logo
প্রকাশ: ১২:৪৩:০৯ AM, সোমবার, আগস্ট ২৬, ২০১৯
ধর্ষণ রোধে চাই ইসলামের অনুশাসন
আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

 

ধর্ষণ বর্তমান পৃথিবীর অতি পরিচিত এক ভয়ঙ্কর শব্দের নাম। যে শব্দ শোনামাত্রই চোখের পাতায় ভেসে উঠে একটি নিষ্পাপ আত্মার রোদনচিত্র। বিষাদে ছেয়ে যাওয়া একটি পরিবার, একটি পৃথিবী। যে পৃথিবীর আলো বিষাক্ত, বাতাস বিষাক্ত। বিষাক্ত পৃথিবীর জলরাশিও। বিষে বিষে নীল হয়ে ওঠে ধর্ষিতার দু-চোখ। অতঃপর এই বিষেভরা জীবন থেকে মুক্তি পেতে সে খুঁঁজে নেয় আরেকটি বিষের কৌটা অথবা ফাঁসির দড়ি। প্রভাতে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে উদয় হয় আরেকটি মৃত সূর্যের ঝুলন্ত লাশ। দিন দিন এ লাশের মিছিল বড় থেকে বড় হচ্ছে। পৃথিবীতে এমন কোনো ভূখ- নেই যেখানে ধর্ষণের মতো নিন্দনীয় ঘটনা ঘটছে না।
দিন দিন এ ঘটনা বেড়েই চলেছে। মেয়েরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, গৃহবধূ, এমনকি অবুঝ শিশুও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সভ্যতার যেন আজ মৃত্যুই ঘটেছে। নতুবা মাত্র ৪ বছরের শিশুর সঙ্গে এমন পৈশাচিক নৃশংসতা হয় কী করে? হে সভ্যতা! তোমার এ অকাল মৃত্যু আমাদের অমানুষ করে দিল। কিন্তু কেন? এর অনেক কারণই আছে। এই যেমনÑ তাকওয়াহীনতা, পরিবারের দায়িত্বহীনতা, নারী-পুরুষের অবাধলভ্যতা, ইন্টারনেটে অশ্লীলতার সহজলভ্যতা। টিভি সিরিয়াল ও ফিল্মে ধর্ষণের প্রচারিত কৌশল এবং ক্রাইম অনুষ্ঠানগুলো। এসব অনুষ্ঠানে সচেতনতার নামে ধর্ষণকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, দেখলে মনে হয় যেন ধর্ষককে হাতে-কলমে ধর্ষণ শেখানো হচ্ছে। ওইসব অনুষ্ঠান নারীদের যতটা না উপকার করছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করছে। কেননা, এসব অনুষ্ঠানের শেষের দিকে হয় নায়ক এসে ধর্ষকের হাত থেকে নায়িকাকে উদ্ধার করে, নতুবা পুলিশ ধর্ষককে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু বাস্তবে যে এর কিছুই হয় না। না নায়ক আসে, আর না পুলিশ। মাঝখান থেকে ধর্ষকরা প্রশিক্ষণ পায় ধর্ষণের। তাই বিষয়টি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি।
সর্বোপরি ইসলামের অনুশাসন না মানাই ধর্ষণ প্রবণতার অন্যতম কারণ। ইসলামের একটি শাশ্বত বিধান হলো পর্দা, যা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই আবশ্যকীয়। কিন্তু তা আজ মানতে নারাজ আমাদের তরুণ প্রজন্ম। অনেকে আবার পর্দাপালনকে শুধু নারীর জন্যই নির্ধারিত মনে করেন। তাই ঢালাওভাবে বলে দেনÑ ‘ধর্ষণের জন্য বেপর্দা নারীরাই দায়ী।’ যদি তাই-ই হতো তাহলে চার বছরের শিশুটিকে কেন ধর্ষিত হতে হয়? আসলে এখানে যে বিষয়টির অভাব তা হচ্ছে ইসলামের অনুশাসন না মানা। এ অনুশাসন যেমন বেপর্দা নারীরা মানছে না, তেমনি মানছে না পুরুষরাও। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে রাসুল! আপনি মোমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জস্থানের হেফাজত করে; এটিই তাদের জন্য পবিত্রতর (ব্যবস্থা)। তারা যা করে আল্লাহ তায়ালা সে বিষয়ে ভালোভাবেই অবগত আছেন।’ (সূরা নূর : ৩০)।
হাদিসে এসেছে, নবী (সা.) বলেছেন,  ‘যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী স্থান (জবান) ও দুই পায়ের মধ্যবর্তী স্থান (যৌনাঙ্গ) হেফাজত করবে, আমি নিজে তার জান্নাতের জিম্মাদারি নেব।’ (বোখারি-মুসলিম)। এখানে কোরআন ও হাদিসে যা বলা হয়েছে তা কিন্তু নারী-পুরুষ উভয়কেই বলা হয়েছে। তাহলে বেপর্দার জন্য শুধু নারীকেই কেন দোষারোপ করা হবে? কেন নারীকে একা পেলেই হামলে পড়বে ধর্ষকের দল। ছিন্নবিচ্ছিন্ন করবে পবিত্র ভূষণ। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলে দিয়েছেন, ‘তোমরা তোমাদের হাতগুলোকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।’ (সূরা বাকারা : ১৯৫)।
