীর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে পুরানো সমালোচক। ইমরান খান আখতার মেঙ্গলের তিনটি আসনের ভোট ছাড়া প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন; কিন্তু বিপিএনের সঙ্গে তার যোগাযোগ সেসব লোকের জন্য একটি সতর্কবাতা, যারা ইমরানকে সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল মনে করেন এবং পার্লামেন্টে আখতার মেঙ্গলের মতো মানুষদের পছন্দ করেন না।
ইমরান খান সেনাবাহিনী ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মিলে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সমস্যা সমাধানে বদ্ধপরিকর। ইমরান খানই ২০০৩ সালে করাচি থেকে জিও নিউজ টেলিভিশনে প্রচারিত আমার টিভি শো ‘ক্যাপিটাল টক’-এ নিখোঁজ ড. আফিয়া সিদ্দিকির কথা উত্থাপন করেছিলেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল সালেহ হায়াত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ড. আফিয়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে বন্দি আছেন এবং ইমরান খান তার প্রসঙ্গে নীরব থাকতে পারবেন না। নিখোঁজ ব্যক্তিদের ঘটনাগুলো সরাসরি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সিকিউরিটি এজেন্সিগুলো জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার অভিযোগে বহুসংখ্যক মানুষকে তুলে নিয়ে গেছে। ইমরান খানও তাদের একজন, যারা বলেছিলেন, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ নয়; বরং আমেরিকার যুদ্ধ। আমরা নিজেদের লোকদের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে লড়াই করতে পারি না। আমাদের দাবি হলো, নিখোঁজ লোকদের আদালতে উপস্থিত করা হোক।’ 
অনেক সমালোচক তাকে ‘তালেবান খান’ আখ্যায়িত করেছিলেন। ২০০৫ সালে আমার একটি শো চলাকালীন পারভেজ মোশাররফ সরকারের তথ্যমন্ত্রী শেখ রশীদ আহমদ তাকে তারই সামনে ‘দুই টাকার ক্যাপ্টেন’ আখ্যা দিয়েছিলেন; কিন্তু আজ সেই শেখ তার লোকদের নিয়ে ইমরান খানের সঙ্গে জোটবদ্ধ। অথচ তিনি একসময় খানকে ঠাট্টা-তাচ্ছিল্য করেছিলেন এবং কিছু জায়গিরদার ও শিল্পপতির সহায়তায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ইমরান খান কঠোর সংগ্রাম করেছেন এবং কখনও শর্টকাট পথ বেছে নেননিÑ এই সত্য কেউ অস্বীকার করতে পারে না।
মুহাম্মদ খান জুনেজো সরকারের পতনের পর ১৯৮৮ সালে জেনারেল জিয়াউল হক ইমরান খানকে মন্ত্রিত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। খান তাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ১৯৯৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক কোরেশি সরকারের পক্ষ থেকে আবারও তাকে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়; কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে তার রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। আমি ছিলাম সেই ব্যক্তি যে তার রাজনীতিতে আসার বিষয়টি সমর্থন করতে পারছিলাম না। তার ক্যান্সার হাসপাতালের ব্যাপারে আমার দুশ্চিন্তা ছিল। ১৯৯৪ সালে হাসপাতালটির উদ্বোধন হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানটি ইমরান খানের পূর্ণ মনোযোগ দাবি করেছিল। নওয়াজ শরিফ তাকে ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ২০ আসনের একটি জোট প্রস্তাব করেছিলেন; কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি ১৯৯৭ সালে প্রথম নির্বাচনি লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন; কিন্তু সব জায়গায় খারাপভাবে হেরে যান।
২০০২ সালের নির্বাচনের কয়েকদিন আগে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ পিএমএল-কিউর সঙ্গে যোগদানের জন্য তাকে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু ইমরান খান অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। সেই সময় আইএসআইর মহাপরিচালক জেনারেল এহসান ইমরান খানকে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-কিউর সরকারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য রাজি করাতে চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। অবশেষে ইমরানের পিটিআই ২০০২ সালের নির্বাচনে মাত্র একটি আসন পায়। পরবর্তী সাত বছর ইমরান খান সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে পার্লামেন্টে ও পার্লামেন্টের বাইরে পারভেজ মোশাররফের নীতির বিরোধিতা করেন। তখন বেনজির ভুট্টো ও নওয়াজ শরিফ ছিলেন নির্বাসনে। ইমরান খান তাদের সঙ্গেও ছিলেন, যারা বরাবরই আমার টিভি শোতে পারভেজ মোশাররফের সমালোচনা করেছেন। 

হামিদ মীর : নির্বাহী সম্পাদক
জিও নিউজ, পাকিস্তান
ভাষান্তর : হামসব ডটকম থেকে অনুবাদ  করেছেন লিসানুল হক শাহরুমী

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]