logo
প্রকাশ: ১০:৪৯:১২ PM, বুধবার, এপ্রিল ২৪, ২০১৯
ওয়াজ-নসিহতে ইসলামি শিষ্টাচার রক্ষা জরুরি
ড. মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ

ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অন্যতম মাধ্যম ইসলামি আলোচনা। এসব আলোচনা ওয়াজ মাহফিল হিসেবে অধিক পরিচিত। কোরআনও এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে। (দেখুন : সূরা নাহল : ১২৫)। অনেকেই এ পদ্ধতিতে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ পদ্ধতিতে সাধারণ মানুষ ইসলামি বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা লাভ করে নিজেদের জীবনে তা পালনে উদ্বুদ্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি কিছু বিষয় দাওয়াতের এ বহুল প্রচলিত মাধ্যমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে এবং কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাও ঘটছে। তন্মধ্যে, যারা ওয়াজ করেন তাদের আকিদা ও দর্শনে ভিন্নতা, অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা, গুরুত্বহীন বিষয় নির্বাচন, ভিত্তিহীন, অযৌক্তিক ও অসম্ভব গল্প, অশালীন ভাষা, বিকৃত শারীরিক অঙ্গ-ভঙ্গি, অন্যের মত ও দর্শনের প্রতি অশ্রদ্ধা, নিজেকে উত্তম মনে করে অন্যকে হেয় করা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। 

এ পরিস্থিতির উত্তরণে কিছু জরুরি প্রস্তাব : 
সহিহ নিয়তে ওয়াজ করা 
নিয়তের ওপরই নির্ভর করে কাজের ফল। (বোখারি : ১)। আমরা যারা নিজেদের এ ক্ষেত্রে নিয়োজিত রেখেছি তাদের আরও একবার ভেবে দেখা দরকার, কোন উদ্দেশ্যে এটি করছি। দুনিয়াবী স্বার্থ; সম্মান কিংবা অর্থ উপার্জন যদি আমাদের উদ্দেশ্য না হয়ে থাকে তাহলে জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে আল্লাহর কাছে কতটা প্রতিদান পাব সেটিই আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। 
বিষয় নির্ধারণ এবং তার ব্যাখ্যায় সতর্কতা অবলম্বন করা 
প্রত্যেক দাঈ বা বক্তার উচিত এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা। কী বিষয়ে কথা বলছি এবং কীভাবে তার ব্যাখ্যা প্রদান করছি এবং তার ফল কীভাবে শ্রোতাদের ওপর প্রতিফলিত হচ্ছে তা নিয়ে চিন্তা করা একজন দাঈর প্রাথমিক দায়িত্ব। শ্রোতাদের ওপর নির্ভর করে এমন সব বিষয় নির্ধারণ করা উচিত, যা সত্যিকার অর্থেই তাদের জন্য জানা জরুরি এবং সেসব জানার ফলে তাদের জীবনে পরিবর্তন আসবে। ধর্মের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়গুলোকে সাধারণ এবং অল্প শিক্ষিত মানুষের মাঝে তুলে ধরার চেয়ে মৌলিক বিধিবিধান এবং সেগুলোর শরয়ি উদ্দেশ্য বর্ণনাপূর্বক তা পালনে কী উপকার লাভ করা যাবেÑ এসব আলোচনা হওয়া জরুরি। 
মনগড়া, ভিত্তি ও যুক্তিহীন, অগ্রহণযোগ্য এবং অসম্ভব-অবাস্তব গল্প, রম্য উপস্থাপনা সাময়িকভাবে শ্রোতাদের চিত্ত আকর্ষণ করতে পারলেও তা হিতে বিপরীত হয়। কোরআন ও হাদিসে অসংখ্য চিত্তাকর্ষণীয় গল্প আছে যেগুলোতেও শ্রোতাদের মন জয় করা যায়। সেসব গল্পকে কোরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত উপায়েই তুলে ধরার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে প্রত্যেক দাঈকে। 
মানবিক খারাপ গুণাবলি নিয়ন্ত্রণ করা 
