logo
প্রকাশ: ০২:১৩:০৩ AM, মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮
পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়
সাঈদ কাদির

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য ইলমুল হাল তথা প্রয়োজনীয় সব বিষয়ের জ্ঞানার্জনকে ফরজ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানবিকাশের ক্ষেত্রে ইসলাম যতটা তাগিদ দিয়েছে, অন্য কোনো ধর্মে বিষয়টি সেভাবে স্থান পায়নি। তা সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে আমরা জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রে চরম উদাসীন। যে জাতির দুজন নারী পৃথিবীকে উচ্চশিক্ষার পথ খুলে দিল, সে জাতির অধিকাংশ সদস্যই এখন উচ্চশিক্ষার তালিম থেকে ক্রোশ ক্রোশ দূরে

স্পেনবিজয়ী সেনাপতি তারেক বিন যিয়াদ ও বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা সিয়াহ ইবনে বতুতা জন্মলাভ করেছিলেন মারাকাশ বা মরক্কোয়। এ কারণে দেশটির আলাদা একটা গর্ববোধ থাকতেই পারে। তবে মরক্কোর গর্ববোধের সবচেয়ে বড় জায়গা অন্যত্র, যা খুব কম লোকেরই জানা থাকার কথা। তা হলো পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মরক্কোর ফেজ নামক শহরে। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ। ঘটনা হলোÑ বিখ্যাত ব্যবসায়ী মুহাম্মাদ আল-ফাহরি মৃত্যুকালে অঢেল ধনসম্পত্তি রেখে যান। তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির ওয়ারিশ হন তার দুই মেয়ে ফাতেমা আল-ফাহরি ও মারইয়াম আল-ফাহরি। বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তিকে ধারাবাহিক কল্যাণকর খাতে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন তারা। সে লক্ষ্যে প্রথমে একটি মসজিদ ও তৎসংলগ্ন একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মুহাম্মাদ ফাহরি যেহেতু নিজ বাসভূমি তিউনিশিয়ার কারাওয়ান এলাকা থেকে হিজরত করে মরক্কোর ফেজে এসে থিতু হয়েছিলেন, সুতরাং তার গ্রামের নামেই মসজিদ ও মাদ্রাসার নামকরণ করেন কন্যাদ্বয়। বর্তমানে সেই মসজিদটিতে একই সময়ে ২২ হাজার লোক নামাজ পড়তে পারেন! 
৮৫৯ সালে ফাতেমা আল-ফাহরি ও মারইয়াম আল-ফাহরি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয় আল-করওয়াইন বিশ্ববিদ্যালয়। মরোক্কোর ঐতিহ্যবাহী শহর ফেজের ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অষ ছঁধৎধড়ঁরুরহব বিশ্ববিদ্যালয়। ইউনেস্কো এবং গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী বিশ্বের প্রাচীনতম এবং বিশ্বের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এটি। যার প্রবেশদ্বার রয়েছে ১৪টি। মরক্কো সরকার ঐতিহাসিক ফেজ শহর ও তার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টির দিকেও সুনজর রেখেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিল্ডিং-ইমারতের নির্মাণশৈলী ও রোডঘাট দেখে আন্দাজ করা যায়। এটি মরক্কোর উন্নত স্থাপত্যকলারও স্বাক্ষর বহন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির রয়েছে জগৎজোড়া খ্যাতি। লাইব্রেরিটা দেখতে যেমন দর্শনীয়, তেমনি এতে রয়েছে ইসলামি বইপুস্তকের বিশাল সমাহার। সেখানে কোরআনুল কারিমের অনুপম কিছু কপিও রয়েছে। সে ধরনের কপি পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। 
প্রতিষ্ঠানটিতে প্রথমে শুধু ইসলামের বুনিয়াদি কিছু বিষয়ের শিক্ষা ও হিফজুল কোরআনের তালিম চালু করা হয়। পরবর্তী সময়ে অ্যারাবিক গ্রামার, সংগীত, মেডিসিন ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা হয়। ১৯৪৭ সালে এটিকে জাতীয় শিক্ষাকার্যক্রম বোর্ডের অধীন করা হয়। ১৯৫৭ সালে থেকে দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষাÑ ফিজিক্স, কেমিস্ট্রিসহ বিদেশি ভাষাশিক্ষার অনুষদ চালু করা হয়। তখন থেকেই উন্নতির ধাপ অতিক্রম করতে শুরু করে জামিয়াতুল করওয়াইন বা করওয়াইন বিশ্ববিদ্যালয়। মর্জাদা লাভ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের। ফলে ১৯৬৫ সালে ‘ইউনিভার্সিটি অব আল-করওয়ান’ নামের খেতাব লাভ করে নেয়। পরবর্তীকালে মুসলিম বিশ্বের আধ্যাত্মিক ও শিক্ষা-সংস্কৃতি কেন্দ্রগুলোর প্রধানতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে এটি। বিশ্ববিদ্যালয়টি বহু বিশ্ববিখ্যাত আলেম-ওলামা, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীর জন্ম দিয়েছে। তার মধ্যে ইবনে খলদুন, ইবনে রুশদ, আল-ইদরিসি, আবু ইমরান আল-ফাসির নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। মুসলিম ছাড়া অনেক পাদ্রি ও বিখ্যাত বিখ্যাত খ্রিষ্টান প-িতও এখান থেকে ডিগ্রি হাসিল করেছেন। সেখানে ইসলামি ফিকহ, ইসলামের ইতিহাস, আইনবিদ্যা, ধর্মতত্ত্ব ও মালেকি ফিকহের তালিমও দেওয়া হয়। পাঠদানমাধ্যমও অত্যন্ত চমৎকার। