logo
প্রকাশ: ১২:৫০:৫০ AM, বুধবার, মে ২২, ২০১৯
সৌদিতে রমজানে প্রীতিময় পরিবেশ
নাজমুল হুদা

রমজানের আবহ শুরু হওয়ার আগে থেকেই সৌদি আরবের মানুষ মহিমান্বিত মাসকে বরণ করে নিতে আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বড়দের পাশাপাশি ছোটদের মনেও আনন্দ-উচ্ছ্বাসের দোলা লাগে। শারীরিক ও মানসিকÑ নানাভাবে তারা নিজেদের প্রস্তুত করে। রমজানের চাঁদ উদিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে তাদের মধ্যে রমজানের প্রস্তুতি দেখা যায়।

ঘরের যাবতীয় আসবাবপত্র বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য কেনাকাটায় তাদের আগ্রহ ও উদ্দীপনার কোনো কমতি থাকে না। প্রত্যেকে যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের কেনাকাটার কাজ সেরে নেয়। নারীরা নতুন মাস বরণের অংশ হিসেবে নতুন নতুন পাত্র ও আসবাবপত্র ক্রয় করেন। নানা ধরনের রঙিন বাতি ও রং দিয়ে রাস্তাঘাট সাজানো হয়। উঁচু দালানকোঠা, শপিংমল এবং রাস্তার মাঝের ও দুই পাশের সড়কবাতির খুঁটিগুলোতে ছোট ছোট লাইট লাগানো হয়। সড়ক-মহাসড়কগুলো এক ভিন্ন বৈচিত্র্যের রূপাবয়ব ধারণ করে।

‘শাবানিয়্যা’ অনুষ্ঠান পালন
রমজানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সৌদিরা এর নাম দিয়ে থাকে ‘শাবানিয়্যা’ বা ‘শাবানা’। এতে তাদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও পাড়া-প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবাই এতে অংশ নেয়। এতে দেশীয় নানা জাতের খাবার ও মিষ্টান্ন পরিবেশন করা হয়।
সৌদি আরবজুড়ে রমজানে বিশেষ এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ বিরাজ করে। তার কারণ, মক্কা-মদিনার মতো ঐতিহাসিক দুটি পবিত্র ভূখ- এ দেশে অবস্থিত। সৌদিরা রমজানের আগমনের সুনিশ্চিত বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে অবগত হয়। রমজানের চাঁদ দেখা নিশ্চিত হওয়ার পর সবার হৃদয়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ফোনে কিংবা খুদেবার্তা পাঠিয়ে একে অপরকে সম্ভাষণ জানায়। ‘রমজানের অভিনন্দন’, ‘সদা তোমরা ভালো থেকো,’ ‘খোশ আমদেদ মাহে রমজান’ এবং ‘আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, যেন তিনি আমাদের ও তোমাকে তার সিয়াম ও কিয়াম পালনের তৌফিক দেন’ ইত্যাদি বাক্যমালায় সাজানো থাকে তাদের বার্তাগুলো।

