logo
প্রকাশ: ০১:০১:৪৬ AM, সোমবার, অক্টোবর ১৪, ২০১৯
ইসলামের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হাফেজ এটিএম হেমায়েত উদ্দীনের চিরবিদায়
ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

জাতীয় সংসদ ভবন সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে জানাজার বিশাল সমাবেশ প্রমাণ করছিল তিনি কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন। ১২ অক্টোবর জুমার দিন সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন পশ্চিম রাজাবাজার মসজিদের পশ্চিমে নিজস্ব বাসভবনে। আমার বাসাও একই এলাকায়। সংবাদ পেয়ে ছুটে গিয়ে দেখি ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ সাহেবসহ আন্দোলনের অনেক নেতাকর্মী, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাংবাদিকরা অপেক্ষা করছেন। জানাজার সময় ও স্থান নিয়ে পরামর্শ হলো। জানাজা হবে বাদ আসর। সাংবাদিক মোবারক ভাই দাবি জানালেন, হেমায়েত ভাই জাতীয় পর্যায়ের নেতা, তার জানাজা হওয়া চাই জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। এলাকার তরুণরা, বিশেষ করে মসজিদ কমিটির সভাপতি দিলদার আলী মাতুব্বরের বলিষ্ঠ অভিব্যক্তি ছিল, প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ মসজিদের ইমাম ও খতিব ছিলেন হুজুর। আজকে ৪২ বছর। মহল্লার প্রতিটি মানুষের সঙ্গে তার আত্মার আত্মীয়তা। তার জানাজা এ মসজিদেই হতে হবে। আমি মতামত জানালাম, মসজিদে এত মানুষের সংকুলান হবে না, যদিও মসজিদ পাঁচতলা। অদূরে টিঅ্যান্ডটি মাঠে হলে এ মহল্লার আওতায় বলে গণ্য হবে, জায়গার সংকুলান হবে, লোকদেরও যাতায়াতে সুবিধা হবে। শেষে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গৃহীত হলো। 
বাদ আসর জানাজার উদ্দেশে বিরাট মাঠ কানায় কানায় ভরে গেল। স্থানীয় বিভিন্ন মসজিদের মুসল্লি ও জনগণ ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতা ও কর্মীরা যোগদান করেন। মাঠে কফিন এসে পৌঁছার আগে সমাবেশের মতো হয়ে গেল। তাতে মরহুম সম্পর্কে অনুভূতি ব্যক্ত করে যারা বক্তব্য রাখেন তাদের মধ্যে ছিলেন এলাকার সংসদ সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আসাদুজ্জামান খান কামাল, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নিজামী, জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের মহাসচিব মাওলানা শাব্বির আহমদ মোমতাজী, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিন্সিপাল সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানী, মাওলানা নূরুল হুদা ফয়েজী, অধ্যক্ষ মাওলানা ইউনুছ আহমদ, খেলাফত আন্দোলনের নেতা মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, মরহুমের কর্মস্থল কামরুন্নেসা কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল প্রফেসর ফজলুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুস সবুর খান, মুসলিম লীগের মহাসচিব কাজী আবুল খায়ের, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মওলানা আবদুর রব ইউসূফী এবং আরও অনেকে। জানাজায় ইমামতি করেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম শায়খে চরমোনাই। 
পরের দিন বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার রাজৈর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
জানাজা-পূর্ব সমাবেশে এলাকার সিটি করপোরেশন কমিশনার ফরিদুর রহমান খান ইরান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আপনারা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে হুজুরের পরিচয় দিয়েছেন। আমাদের কাছে তার পরিচয় তিনি আমাদের বড় হুজুর। তিনি শুধু মসজিদের ইমাম ছিলেন না, এলাকার যে কোনো সমস্যা, রাস্তাঘাট, খেলার মাঠ সংস্কার প্রভৃতিতে তিনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতেন। ছোটবেলা থেকে ধর্মীয় শিক্ষা ও আদব-কায়দা শিখিয়ে তিনি আমাদের বড় করেছেন। 
ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের আমির হিসেবে আমাকেও দুই মিনিট কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়। বললাম, ১৯৭৯-৮০ সালে মাদ্রাসা ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার তিনি কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন আর আমি ছিলাম সেক্রেটারি জেনারেল। সেই থেকে মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের অধিকার আদায়, মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন ও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার অসামান্য অবদান রয়েছে। রাজনীতির অঙ্গনে তিনি ছিলেন ইসলামের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। 
মরহুম হাফেজ এটিএম হেমায়েত উদ্দীন ঢাকা মাদ্রাসা-ই-আলিয়া থেকে কামিল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ সম্পন্ন করেন। তিনি পশ্চিম রাজাবাজার জামে মসজিদে ৪২ বছর যাবৎ ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও মালিবাগ আবুজর গিফারী কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রামপুরা কামরুন্নেসা ডিগ্রি কলেজের সহযোগী অধ্যাপকের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি পশ্চিম রাজাবাজার হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও মাতুয়াইল আল্লাহ কারীম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতেন। সংসার জীবনে তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। তিনি ইসলামী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ঢাকা মহানগর সভাপতি, কেন্দ্রীয় সহকারী সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করে কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছিলেন।
হেমায়েত ভাইয়ের বর্ণাঢ্য জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি প্রচলিত অর্থে মসজিদের ইমামতি নিয়ে বসে থাকেননি। একই সঙ্গে কলেজে শিক্ষকতা করেছেন, দেশে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি অধ্যায়ে অত্যন্ত সরব ও সক্রিয় ছিলেন। বিশাল জনসভায় তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের দিগন্তপ্লাবী অনুরণন এখনও আমাদের স্মৃতি ও শ্রুতিকে প্রাণিত করে। সব মানুষ ও সব সংগঠনের নেতাকর্মীদের অপন ভাবার অসাধারণ যোগ্যতা ছিল তার মধ্যে। দলীয় পরিচয়ে আলাদা প্ল্যাটফর্মে থাকলেও তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক চল্লিশ বছরের দীর্ঘ পরিক্রমায় অটুট ও সমান্তরাল ছিল। মাস দুয়েক আগে জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার প্রাক্তন ভাইদের একটি সমাবেশের ডাক দিয়েছিলাম। বললাম, হেমায়েত ভাই! আপনার অসুস্থতার কথা জানলেও অনেকের পক্ষে আপনাকে দেখতে আসা সম্ভব হবে না। যদি কষ্ট করে ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে আসেন, সবাইকে দেখে আপনিও খুশি হবেন। তখন তার ২৩তম কেমো শেষ করেছেন, তাই আমার অনুরোধ রক্ষা করবেন কি না সন্দেহে ছিলাম। এক পর্যায়ে অসুস্থার সব বাধা উপেক্ষা করে হেমায়েত ভাই যখন হলে প্রবেশ করলেন তখন পুরো হাউস দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানিয়েছিল। একজন সহযোদ্ধা ভাইকে এভাবে সম্মান জানাতে পেরে মনটা তখন আনন্দে ভরে গিয়েছিল। 
স্বাধীনতা-উত্তর মাদ্রাসা ছাত্র আন্দোলনের সবচেয়ে জনপ্রিয় এ নেতার লাখ লাখ ভক্ত-অনুরক্ত আজ সারা দেশে ও বহির্বিশে^ ছড়িয়ে আছেন। আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতুল ফেরদাউসে উচ্চ মাকাম দান করুন। 

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]