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক, যাকে শায়খ বলা হয়। তার চারপাশ ঘিরে শিক্ষার্থীরা বসে যান। মাঝে বসে বড় আন্তরিক ভঙ্গিতে পাঠদান করেন শায়খ। শিক্ষার্থীরা শতভাগ মনোযোগ ও আদব-তমিজের সঙ্গে ওস্তাদ থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। শ্রেণিকক্ষের এমন অতুলনীয় পরিবেশ অন্যত্র বিরল। 
দেশ-বিদেশের বেশুমার ছেলেমেয়ে সেখানে শিক্ষারত। অনেকেই ধারণা করেন, আল-করওয়াইন বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ছেলে শিক্ষার্থীরাই শিক্ষাগ্রহণ করে। ধারণাটি ভুল। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনারেল সেক্রেটারি মুহাম্মদ বিন যুবায়ের নিশ্চিত করেছেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে ছেলেমেয়ে উভয় শ্রেণির শিক্ষার্থীই অধ্যয়নরত। তিনি আরও জানান, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী সংখ্যা ৮ হাজার এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন ১ হাজার। শিক্ষার্থীদের বড় একটি সংখ্যাই বিদেশি। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য যথার্থ হোস্টেলের ব্যবস্থাও রয়েছে। তিনি জানান, বিদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করতে বিশ্ববিদ্যালয়টি সদা প্রস্তুত। যে-কোনো রাষ্ট্র থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদনের ভিত্তিতে সেখান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা। বিচিত্র তথ্য হলো, গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করার পর গ্র্যাজুয়েটদের যে প্রথাগত গাউন পরানো হয়, সেটির প্রচলনও হয়েছে এখান থেকেই; যেটি মূলত আরবদের পোশাক জালাওয়ার আদলে তৈরি। এভাবে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গ্র্যাজুয়েটদের মাথায় যে ক্যাপ পরিয়ে দেওয়া হয়, এটিও অ্যারাবিক সংস্কৃতির অনুকরণ করে পরানো শুরু হয়েছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠান থেকে। 
কিছু মানুষের ভুল ধারণা রয়েছে যে, পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় মিসরের জামিয়া আল-আজহার। ধারণাটি সম্পূর্ণ অবাস্তব। কারণ জামিয়া আল-আজহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে। অথচ জামিয়া আল-করওয়াইনের প্রতিষ্ঠা সাল ৮৫৯। 
একদিকে মুসলমানদের জন্য এটি গর্বের ঐতিহ্য যে, দুজন মুসলিম নারী পৃথিবীর প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেখান থেকে শিক্ষালাভ করেছেন দুনিয়ার অনেক কিংবদন্তি মনীষী। শুধু মুসলিম মনীষীই নন, অমুসলিম পাদ্রিরা পর্যন্ত এখান থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করে নিজেদের ধন্য করেছেন। অন্যদিকে আফসোসের বিষয় হলো, প্রথম ওহিতেই মহান আল্লাহ মানুষকে জ্ঞানার্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। ইলম বা জ্ঞানবিজ্ঞানের মানদ-েই সৃষ্টির শুরুতে আদম (আ.) কে ফেরেশতাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করেছেন। 
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য ইলমুল হাল তথা প্রয়োজনীয় সব বিষয়ের জ্ঞানার্জনকে ফরজ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানবিকাশের ক্ষেত্রে ইসলাম যতটা তাগিদ দিয়েছে, অন্য কোনো ধর্মে বিষয়টি সেভাবে স্থান পায়নি। তা সত্ত্বেও বর্তমান সময়ে আমরা জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার ক্ষেত্রে চরম উদাসীন। যে জাতির দুজন নারী পৃথিবীকে উচ্চশিক্ষার পথ খুলে দিল, সে জাতির অধিকাংশ সদস্যই এখন উচ্চশিক্ষার তালিম থেকে ক্রোশ ক্রোশ দূরে।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]