logo
প্রকাশ: ০৬:৪৫:৩১ PM, বুধবার, অক্টোবর ১৬, ২০১৯
ই-সিগারেট সম্পর্কিত কিছু ভুল তথ্য
মোহাম্মদ ওয়ালী নোমান

ইলেকট্রনিক সিগারেট বা ই-সিগারেট ব্যাটারি চালিত একধরনের যন্ত্র, যার মাধ্যমে নিকোটিন গ্রহণ করা হয়। এধরনের পণ্যকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট বলছে। সাধারনত দুইটি ভাগে ভাগ করেছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা, যা ইলেক্ট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারী সিস্টেম (এন্ডস) (যেমন: ই-সিগারেট, ভ্যাপ বা ভ্যাপ পেনস, ই-হুক্কা, ই-পাইপ এবং ই-সিগার) ও হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (এইচটিপি)। দেখতে সাধারণ সিগারেট, সিগার, ইউ এস বি ফ্ল্যাস ড্রাইভের মত আকর্ষনীয়।

বিশ্বে ২০০০ সালের শুরুর দিকে বাজারে আসার পর থেকেই ই-সিগারেট বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। আগুন ধরাতে হয় না, তামাকের গন্ধ নিতে হয় না কিন্তু নিকোটিন ঠিকই পাওয়া যায় বলে অনেকেই একে বেছে নেন। বলা হচ্ছে এই ধরনের সিগারেটে কোন ধরনের ক্ষতিকর দ্রব্য নেই, যেমনটা সিগারেটে থাকে এবং এটা সিগারেট ছেড়ে দিতে সাহায্য করে। আধুনিকতার ছোয়ায় এই ধরনের সিগারেট দেখতে খুবই আকর্ষণীয়।

এখন আসা যাক ই-সিগারেট সম্পর্কে কিছু অসত্য তথ্যের পর্যালোচনা:

  • ১. ই-সিগারেট বাষ্প ক্ষতিকর নয়:

ই-সিগারেট একটি তরল মিশ্রণকে উত্তপ্ত করে এবং বাষ্প তৈরি করে। এই তরলের মধ্যে থাকে নিকোটিন, লেড, ফ্লেভারিং এবং প্রপাইলিন গ্লাইকল, গ্লিসারিন এর মতো পদার্থ। গবেষণায় দেখা যায়, এই তরলে ফর্মালডিহাইড ছাড়াও ভারী ধাতব পাওয়া যায়। প্রপাইলিন গ্লাইকল (পিজি)-এটা দিয়ে কৃত্রিম ধোঁয়া তৈরী করা হয়, যা কনসার্ট অনুষ্ঠানে দেখা যায়। ফুসফুসে এবং চোখে এটা জ্বালাতন করে।

এটা ক্রনিক ফুসফুসে রোগ যেমন, এজমা হতে সহায়তা করে, দীর্ঘ সময় ব্যবহারে মানুষের শ্বাসকষ্ট হয়। তরল মিশ্রণকে উত্তপ্ত করার ফলে নিকোটিন এর মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে, সাথে সাথে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। তাই আমরা বলতে পারি যিনি ই-সিগারেটের বাষ্প গ্রহণ করছেন তিনি নিজের ক্ষতি করছে এবং সাথে সাথে পাশের জনের ক্ষতি করছেন।

  • ২. ই-সিগারেট নিরাপদ:

ই-সিগারেটে বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি ব্যবহার করা হয়। সুগন্ধিযুক্ত ই-সিগারেট ব্যবহার করা হলেও এতে নিকোটিন থাকার কারণে ধীরে ধীরে এর উপর আসক্তি বাড়াতে থাকে। তার কারণ নিকোটিন আসক্তি তৈরি করে। যখন লিকুইড হিট দেওয়া হয়, তখন নিকোটিন গ্রহনের পরিমান বেড়ে যায়। ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায় ই-সিগারেটে পাওয়া ফর্মালডিহাইড যা চোখ, গলা এবং নাকের ক্ষতি করতে সক্ষম। প্রপাইলিন গ্লাইকল পর্দাথ একই ক্ষতি করে মানুষের শরীরে। সময়ের সাথে এসব পদার্থ কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে। তামাকজাতপণ্য ব্যবহার করায় সবচেয়ে শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে শরীরে ক্যান্সার তৈরি করে।

সিগারেটে থাকা অনেক ক্ষতিকর উপাদান যেমন টার, অ্যামোনিয়া এবং ডিডিটি ই-সিগারেটে থাকে না বটে। কিন্তু ই-সিগারেটে থাকে উচ্চ মাত্রায় ফর্মালডিহাইড, যা কিনা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