মানুষ হিসেবে আমাদের কিছু খারাপ মানবিক গুণাবলি থাকা স্বাভাবিক। একজন দাঈ হিসেবে অবশ্যই তা সংশোধন ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষ করে তা যেন জনসমক্ষে কোনোভাবেই প্রকাশ না পায় তা খেয়াল করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের শ্রোতারা যখন আমাদের কথাগুলো শোনে তখন তারা আমাদের দেখেও। তারা আমাদের অনুকরণীয়, অনুসরণীয় মনে করে বলে লাখ লাখ টাকা খরচ করে আমাদের ডেকে নিয়ে আসে, অনেক কষ্ট সহ্য করে আমাদের কথা শোনে। সেখানে আমাদের মানবিক খারাপ দিকগুলো ফুটে উঠুক তা তারাও চায় না। বিশেষ করে, ইসলামি আলোচনায় রাগ এবং তার বহিঃপ্রকাশকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটি সত্য যে, রেগে গেলে মানুষ কী বলে তা ঠিক রাখতে পারে না। সুতরাং এসময় ভুল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। শুধু তাই নয়, বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন ওয়ায়েজ বা বক্তা রাগান্বিত অবস্থায়ই অশালীন, অশ্রাব্য ভাষারই শুধু ব্যবহার করেন না, বরং ভুল সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেন। এটি কখনোই ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। এর পাশাপাশি আমাদের কণ্ঠস্বরকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এমন চেঁচামেচি, উচ্চকণ্ঠ করা যাবে না যাতে শ্রোতারা বিরক্ত হয়ে ওঠেন। অনেক সময় দেখা যায়, উত্তেজনার কারণে বক্তার চেয়ার, মাইকের স্পিকার পড়ে যাচ্ছে, বিকৃত মুখ ও দৈহিক ভঙ্গির প্রকাশ পাচ্ছেÑ এগুলো এসব পরিবেশের জন্য মোটেও শোভনীয় নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পদচারণায় মধ্যবর্তিতা অবলম্বন কর এবং কণ্ঠস্বর নিচু কর। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’ (সূরা লুকমান : ১৯)। 
নিজেকে উচ্চ এবং অন্যদের হেয় মনে করা থেকে বিরত থাকা 
সমসাময়িককালে এটি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। প্রত্যেকেই নিজেকে এবং নিজের মতাদর্শের লোকদের একমাত্র সম্মানিত মনে করে আর অন্যদের হেয় করে, অপমান করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যভরে কথা বলে। অল্প কিছু বক্তা বা দাঈ ব্যতীত প্রায় সবার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য। এক-দুই ঘণ্টা আলোচনার মধ্যে প্রায় অধিকাংশ সময়ই এ খারাপ গুণটির প্রকাশ পায়। কখনও কখনও তা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করে এমনভাবে আলোচনা করা হয় যেন তারা নিশ্চিত জাহান্নামি। কখনও কখনও তাদের কাফের, মুশরিক, বেদআতি হিসেবে ফতোয়া দিতেও কেউ কেউ কুণ্ঠাবোধ করেন না। এটি অনুচিত, পরিত্যাজ্য। আল্লাহ বলেন, ‘অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না এবং পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা লুকমান : ৩১:১৯)। 
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করে এমন বলেছেন তা পাওয়া যায় না। কিন্তু তিনি অনেক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নির্দিষ্টভাবে বলেছেন, তারা জান্নাতি। কিন্তু জাহান্নামিদের বেলায় কাউকে নির্দিষ্ট করেননি। হ্যাঁ, তিনি বলেছেন, যারা এরূপ করবে তারা জাহান্নামি হবে। 
কথা-কাজে মিল থাকা 
আমরা যা বলছি তার সঙ্গে আমাদের ব্যবহারিক জীবনের মিল আছে কি না তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন কোনো কথা বলি তখন আমাদের শ্রোতারা সে বিষয়গুলো আমাদের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। যখন সামঞ্জস্য পায় তখন তা পালনে উদ্বুদ্ধ হয়। অপরপক্ষে, কোনো একটিরও যদি অসামঞ্জস্য দেখে, তখন অন্যগুলোকেও তারা আর নিজেদের জীবনে পালন করতে আগ্রহী হয় না বরং বক্তার প্রতি একটি নেগেটিভ ধারণা পোষণ করে। আল্লাহ এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন, ‘হে মোমিনরা, তোমরা যা করো না তা তোমরা বলো না। নিশ্চয় তোমরা যা করো না তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক।’ (সূরা সাফ : ২-৩)।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]