logo
প্রকাশ: ০৫:৩৭:১৪ PM, বুধবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮
শৈশবের ছবি হাতে স্বজনের খোঁজে ডেনমার্ক থেকে পাবনা
কাজী বাবলা, পাবনা

শৈশবের ছবি হাতে স্বজনের খোঁজে ডেনমার্ক থেকে স্ত্রী এনিটি হোলমি হেবকে সঙ্গে নিয়ে পাবনা এসেছেন মিন্টো কার্স্টেন সনিক। ফেইসবুক বন্ধু স্বাধীন বিশ্বাসের সহায়তায় বাবা-মাসহ স্বজনের খুঁজে বুধবার পাবনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন মিন্টো কার্স্টেন সনিক।

শেকড়ের সন্ধানে স্ত্রীকে নিয়ে পাবনার পথে পথে ঘুরছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডেনিশ নাগরিক মিন্টো কারস্টেন সনিক। 
ছয় বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়া মিন্টো জানেন না তার বাবা-মা, এমনকি গ্রামের নামও। ছোটবেলার একটি ছবিকে সম্বল করে নিজের পরিবার ফিরে পেতে, মিন্টোর এই অসম্ভব অভিযান আবেগতাড়িত করেছে স্থানীয়দেরও। 

স্থানীয়রা জানান, আত্মপরিচয় সন্ধানে পাবনার অলিগলি পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এই ভীনদেশি মিন্টো ও এনিটি দম্পতি। জনে জনে লিফলেট দিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করছেন। বহুদিনের পুরনো এক বালকের ছবি দেখিয়ে জানতে চাইছেন চেনেন কিনা?

ছয় বছর বয়সে নিজের পরিবার থেকে ছিটকে পড়া এক শিশু মিন্টো। হারিয়ে গিয়েছিলেন পাবনার নগরবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে। শুধু এটুকুই স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। সঙ্গে আছে শৈশবের কয়েকটি ছবি আর শৈশবের পাসপোর্ট। বলতে পারেন না বাংলা। তিনি এখন ডেনমার্কের নাগরিক।

সেই ছবি হাতে নিয়ে ৪১ বছর পর পাবনায় ফিরে হারানো স্বজনদের খোঁজে পথে পথে ঘুরছেন মিন্টো কার্স্টেন সনিক ও তার স্ত্রী এনিটি হোলমি হেবকে। বাবা-মাকে খুঁজে পাবার আশায় বুধবার পাবনা প্রেসক্লাবে এসে সংবাদ সম্মেলন করেন মিন্টো কার্স্টেন সনিক।
 
মিন্টো পেশায় একজন চিত্রশিল্পী। চিকিৎসক স্ত্রী এনিটি হোলমি হেবকে সঙ্গে নিয়ে ১০ দিন আগে পাবনায় এসে একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান করছেন। গেল কয়েক দিন ধরে এই দম্পতি পাবনা শহর আর নগরবাড়ি এলাকায় ঘুরচ্ছে, যাচ্ছেন এ-গ্রাম থেকে সে-গ্রাম। নদীনালা, পথঘাট ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে চাইছেন- কেউ সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটির বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন কিনা।

মিন্টোর শৈশবের ছবিসহ বাংলায় লেখা একটি লিফলেট তারা বিলি করছেন। সেখানে লেখা- ‌'১৯৭৭ সালের দিকে প্রায় ৪০ বছর আগে আপনি কি আপনার পরিবারের কোনো সদস্যকে হারিয়েছেন?'

সংবাদ সম্মেলনে মিন্টো বলেন, শৈশবের আসল নাম তার আর মনে নেই। একটি শিশুসদন থেকে তাকে দত্তক নিয়েছিলেন ডেনমার্কের এক নিঃসন্তান দম্পতি। তাদের স্নেহে ডেনমার্কেই বড় হয়েছেন, বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে তাদের।
সেই শিশুসদন থেকে মিন্টো জানতে পেরেছেন, তার নাম মিন্টু। পাবনার নগরবাড়ি ঘাটে অভিভাবকহীন অবস্থায় তাকে খুঁজে পেয়েছিলেন ঢাকার ঠাঁটারিবাজার এলাকার চৌধুরী কামরুল হুসাইন নামের এক ব্যক্তি। তিনিই ১৯৭৭ সালের ৪ এপ্রিল তাকে শিশুসদনে রেখে যান। পরে পালক বাবা-মায়ের সঙ্গে মিন্টো চলে যান ডেনমার্কে। 

মিন্টো আরো বলেন, 'ছোটবেলায় বিষয়গুলো তেমনভাবে উপলব্ধি করতে না পারলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্মপরিচয়ের সঙ্কট দানা বাঁধতে থাকে মনের ভেতরে। কারণ ডেনমার্কে আমার কাছে অনেকে জানতে চেয়েছেন আমার শেকড়ের খবর। মানসিক কষ্ট আর যন্ত্রণা আমাকে উঁই পোকার মতো কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে। ডেনমার্কের জীবনে কোনো কিছুর অভাব হয়নি কখনো, কিন্তু একটি শূন্যতা সব সময় বুকের গভীরে ক্ষত তৈরি করে বাসা বাঁধে। আমি ডাঙায় তোলা মাছের মতো ছটফট করতে শুরু করলাম। কিছুই ভালো লাগত না। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেছি অকারণে। তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র হাতে ছিল না। তারপরও প্রাণের টানে নিজের বাবা-মা, স্বজনদের খোঁজে আমার পাবনায় আসা।'

দশ দিনের সন্ধানে আশা জাগার মতো কোনো তথ্য মিন্টো পাননি। সকাল বেলায় স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পথে পথে চলে তার খোঁজ। বাংলা বলতেও পারেন না, বুঝতেও পারেন না। কিন্তু বুকে হাত রেখে বাবা-মায়ের কথা বোঝাতে চান এবং তাদের সন্ধান চান।

তিনি বলেন, 'আমি বাংলাদেশে আসার পর চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলেই মনে হয় আমার সেই স্বজনদের গন্ধ পাচ্ছি। ছোটবেলায় বাংলায় হয়ত কথা বলতে পারতাম, পরে ভুলে গেছি। কিন্তু এখন বাংলা কথা কানে এলেও অন্যরকম এক অনুভূতি হয় আমার, আমি বলে বোঝাতে পারব না।'

নাড়ির টানে শেকড়ের খোঁজে প্রায় অসম্ভব এই চেষ্টায় মিন্টোকে সহযোগিতা করছেন পাবনার বাসিন্দা স্বাধীন বিশ্বাস। ফেইসবুকে পরিচয় থেকে তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব।

স্বাধীন বিশ্বাস বলেন, 'ফেইসবুকে কথা হলে ওকে দেশে আসতে বলেছিলাম আমি। ও চলে এসেছে। আমরা চেষ্টা করছি ওর স্বজনদের খুঁজে বের করার।' অনেকেই স্বজন সেজে এসেছে কিন্তু মিলাতে পারছে না মিন্টো।

স্বজনদের সন্ধানে ইতোমধ্যে পাবনার পুলিশের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন মিন্টো। সদর থানায় একটি এজহার দায়ের করেছেন তিনি।

পুলিশ মিন্টোকে সহযোগিতা করছে জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) শামিমা আকতার বলেন, 'পুলিশের পক্ষ থেকে যতটুকু সহযোগিতা করা সম্ভব তা করা হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলোও হয়ত তাকে সহযোগিতা করতে পারে।'  

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]