logo
প্রকাশ: ০৪:৩৩:৫৩ PM, শনিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৮
পঞ্চাশ বছর ধরে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন কুমারী মাধুরী বণিক
বিপ্লব ঘোষ, নবাবগঞ্জ (ঢাকা)

কোথাও খোলা উঠুনে চাটাই পেতে। আবার কোথাও কারো বাড়ির বারান্দায়। গত পঞ্চাশ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে এভাবেই শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন সদালাপী ও সাদা মনের মানুষ কুমারী মাধুরী বণিক। আদর্শ মানুষ গড়াই তার মূল উদ্দেশ্য। তার প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করে পাইলট, চিকিৎসক, জনপ্রতিনিধিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্টিত হয়েছেন।

দোহার-নবাবগঞ্জে শিশু, নারী ও প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার প্রসারে তার মাও শিক্ষা কেন্দ্রগুলো আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে স্ব-মহিমায়।

জানা যায়, ১৯৬৮ সালে ছাত্রজীবন থেকে সুবিধা বঞ্চিতসহ নারী ও শিশুদের অক্ষর জ্ঞান দান করে আসছেন তাঁর ফ্রি স্কুলে। মূলত ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরাই তার স্কুলের ছাত্র ছিলেন। বর্তমানে তিনি নবাবগঞ্জের কলাকোপা ও যন্ত্রাইল ইউনিয়নের ৩টি স্কুল ও দোহার পৌরসভার দক্ষিণ জয়পাড়া ও খাড়াকান্দার ২টি স্কুলে ২০জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং ১৭৫জন নিরক্ষর মা ও শিশুকে শিক্ষা দান করছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কলাকোপা ইউনিয়নের সমসাবাদ গ্রামের মোহাম্মদ আলীর বাড়ির উঠানে গিয়ে দেখা ও জানা যায়- উঠানে পাটি, ছালা, চাটাই পেতেছে শিক্ষার্থীরা। ক্লাসের শুরুতে শিশুরা রুটিন মাফিক সারিবদ্ধভাবে দ্বাড়িয়ে আছে। তার শিক্ষা পদ্ধতিও বেশ শ্রæতি মধুর। ক্লাসের শুরুতেই শেখান জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং শরীর চর্চা। দেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গুরুজনদের সম্মান করার শপথ তাঁর নিত্য দিনের ক্লাসের একটি অধ্যায়।

এছাড়া শিশুদের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে বিস্কুট, চকোলেটসহ নানান পুরস্কারও থাকে তাঁর স্কুলে। সপ্তাহের বৃহস্পতিবার তিনি শিশুদের খেলাধুলা করান। এতে বিজয়ীদের বিশেষ পুরস্কার দেন নিজের টিউশনির উপার্যন থেকে। তাই তার স্কুলের মা শিক্ষার্থীরা তাকে নারী প্রতিষ্ঠার আন্দোলন কর্মী বলে অভিহিত করেন।

সমসাবাদ গ্রামের ‘মা’ শিক্ষার্থী সালেহা বেগম বলেন, দুই মেয়ে মুনিয়া ও মুক্তাসহ আমি দিদির (মাধুরী বণিকের) স্কুলের শিক্ষার্থী। তাকে আমি মায়ের মতো দেখি। কারণ সে নিজের মায়ের মতো ব্যবহার করে। ক্লাসে নিজে পড়ি মেয়েদেরও পড়াই। তাঁর শিক্ষা পদ্ধতি আমার খুব ভালো লাগে। অল্প কদিনেই আমি নিজের নাম লিখতে শিখেছি। এখন মেয়েরা আর আমি ভালো ছাত্র।

সমসাবাদ গ্রামের শারিরিক প্রতিবন্ধী সিয়ামের মা জানায়, জন্ম থেকে প্রতিবন্ধি সিয়াম (১১)। হাটাচলা করতে পারে না। কিছুটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধিও। মায়ের কুলে চড়ে স্কুলে আসে সিয়াম। স্কুলে সে বর্ণমালা লিখতে পারে। এটা দিদি মনির (মাধুরী বণিক) জন্যই সম্ভব হয়েছে। তাইতো দিদি মণিকে আমি এতো ভালোবাসি।

মাধুরী বণিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অবিবাহিত। তার বর্তমান বয়স ৬৩ বছর। ১৯৭৭ সালে দোহার নবাবগঞ্জ কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ছাত্র জীবনে তিনি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা ছিলেন। ছাত্র থাকাকালীন ১৯৭০ সালে তিনি নারী আন্দোলন শুরু করেন। সেসময়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নারী সংগঠন নবাবগঞ্জ উপজেলা মহিলা সংঘ। তিনি সেসময় থেকে আজ পর্যন্ত সংগঠনের আজীবন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি অস্ত্র সংরক্ষণের কাজ করেছেন। তবুও তিনি মুক্তিযুদ্ধা সনদ গ্রহণ করেনি।

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ঘুর্ণিঝড়, প্রকৃতিক দূর্যোগসহ নানান সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তাছাড়া সামাজিক সচেতনতায় ইভটিজিং ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আন্দোলনে গ্রামে গ্রামে সভা করেছেন।

তিনি বর্তমানেও দূর্নীতি দমন কমিশনের উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সহ-সভাপতি, মহাকবি কায়কোবাদ মুক্ত স্কাউট গ্রুপের সহ-সভাপতি, আনন্দধারা ললিত কলা একাডেমীর উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ নবাবগঞ্জ উপজেলা শাখার সহ-সভাপতির দায়িত্বপালন করছেন। এতো ত্যাগের সম্মান তিনি পাননি তা নয়। ২০১৫ সালে সামাজিক কর্মের স্বীকৃতি স্বরুপ নবাবগঞ্জ উপজেলায় শ্রেষ্ঠ জয়ীতা পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। তাছাড়া সম্প্রতি ২০১৮’র উপজেলার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কর্তৃক শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা ভূষিত হয়েছেন।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]