logo
প্রকাশ: ০১:৩৫:৫৯ AM, শনিবার, এপ্রিল ২০, ২০১৯
গিবতকারী অপদস্থ হবেই
আহমদ আবদুল্লাহ

ইসলামের দৃষ্টিতে গিবত একটি জঘন্য অপরাধ। এর কারণে মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা অন্তর থেকে মুছে গিয়ে শত্রুতা সৃষ্টি হয় এবং একে অপরের মাঝে সুসম্পর্ক বিনষ্ট হয়। সুতরাং গিবত একটি গর্হিত কাজ। 
গিবত আরবি শব্দ। শাব্দিক অর্থ পরনিন্দা। অসাক্ষাতে অন্যের দোষত্রুটি বর্ণনা করা। ইসলামি পরিভাষায় কারও অসাক্ষাতে তার দোষত্রুটি বর্ণনা করা, যদিও সে দোষত্রুটি তার মধ্যে থাকে, তা গিবত। আল মুজামুল ওয়াসিত অভিধান প্রণেতা বলেন, ‘কোনো ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার দোষ কিংবা এমন বিষয় আলোচনা করা, যা তার উপস্থিতিতে করলে মনে কষ্ট পাবে, তাকেই গিবত বলা হয়।’
গিবত সম্পর্কে রাসুল (সা.) এর স্পষ্ট হাদিস রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা কি জানো গিবত কী?’ তখন সাহাবায় কেরাম বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল অধিক জ্ঞাত।’ এরপর রাসুল (সা.) বললেন, ‘তোমার ভাই সম্পর্কে এমন আলোচনা করা, যা শুনলে সে দুঃখিত হবে।’ একজন সাহাবি বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কি মনে করেন, আমি যা বলছি, তা যদি তার মধ্যে থাকে?’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘তুমি যা বলছ, তা যদি তার মধ্যে থাকে, তাহলে তা হবে গিবত আর যদি না থাকে, তাহলে তা অপবাদ।’ (মুসলিম : ২/৩২২)।
মহান রাব্বুল আলামিন এবং রাসুল (সা.) গিবত বা পরনিন্দাকে খুব ঘৃণিত কাজ বলে উল্লেখ করেছেন। এ কাজ থেকে দূরে থাকার জন্য মানবজাতিকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের কেউ একে অপরের পশ্চাতে নিন্দা করো না। কারণ তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একেই ঘৃণাই করো।’ (সূরা হুজুরাত : ১২)।
গিবতকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মৃত মানুষের মাংস খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সুতরাং মৃত মানুষের মাংস খাওয়া যেমন হারাম, তদ্রƒপ গিবত করাও হারাম। 
রাসুল (সা.) বলেন, “মেরাজের রজনীতে আমি এমন এক সম্প্রদায়ের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, যাদের নখ ছিল ধারালো। তা দিয়ে তারা তাদের মুখম-ল ও শরীরের মাংস আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরাইল (আ.) কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এরা কারা?’ তখন তিনি বললেন, ‘এরা সেসব লোক, যারা মানুষের গিবত করত এবং তাদের সম্মান নষ্ট করত।” 
হজরত আবু বরয়া আল আসলমি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে ওইসব লোক! যারা মুখে ঈমান এনেছে অথচ অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি, তোমরা গিবত করো না এবং অন্যের দোষত্রুটি অন্বেষণ করো না। কারণ যে তাদের দোষত্রুটি অন্বেষণ করবে, মহান রাব্বুল আলামিন তার দোষ অন্বেষণ করবেন। আর আল্লাহপাক যার দোষত্রুটি অন্বেষণ করবেন, তাকে অপদস্থ করে ছাড়বেন।’ (আবু দাউদ : ২/৩২৯)।
আল্লাহ তায়ালা হজরত মুসা (আ.) এর ওপর এ মর্মে ওহি অবতীর্ণ করেছিলেন যে, গিবত থেকে তওবাকারী ব্যক্তি হবে বেহেশতে গমনকারীদের সর্বশেষ। আর যে ব্যক্তি এ কাজে সর্বদা লিপ্ত থেকে মৃত্যুবরণ করবে, সে হবে জাহান্নামিদের মাঝে প্রথম।
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি কারও গিবত করে ফেলে এবং তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ না পায়, তাহলে গিবতকারী আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে এভাবে ‘আল্লাহুম্মাগফির লানা ওয়া লাহু’Ñ ‘হে আল্লাহ! আমাদের এবং তাকে ক্ষমা করে দাও।’ (মেশকাত : ৪১৫)। 
গিবত জঘন্য হওয়া সত্ত্বেও ফকিহ ও মুহাদ্দিসরা ছয়টি ক্ষেত্রে জায়েজ বলেছেন। 
১. মজলুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে : বিচারক বা যে তার বিচার করবে তার কাছে অত্যাচারীর জুলুমের বিবরণ দেওয়া। 
২. প্রকাশ্যে পাপাচারীর তথ্য ফাঁস করা : যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে পাপাচার করে, যেমনÑ মদ্যপায়ী, ডাকাত, পতিতা, ঘুষখোর, চোরাচালানি, রাষ্ট্রদ্রোহী ইত্যাদি। তাদের দোষ বর্ণনা করে মানুষকে সতর্ক করা হলে গিবতের আওতায় পড়বে না। 
৩. ফতোয়া চাওয়া : কোনো মুফতির কাছে গিয়ে যদি বলা হয়, অমুক আমার ওপর অত্যাচার করে অথবা বাবা বা ভাই বা স্বামী এরূপ করে, তার সম্পর্কে হুকুম কী? তাহলে বিষয়টি গিবতের আওতায় আসবে না। 
৪. কোনো অপকর্ম প্রতিহত করার জন্য : অপকর্ম প্রতিহত করা কিংবা কোনো পাপিকে সৎপথে আনার জন্য এমন ব্যক্তির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, যে তা প্রতিহত করতে পারবে বলে আশা আছে, তা গিবত বলে গণ্য হবে না।
৫. কোনো অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য যদি অনিষ্টকারীর দোষ বর্ণনা করে, তাহলে তা গিবত হিসেবে গণ্য হবে না। 
৬. কারও পরিচয় দানের ক্ষেত্রে : যেমনÑ কোনো লোক যদি ল্যাংড়া, খোঁড়া, অন্ধ, বেঁটে, টেরা ইত্যাদি উপাধিতে পরিচিত হয়, তখন তার পরিচয় দানের জন্য এসব উপাধি উল্লেখ করা জায়েজ। তবে তাকে খাটো বা অপমানিত করার জন্য এসব উপাধি প্রয়োগ করা হারাম।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]