ধর্ষণ প্রবণতার আরেকটি কারণ হলো ইসলামের নির্ধারিত শাস্তিকে বাস্তবায়ন না করা। ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ। ইসলামে এই অপরাধ নিকৃষ্ট কাজ ও হারাম হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় এটি প্রকাশ্য অশ্লীলতা ও অত্যন্ত মন্দ পথ।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৩২)।
ধর্ষণের মতো হীন কর্মকে ইসলাম শুধু নিষেধ করেই চুপ থাকেনি, বরং ধর্ষকের জন্য ব্যবস্থা করেছে কঠিন শাস্তির। ওয়ায়েল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) এর যুগে এক মহিলা সালাত আদায়ের জন্য গমনকালে পথিমধ্যে তার সঙ্গে একজন পুরুষের দেখা হলে, সে ব্যক্তি জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে। সে মহিলা চিৎকার দিলে, তার পাশ দিয়ে গমনকালে এক ব্যক্তি এর কারণ জানতে চান। তখন সে মহিলা বলেন, ‘অমুক ব্যক্তি আমার সঙ্গে এরূপ অপকর্ম করেছে।’ পরে তার পাশ দিয়ে মুহাজিরদের একটি দল গমনকালে সে মহিলা তাদেরও বলেন, ‘অমুক ব্যক্তি আমার সঙ্গে এরূপ কাজ করেছে।’ তারপর তারা গিয়ে এক ব্যক্তিকে ধরে আনেন, যার সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল যে, সে-ই এরূপ করেছে। এরপর তারা সে ব্যক্তিকে ওই মহিলার কাছে উপস্থিত করলেন, সে মহিলা বলেন, হ্যাঁ। এ ব্যক্তিই এ অপকর্ম করেছে। তখন তারা সে ব্যক্তিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর কাছে নিয়ে যায়। নবী করিম (সা.) যখন সে ব্যক্তির ওপর ইসলামের বিধান জারি করার মনস্থ করলেন, তখন মহিলার সঙ্গে অপকর্মকারী ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যায় এবং বলে, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি-ই এই অপকর্ম করেছি। তখন নবী করিম (সা.) সে মহিলাকে বলেন, ‘তুমি চলে যাও, আল্লাহ তোমার অপরাধ মাফ করে দিয়েছেন।’ এরপর তিনি (সা.) ভুলভাবে ধরে আনা লোকটির সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করেন এবং ধর্ষক ব্যক্তিটিকে শাস্তিদানের জন্য পাথর মেরে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। তিনি আরও বলেন,  ‘লোকটি এমন তওবা করেছে যে, সমস্ত মদিনাবাসী এরূপ তওবা করলে, তা কবুল হতো।’ (সুনানে আবু দাউদ : ৪৩৬৬)।
এখানে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার মনে করছি। অনেকেই বলে থাকেন, ইসলামে ধর্ষণের শাস্তির ব্যাপারে কোনো কথা বলা হয়নি, যা বলা হয়েছে তা শুধু ব্যভিচারের। হ্যাঁ, যদিওবা ইসলামে ধর্ষণ শব্দটিকে পৃথকভাবে উল্লেখ করেনি; কিন্তু ধর্ষকের শাস্তিটা যে ব্যভিচারের চেয়ে আলাদা তা এই হাদিসেই স্পষ্ট রয়েছে। কেননা ব্যভিচারের শাস্তি হয় উভয়ের। আর ধর্ষণের শাস্তি হয় শুধুই ধর্ষকের, ধর্ষিতার নয়। কিন্তু আমাদের সমাজ চলছে উল্টো নিয়মে। এখানে ধর্ষকের বদলে শাস্তি পেতে হয় ধর্ষিতাকে।
মাথা ন্যাড়া, একঘরে করে রাখা, চলতে ফিরতে টিটকারি করা, হেয়প্রতিপন্ন করা সব কিছুই অর্পিত হয় শুধু নির্যাতিতার ওপর। আর বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় ধর্ষকের দল। যদিও দু-চারজন ধর্ষকের বিচার হয়; কিন্তু শাস্তি হয় না। আর যা হয় তা নামকাওয়াস্তে। ইসলাম যে শাস্তি নির্ধারণ করেছে তার ছিটেফোঁটাও থাকে না ওইসব বিচারের মজলিশে। এ যেন নির্যাতিতার মুখ বেঁধে দেওয়ার নামান্তর। ফলে এই লঘু শাস্তির কারণে সমাজে ধর্ষণের মতো এ অভিশাপের ছায়া গাঢ় থেকে আরও গাঢ় হচ্ছে। যদি ইসলাম নির্ধারিত শাস্তির বাস্তবায়ন হতো, অন্তত দুই-এক ধর্ষককে প্রকাশ্যে মৃত্যুদ- দেওয়া হতো তাহলে সমাজ থেকে এ অভিশাপ মুছে যেত বহু আগেই।

লেখক : ইমাম ও খতিব, কসবা জামে মসজিদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া 

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]