logo
প্রকাশ: ১১:৩০:১৫ PM, বুধবার, অক্টোবর ১০, ২০১৮
প্রজ্ঞার দাবি উত্তম চরিত্র
মাহফুয আহমদ

আল্লাহ তায়ালা শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) কে যেসব দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন, সেসবের একটি হচ্ছে ‘হিকমাহ’ শিক্ষা দেওয়া। সাধারণত তাফসিরবিদরা ‘হিকমাহ’ এর ব্যাখ্যা ‘সুন্নাহ’ ও হাদিস দ্বারা করে থাকেন। এর শাব্দিক অর্থ প্রজ্ঞা। তবে শিষ্টাচার, পরোপকার এবং যাবতীয় উত্তম চরিত্র এ ‘হিকমাহ’ এর অন্তর্ভুক্ত। সে জন্য পবিত্র কোরআনের একাধিক জায়গায় উত্তম গুণাবলিকে ‘হিকমাহ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন নিচের আয়াতগুলোতে (অনুবাদ) ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং বাবা-মার সঙ্গে সদ্বব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদের ‘উফ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না এবং বলো তাদের সঙ্গে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা। তাদের সামনে ভালোবাসার সঙ্গে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলো হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালনপালন করেছেন। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মনে যা আছে তা ভালোই জানেন। যদি তোমরা সৎ হও, তবে তিনি তওবাকারীদের জন্য ক্ষমাশীল। আত্মীয়স্বজনকে তার হক দান করো এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ এবং তোমার পালনকর্তার করুণার প্রত্যাশায় অপেক্ষমাণ থাকাকালে যদি কোনো সময় তাদের বিমুখ করতে হয়, তখন তাদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বল। তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না এবং একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে। নিশ্চয়ই তোমার পালকর্তা যাকে ইচ্ছা অধিক জীবনোপকরণ দান করেন এবং তিনিই তা সংকুচিতও করে দেন। তিনিই তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত, সবকিছু দেখছেন। দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। তাদের এবং তোমাদের আমিই জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই তাদের হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ। আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ। সে প্রাণকে হত্যা করো না, যাকে আল্লাহ হারাম করেছেন; কিন্তু ন্যায়ভাবে। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, আমি তার উত্তরাধিকারীকে ক্ষমতা দান করি। অতএব সে যেন হত্যার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন না করে। নিশ্চয়ই সে সাহায্যপ্রাপ্ত। আর এতিমের মালের কাছেও যেও না, একমাত্র তার কল্যাণ আকাক্সক্ষা ছাড়া; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যৌবনে পদার্পণ করা পর্যন্ত এবং অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মেপে দেওয়ার সময় পূর্ণ মাপে দেবে এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে। এটা উত্তম; এর পরিণাম শুভ। যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে। পৃথিবীতে দম্ভভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয়ই তুমি তো ভূপৃষ্ঠকে কখনই বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত প্রমাণ হতে পারবে না। এসবের মধ্যে যেগুলো মন্দকাজ, সেগুলো তোমার পালনকর্তার কাছে অপছন্দনীয়।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৩-৩৮)। এসব চরিত্রের আলোচনা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এটা ওই হিকমাহর অন্তর্ভুক্ত, যা আপনার পালনকর্তা আপনাকে ওহি মারফত দান করেছেন।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৯)। আরও দেখুনÑ ‘যখন লোকমান (আ.) উপদেশচ্ছলে তার ছেলেকে বললেন, হে বৎস, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা মহা অন্যায়। আর আমি মানুষকে তার বাবা-মার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দুই বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার বাবা-মার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে। বাবা-মা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন বিষয়কে শরিক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে সহাবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদের জ্ঞাত করব। হে বৎস, কোনো বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় অতঃপর তা যদি থাকে প্রস্তর গর্ভে অথবা আকাশে অথবা ভূগর্ভে, তবে আল্লাহ তা-ও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ গোপন ভেদ জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন। হে বৎস, নামাজ কায়েম করো, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ করো এবং বিপদাপদে সবর করো। নিশ্চয়ই এটা সাহসিকতার কাজ। অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না। পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করো এবং কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’ (সূরা লোকমান : ১৩-১৯)। শিষ্টাচারবিষয়ক এসব উপদেশ উল্লেখ করার আগে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি লোকমানকে প্রজ্ঞা দান করেছি এই মর্মে যে, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হও। যে কৃতজ্ঞ হয়, সে তো শুধু নিজ কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়। আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, আল্লাহ অভাবমুক্ত, প্রশংসিত।’ (সূরা লোকমান : ১২)। তেমনি ‘হিকমাহ’ শব্দটি দানখয়রাতের মতো প্রশংসিত গুণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। সামনের আয়াতগুলোর (অনুবাদ) দেখুনÑ ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধনসম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শিষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শিষে একশ করে দানা থাকে। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ।’ (সূরা বাকারা : ২৬১)। ‘শয়তান তোমাদের অভাব-অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তোমাদের নিজের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও বেশি অনুগ্রহের ওয়াদা করেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সুবিজ্ঞ।’ (সূরা বাকারা : ২৬৮)। ‘তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমাহ দান করেন এবং যাকে হিকমাহ দান করা হয়, সে প্রভূত কল্যাণকর বস্তু প্রাপ্ত হয়। উপদেশ তারাই গ্রহণ করে, যারা জ্ঞানবান।’ (সূরা বাকারা : ২৬৯)। মোটকথা, এসব দৃষ্টান্ত থেকে প্রতিভাত হয়, উত্তম চরিত্র ও শিষ্টাচারের সঙ্গে কোরআনে বিবৃত ‘হিকমাহ’ এর দৃঢ় যোগসূত্র রয়েছে। তার মানে উত্তম চরিত্রবান না হয়ে কেউ প্রকৃত ‘হিকমাহ’ (প্রজ্ঞা) এর অধিকারী হতে পারেন না। আর কোরআনি ‘হিকমাহ’ ব্যতিরেকে কেউ প্রকৃত চরিত্রবানও হতে পারেন না।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]