দৈনন্দিন কর্মসূচি
আরবদের সাধারণ অভ্যাস হলো, আজানের সঙ্গে সঙ্গে তারা শুকনো ও পাকা খেজুর এবং পানি দ্বারা ইফতার করে। তারপর মুয়াজ্জিন নামাজের ইকামত দিলে খাবার ছেড়ে সবাই জামাতের জন্য ছোটে। মাগরিবের নামাজ আদায়ের পর সবাই মিলে ইফতারের মূল পর্ব শুরু করে, যার সর্বাগ্রে থাকে দেশীয় ঘি দিয়ে তৈরি এক ধরনের ‘ফুল’ ও জয়তুনের তেল। ফুল ছাড়া যেসব খাবার দ্বারা তাদের টেবিল ও দস্তরখানা ভর্তি থাকে তা হলোÑ গোশত বা সবজি দিয়ে তৈরি সামুচা, এক ধরনের সুরবা ও তমিজের রুটিসহ দেশীয় প্রচলিত নানা ধরনের খাবার।
সুরবা (স্যুপ) আরবদের মূল খাবারের অংশ। শরীরে চাঙ্গা ও ফুরফুরে ভাব ফিরিয়ে আনতে এশা ও তারাবির আগে লাল চা ও গাহওয়া পরিবেশন করা হয়। বিশেষ করে ঘরে মেহমান থাকলে তাদের মাঝে ঘরের একজন সদস্য রুটির পাত্র নিয়ে হাজির হন। তারপর ইফতার পর্ব শেষ করে সবাই এশা ও তারাবির জন্য মসজিদমুখী হন।
নামাজের পর অধিকাংশ মসজিদে দ্বীনি কিছু আলোচনা হয়, যা মসজিদের ইমাম পেশ করে থাকেন বা কোনো আলেমকে দাওয়াত করে আনা হয়। এখানকার অনেক মানুষ প্রত্যেক রাতে কোনো বাসায় একসঙ্গে একত্রিত হয়ে কিছু সময়ের জন্য নৈশালাপে মেতে ওঠে। তারপর কেউ কেউ ঘুমাতে চলে যায়। আর এ সংখ্যাটা নিতান্তই কম। অধিকাংশই পুরো রাতকে ইবাদত কিংবা প্রয়োজনীয় কেনাকাটা বা ব্যক্তিগত অন্য কোনো কাজের পেছনে ব্যয় করে।
দিনের বেলা দোকানপাট ও বিপণিবিতানগুলো বন্ধ থাকে। দিনের নীরবতা রাতে সরবে পরিণত হয়। তারপর সাহরি খাওয়ার জন্য সবাই একত্রিত হয়। দেশীয় রুটি, আরবি ঘি, দই, ভাত ও মুরগিসহ যাবতীয় দেশীয় খাবারে ভোর রাতের খাবারটি বৈশিষ্ট্যম-িত হয়ে ওঠে। রমজানের শুরুতে ওমরার হিড়িক পড়লেও শেষের দিকে সবাই ওমরার জন্য ছোটে। আর শেষ দশ দিনের আগমনে কেউ কেউ ইতিকাফের জন্য মক্কা কিংবা মদিনায় অবস্থান করে।
আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ রীতিনীতির একটি হলো, এশা ও তারাবি শেষে পরিবারগুলো নিজেদের আত্মীয় ও প্রতিবেশীর সঙ্গে পরস্পরে সাক্ষাতে মিলিত হয়। তাছাড়া কিছু কিছু পরিবারের রীতিনীতি অন্যদের থেকে ভিন্ন। পরিবারের একজন সদস্য ইফতারের যাবতীয় কিছু ব্যবস্থা করবে। এভাবে পালাক্রমে চলতে থাকবে। আর এটি শুরু হবে পরিবারের বয়সে বড়কে দিয়ে।

কল্যাণমূলক কিছু কাজ
সৌদি আরবের কিছু রীতিনীতি চোখে পড়ার মতো। সেটি হলো, এখানকার মুসলিম জাতিগোষ্ঠী ও প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য ফ্রি ইফতারির আয়োজন করা। এসব আয়োজন সাধারণত মসজিদের কাছে অথবা ওইসব শিল্পাঞ্চলে করা হয়, যেখানে শ্রমিকরা অধিক পরিমাণে অবস্থান করেন। বিভিন্ন ধরনের পানীয়, দই, জুস, ফল, কেক, খেজুর ইত্যাদি দিয়ে প্যাকেট তৈরি করে সামর্থ্যবানরা মসজিদে কিংবা রাস্তাঘাটে ইফতার বিতরণ করেন।
আর আরেকটি মুগ্ধকর দিক হলো, মাগরিবের আজানের সময় রাস্তার বিভিন্ন সিগন্যালে ওইসব লোকের মাঝে ইফতারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়, যারা তাদের আবাস থেকে দূরে আছে। এ হলো সৌদি আরবের সাধারণ অবস্থার মৌলিক চিত্র। তবে স্থান আঞ্চলিকতা ভেদে কিছু কিছু পার্থক্য রয়েছে।

লেখক : উচ্চশিক্ষার্থী, উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কা মুকাররামা, সৌদি আরব

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]