logo
প্রকাশ: ১২:৫০:৪৬ AM, রবিবার, জুলাই ২১, ২০১৯
ভালোবাসায় যত সওয়াব
মাহবুবুর রহমান নোমানি

মানুষের সহজাত একটি প্রেরণা অন্যকে ভালোবাসা। এ ভালোবাসা যদি হয় নিঃস্বার্থ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তবে এর পুরস্কার অফুরন্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করবেন, ‘যারা আমার সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছিল, তারা কোথায়? আজ আমি তাদের আমার আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দান করব।’ (মুসলিম : ২৫৬৬)। অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে যারা পরস্পর ভালোবাসার সম্পর্ক রাখে, কেয়ামতের দিন তাদের জন্য নুরের মিম্বর স্থাপন করা হবে, যা দেখে নবী এবং শহীদরা ঈর্ষা করবেন।’ (তিরমিজি : ২৩৯০)। 

পবিত্র ইসলামে পরস্পরকে ভালোবাসার গুরুত্ব এত বেশি, এর ওপর ঈমানের ভিত্তি রাখা হয়েছে। প্রিয় নবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘তোমরা জান্নাতে যেতে পারবে না যতক্ষণ না মোমেন হবে। আর তোমরা মোমেন হতে পারবে না, যতক্ষণ পরস্পরকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের এমন আমলের কথা বলে দিব না, যা করলে তোমাদের আপসে ভালোবাসা পয়দা হবে? তা হলো সালামের প্রসার ঘটানো।’ (মুসলিম : ৫৪)। অন্য একটি হাদিসে নবী বলেছেন, ‘তোমরা একে অপরকে উপহার দাও। তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাস ও হৃদ্যতা তৈরি হবে।’ (আদাবুল মুফরাদ : ৫৯৪)। 

সমাজ জীবনে আমরা অন্যের জন্যে কিছু না কিছু খরচ করে থাকি। উপহার, উপঢৌকন দিয়ে থাকি। আমাদের এ খরচ ও উপহার যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হয়, তবে তা আমাদের জন্য বয়ে আনবে প্রভুত কল্যাণ। হজরত মুয়াজ (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য যারা একে অপরকে ভালোবাসে, আপসে ওঠাবসা করে, দেখা-সাক্ষাৎ করে কিংবা একে অপরের জন্য খরচ করে, তাদের জন্য আমার ভালোবাসা ওয়াজেব হয়ে যায়।’ (মুসনাদে আহমদ : ২১৫২৫)। 

মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজনের ভালোবাসা মজ্জাগত ও স্বভাবজাত। এ ক্ষেত্রেও যদি আমরা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে পারি অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং নবীজির সুন্নত পালন উদ্দেশ্য হয়, তবে এই ভালোবাসাতেও আমরা আল্লাহর তরফ থেকে পাব অফুরন্ত পুরস্কার। হাদিসে এরশাদ হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি মা-বাবার প্রতি একবার ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকায় তাহলে সে একটি হজ ও ওমরার সওয়াব পাবে।’ (কানজুল উম্মাল : ৪৫৫৩৫)। কেউ স্ত্রীকে ভালোবাসে রিপুর তাড়নায়। কেউবা ভালোবাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায়। দৃশ্যত উভয়ের ভালোবাসা এক হলেও প্রতিদানের বিচারে দু’জনের ভালোবাসার মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিবিদের সঙ্গে গল্প করেছেন। বিবিদের ১১ জন নারীর গল্প শোনানোর কথা হাদিসের কিতাবে বর্ণিত রয়েছে। আম্মাজান আয়েশা (রা.) কে নিয়ে দৌড় প্রতিযোগিতার কথাও হাদিসে উল্লেখ আছে। তিনি শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাদের গালে স্নেহের চুমু এঁকে দিতেন। মাথায় হাত বুলাতেন। উপহার দিতেন। কখনও বা তাদের সঙ্গে খেলাধুলায় শরিক হতেন। সুুতরাং রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত পালনার্থে স্ত্রী ও শিশুদের ভালোবাসা আল্লাহর জন্য ভালোবাসা বিবেচিত হবে। 

আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ঈমানের পূর্ণতার লক্ষণ। নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কাউকে আল্লাহর জন্য দান করল কিংবা আল্লাহর জন্য দান করা থেকে বিরত রইল এবং আল্লাহর জন্য কারও সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক কায়েম করল কিংবা আল্লাহর জন্য কারও সঙ্গে বিদ্বেষ পোষণ করল এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিবাহ করল, তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করেছে।’ (তিরমিজি : ২৫২১)। মোমেন মূলত আল্লাহকেই ভালোবাসে। মানুষের ভালোবাসাও যদি হয় আল্লাহর জন্য তখন স্বয়ং আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, ‘এক ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের সাক্ষাতের জন্য ঘর থেকে রওনা হলো। পথিমধ্যে আল্লাহ এক ফেরেশতাকে মানুষের বেশে পাঠালেন। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ? সে উত্তর দিল, এই গ্রামে আমার এক ভাই থাকেন। তাকে দেখতে যাচ্ছি। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করল, তোমার প্রতি কি তার কোনো অনুগ্রহ রয়েছে, যার বিনিময় দেওয়ার জন্য যাচ্ছ? সে বলল, না। আমি যাচ্ছি এই জন্যে যে, আমি তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালোবাসি। ফেরেশতা বলল, (তাহলে শোন) আমি তোমার নিকট আল্লাহর দূত হিসেবে এসেছি এ কথা জানানোর জন্যে যে, আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসেন; যেমন তুমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাস।’ (মুসলিম : ২৫৬৭)। 

আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসলে তাকে সেকথা জানিয়ে দেওয়া উচিত। তাহলে উভয় পক্ষ থেকে ভালোবাসার সৃষ্টি হবে এবং সে ভালোবাসা প্রগাঢ় হবে। হজরত মিকদাদ ইবনে মাদিকারিব (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘কেউ অন্যকে ভালোবাসলে যেন তাকে ভালোবাসার কথা জানিয়ে দেয়।’ (আবু দাউদ : ৫১২৪)।

ইসলামের এই পবিত্র ভালোবাসা যেন অপাত্রে না হয়। সব জিনিসের বৈধ-অবৈধ ক্ষেত্র রয়েছে। ভালোবাসার বিষয়টি এর ব্যতিক্রম নয়। বিবাহপূর্ব ছেলেমেয়ের ভালোবাসা ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ ও অন্যায়। এতে চারিত্রিক পবিত্রতা বিনষ্ট হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো পুরুষ যখন পরনারীর সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাৎ করে, তখন সেখানে তৃতীয়জন হিসেবে শয়তান উপস্থিত থাকে।’ (তিরমিজি : ১১৭১)। অন্য একটি হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘চোখের জেনা দেখা। মুখের জেনা কথা বলা। হাতের জেনা স্পর্শ করা। পায়ের জেনা তার দিকে চলা।’ (বোখারি : ৬২৪৩)।   

বর্তমানে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালনের যে অপসংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা যুবসমাজকে অন্যায়ের পথে ঠেলে দিচ্ছে। দিবসটির কুপ্রভাব দিন দিন এতই বৃদ্ধি পাচ্ছে যে, সমাজ থেকে বিদায় নিচ্ছে লজ্জা-শরম, শালীনতা ও নীতিবোধ। মূলত মুসলমানদের চরিত্র বিনষ্ট করার অসৎ উদ্দেশ্যেই দিবসটি আমদানি করা হয়েছে। তাই আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য এ অপসংস্কৃতিটির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। বিশেষত সরকার ও অভিভাবকদের  এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের যুবসমাজের চরিত্র পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। যুবকরা ভালো হবে জাতি ভালো হবে। আর যুবকরা বিপথগামী হলে পুরো জাতি বিপথগামী হতে বাধ্য। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]