এছাড়াও আছে ভারী পদার্থ যেমন: নিকেল, টিন ও লেড।  আমেরিকান হার্ট ফাউন্ডেশন জার্নালে গত ২৩ আগস্ট প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, সিগারেট পানে অভ্যস্ত ধূমপায়ীদের  চেয়ে যারা ই-সিগারেট পান করেন তাদের হার্ট অ্যাটাকের তিনগুণ ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া ২০০ পাউন্ড বা ৯০ কিলোগ্রাম ওজনের একজন মানুষের মৃত্যুর জন্য এক চা-চামুচ তরল নিকোটিনই যথেষ্ট।

  • ৩. ধূমপান ছাড়তে ই-সিগারেট সাহায্য করে:

ই-সিগারেটে যথেষ্ট পরিমাণে নিকোটিন থাকে। নিকোটিন আসক্তি তৈরি করে। বলা হয়ে থাকে ধূমপানে ছাড়তে ই-সিগারেটকে ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, নিকোটিন থাকার কারণে ব্যবহার ছাড়তে না বরং ধূমপানে আসক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। নিকোটিন “স্টিমুলেট” ধরণের ড্রাগ যা উচ্চ মাত্রায় আসক্তি সৃষ্টি করে। এই ধরনের সিগারেটে লিকুইড নিকোটিন ব্যবহার করা হয়। সুতরাং আমরা বলতে পারি ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়তে নয়, বরং ব্যবহার বাড়তে সাহায্য করে।

  • ৪. সিগারেটের মতো পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি করে না:

পরোক্ষ ধূমপানের মতো ক্ষতি ই-সিগারেট করে না। যেহেতু ই-সিগারেটে অতি সামান্য ক্ষতিকর পর্দাথ থাকে সেহেতু এটা পরোক্ষ ধূমপানে বেশি ক্ষতি করে না। কিন্তু ই-সিগারেটের ধোঁয়াতে সিগারেটের মতই পর্দাথ পাওয়া যায় এবং ক্ষুদ্রাকারে ভারী ধাতু ব্যবহার হয় সেকারণে ই-সিগারেট পরোক্ষ ধূমপানে প্রভাবে ফুসফুস নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আমেরিকার ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ই-সিগারেট ব্যবহারের কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তার কারণ ই-সিগারেট একটি তামাকজাত দ্রব্য।

বাষ্পের মাধ্যমে যেসব কেমিক্যাল নি:সরিত হয় সেগুলো অনেক ক্ষুদ্রাকৃতির ভারি পদার্থ যার মাধ্যমে ফুসফুসের ক্ষতি হয়ে থাকে। তাই আমরা বলতে পারি ই-সিগারেটের মাধ্যমে যারা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন তারাও নিরাপদ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ডে প্রিভেনশন (সিডিসি) এবং ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) এখন পর্যন্ত দেশটির ৫৩০ জনের ফুসফুসজনিত রোগের সঙ্গে ভ্যাপিংয়ের ব্যবহারের যোগসূত্র থাকার কথা নিশ্চিত করেছে। পরোক্ষ ক্ষতিতে ই-সিগারেট সাহায্য করছে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে সারা বিশ্বে এসব পণ্যের ব্যবহার দিনদিন আগ্রাসীভাবে বেড়েই চলেছে। ইউরোপ, আমেরিকাসহ বেশ কিছু দেশে এসব পণ্যের ব্যবহার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আমেরিকায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে মাত্র একবছরের ব্যবধানে আমেরিকায় স্কুল পড়ুয়া (বিশেষত মিডেল ও হাই স্কুলগামী) তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট ব্যবহার ৭৮% বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশে ই-সিগারেটের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। গ্যাটস-২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশে ই-সিগারেটের ব্যবহার পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ই-সিগারেট ব্যবহারকারী ০.২ শতাংশ, যা প্রচলিত তামাকপণ্য ব্যবহারকারীর তুলনায় অতি সামান্য হলেও এর ব্যবহার বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষনীয় এবং সেই সাথে ই-সিগারেট সম্পর্কে শুনেছেন ৬.৪ শতাংশ মানুষ। তবে এই গবেষণা কেবলমাত্র ১৫ বছর এবং তদুর্ধ্ব জনগোষ্ঠির মধ্যে।

কিন্তু ১৫ বছরের নিচের জনগোষ্ঠির মধ্যে এর ব্যবহার আমাদের কাছে নেই। বিভিন্ন শপিংমলে, রাস্তার পাশে দোকানে, সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইনভিত্তিক শপ-এ এই ধরনের পণ্যের বিক্রি হচ্ছে খুব সহজেই। তাই আমাদের এখনই উচিত হবে এই ধরনের তামাকজাতদ্রব্য চিহ্নিত করা এবং আমদানি, বাজারজাত ও বিপণন বন্ধের পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এর ব্যবহার বন্ধ না হলে ধূমপানের দ্বারা অসুস্থ তরুণদেরকে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জন সম্ভব হবে না।

মোহাম্মদ ওয়ালী নোমান, মিডিয়া ম্যানেজার, স্বাস্থ্যসেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন।

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]