logo
প্রকাশ: ১২:১৭:০৭ AM, বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১০, ২০১৯
আফ্রিকার মরুসিংহ ওমর মুখতার (রহ.)
আরজু আহমাদ

ওমর আল মুখতার মুহাম্মদ ইবনে ফারহাত (রহ.), যিনি মরুসিংহ নামে খ্যাত। উত্তর আফ্রিকা (আধুনিক লিবিয়া, চাদ, সুদান, মিশরের কিছু অংশে) মুসলিম প্রতিরোধ সংগ্রামের অগ্রনায়ক। কৈশোরে তিনি পিতৃহীন হন।
চরম দারিদ্র্য আর পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়ে বিশ বছর বয়সে এসে কর্মজীবন শুরু করেন। ইলমে দ্বীন চর্চার পাশাপাশি পা-িত্য ছিল আরবের ভৌগোলিক অবস্থার ব্যাপারে।
তিব্বে নববি তথা হাদিসে বর্ণিত চিকিৎসা, বিশেষ করে ভেষজ চিকিৎসায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি কর্মজীবনে বাচ্চাদের কোরআন শেখাতেন। আমাদের দেশে যেটাকে আমরা মক্তব বলি। প্রচলিত পরিভাষায় আমরা যেটাকে বলি মক্তবের মৌলবি, তিনি ছিলেন তাই।
এ মক্তবের মৌলবিই ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছেন দুর্গসম। শুধু লিবিয়ায় ইতালির বিরুদ্ধেই নয়, বরং মিশরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এবং চাদে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। 
পৃথিবীর সমসাময়িক ইতিহাসে তার মতো আর কেউই নেই, যিনি ১ হাজারের মতো প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন কিংবা প্রত্যক্ষভাবে শরিক ছিলেন। 
যৌবনের প্রারম্ভে একটা কাফেলার সঙ্গে করে সুদান যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে এক জায়গায় পুরো কাফেলাকে থামতে হয়, কারণ সামনে সিংহ থাকায় সে পথ অতিক্রম সম্ভব হচ্ছিল না।
লোকরা বাধ্য হয়ে কাফেলার একটা উট সেদিকে ছেড়ে দেয়। যাতে সিংহের পেট ভরা থাকলে তারা জায়গাটা নির্ভয়ে অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু এতেও পুরো নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছিল না। ওমর আল মুখতার একাই উটের পথ ধরে এগিয়ে যান। আর সিংহটাকে হত্যা করে এর মাথা হাতে করে নিয়ে কাফেলার কাছে ফেরেন।
লোকরা খুশি হয়ে তাকে ‘বারক্বার সিংহ’ (Lion of the Cyrenaica) বলে উপাধি দেয়। এ উপাধিই পরে মরুসিংহ (Lion of the desert) নামে পরিচিতি পায়।
দীর্ঘ ৩৫ বছর তিনি সংগ্রাম করেছেন। বহুবার তাকে লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একবার তাকে বলা হলো, সে যদি সশস্ত্র সংগ্রাম ছেড়ে দেয়; তবে আজীবন তার জন্য ভাতা ও উচ্চপদ নির্ধারণ করা হবে।
তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি কখনোই আমার সংগ্রাম ত্যাগ করব না। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমার রব্বের সঙ্গে মিলিত হই। প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুই তো সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী। প্রতিটি মুহূর্ত আমি এর জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’
৭৩ বছর বয়সে যুদ্ধক্ষেত্রে তার ঘোড়া বন্দুকের গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে তিনি ঘোড়ার নিচে চাপা পড়েন। তিনি নিজেও আগে থেকেই আহত ছিলেন। তাকে ইতালিয়ান সেনাবাহিনী বন্দি করে।
বিচারের নামে এক প্রহসনের মধ্য দিয়ে ফাঁসির দ- ঘোষণা করা হয়। দুই হাত শিকলবন্দি করে তাকে আনা হয়। যুদ্ধে আহত হয়ে আগে থেকেই তিনি সোজাভাবে হাঁটতে পারতেন না। তার পায়ের হাড় ভাঙা ছিল। তাকে পা টেনে টেনে হাঁটতে হতো।
২০ হাজার লোকের উপস্থিতিতে ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১ সালে প্রকাশ্যে শহরে তার ফাঁসির দ- কার্যকর করা হয়।
জানা যায়, বিচারের আগে তাকে ইতালিয়ান জেনারেল শেষবারের মতো প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ইতালির প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দিতে এবং প্রতিদানে বাকি নেতাদের মতোই আয়েশি জীবন কাটাতে।
তিনি জবাবে বলেছিলেন, ‘আমি কখনোই এসব লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করব না, যতক্ষণ না তারা এ দেশ ছেড়ে যায় অথবা আমি দুনিয়া ছেড়ে যাই। 
সেই সত্তার কসম, যিনি মানুষের অন্তরের কথা জানেন, যদি আমার হাত শেকলে বাঁধা না থাকত; তবে আমি আপনার সঙ্গে লড়াই করতাম এ খালি হাতে, বার্ধক্য আর ভাঙা হাড় নিয়েই।’
ওমর আল মুখতারের যুগেও অসংখ্য আলেম ছিলেন; কিন্তু সবাই ওমর আল মুখতার হয়ে উঠেননি। বহুজন ছিলেন, যারা আয়েশ আর জীবনের নিরাপত্তার বিনিময়ে সাম্রাজ্যবাদীদের দাসে পরিণত হয়েছিলেন।
ইতিহাস তাদের স্মরণ রাখেনি। তারা শাহাদতের মর্যাদা আর উম্মতের শ্রদ্ধার আসন পাননি। উম্মতের তো আজ লাখো কোরআনের শিক্ষক আছে। কিন্তু একজনও মক্তবের মৌলবি ওমর আল মুখতার নেই। সেই কোরআন আছে, সে ইসলাম আছে; তবু কেন নেই?
কারণ আমাদের মধ্যে রয়েছে সেই ঈমানি দৃঢ়তার অভাব আর আমলের ঘাটতি। ওমর আল মুখতার এত সংগ্রামের মধ্যেও শেষ রাতে রবের দরবারে হাত তোলা থেকে কখনও বিরত থাকেননি।
এশার পর মাত্র ৩ ঘণ্টা ঘুমোতেন। বাকি সময় সালাত আর তেলাওয়াতে কাটাতেন। মাত্র ৭ দিনে একবার কোরআন খতম করতেন। আদতে তিনি যেমন ছিলেন বীর যোদ্ধা, তেমনই ছিলেন অধিক তেলাওয়াত ও সালাত আদায়কারী।
অধিক ইবাদাতের মধ্য দিয়ে রব্বের নৈকট্য অর্জন ব্যতীত মানুষের পক্ষে কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]