logo
প্রকাশ: ০২:০৩:২১ AM, রবিবার, অক্টোবর ২০, ২০১৯
মালিকানা ও লেনদেনে অস্বচ্ছতা : ক্ষতি ও করণীয়
মুফতি তাকি উসমানি

কোরআন মজিদের সর্বাধিক দীর্ঘ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম জাতিকে হেদায়েত দান করেছেন যে, যখন তোমরা বাকিতে লেনদেন করবে, তখন তা লিখে রাখবে। সাধারণ বাকি লেনদেনকেই যখন লিখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তখন যৌথ কারবারের মতো জটিল বিষয়টিতে কার প্রাপ্য কী হবে, তা লিখে রাখার গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। এ নির্দেশ এজন্যই দেওয়া হয়েছে, যাতে পরবর্তী সময়ে ঝগড়া-বিবাদ ও মতবিরোধ সৃষ্টি না হয়। আর হলেও তা ন্যায়নীতির সঙ্গে সমাধান করা যায়

 

আমাদের সমাজে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে এবং যে বীভৎস রূপ ধারণ করেছে, তা আদালতে দায়েরকৃত মামলা-মোকদ্দমার পরিসংখ্যান দ্বারা কিছুটা অনুমান করা যায়। তবে বাস্তবিকপক্ষে ঝগড়া-বিবাদের সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। আদালতের ব্যয় নির্বাহ অনেকের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। ফলে অনেক বিবাদ আদালত পর্যন্ত পৌঁছে না। কিন্তু বিবাদের আগুন ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে। একে অপরকে কষ্ট দেওয়া ও হেয়প্রতিপন্ন করার সবাত্মক চেষ্টাও চলতে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ শত্রুতার আগুন বংশপরিক্রমার কয়েক ধাপ পর্যন্ত গড়াতে থাকে।
এসব ঝগড়া-বিবাদের কারণ খতিয়ে দেখলে অর্থকড়ি ও জায়গাজমিই মূল কারণ হিসেবে দেখা যাবে। টাকা-পয়সা ও জমির বিবাদ রক্তের সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্বের ঘনিষ্ঠ বন্ধনকেও মুহূর্তের মধ্যে শেষ করে দেয়। বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্ব চোখের পলকে শত্রুতায় পরিণত হয়।
এ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে একটি প্রধান কারণ হলো, পারস্পরিক মালিকানা অস্বচ্ছ থাকা, লেনদেন পরিষ্কার না রাখা। ইসলামের এক সোনালি শিক্ষা হলো, ‘ভ্রাতৃত্বের আবহে বসবাস কর। আর অপরিচিতের মতো লেনদেন কর।’ অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে পরস্পরের সঙ্গে এমন আচরণ কর, যেমনটি এক ভাইয়ের অপর ভাইয়ের সঙ্গে করা উচিত। ভদ্রতা, উদারতা, সহনশীলতা ও হৃদ্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাও। আচার-আচরণে ত্যাগ স্বীকার করে অপরকে প্রাধান্য দাও। কিন্তু পারস্পরিক সুসম্পর্ক থাকলেও টাকা-পয়সার লেনদেন, জায়গা-জমির আদান-প্রদান ও অংশীদারত্বের কারবার এমনভাবে সম্পাদন কর, যেমন দুজন অপরিচিত ব্যক্তি সম্পাদন করে থাকে। অর্থাৎ লেনদেন ও কায়-কারবারের প্রতিটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া উচিত। কারবারের কোনো দিকই যেন অস্পষ্ট না থাকে, সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখা উচিত।
পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সুমধুর সম্পর্ক থাকাকালে যদি ইসলামের এ মূল্যবান শিক্ষার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত অনেক ফেতনা-ফ্যাসাদের পথ এখানেই বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের সমাজে এ মূল্যবান শিক্ষার প্রতি মোটেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। উপরন্তু কেউ এ স্বচ্ছতার প্রস্তাব দিলে তা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের পরিপন্থি বলে মনে করা হয়। প্রস্তাবকারীকে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়, যার ফল পরে সবাইকে ভোগ করতে হয়। নিম্নে এ অস্বচ্ছতার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলোÑ
অনেক সময় দেখা যায়, ভাইবেরাদার ও পিতা-পুত্র মিলে যৌথভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে। আর সাধারণত হিসাব-নিকাশ ছাড়াই প্রত্যেকে নিজ প্রয়োজন অনুপাতে তা থেকে ব্যয় করতে থাকে। ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে কার কী অবস্থান, তা স্পষ্ট করা হয় না। অংশীদারত্বের ভিত্তিতে, না বেতনভিত্তিতে, নাকি সহযোগী হিসেবে। বেতনভিত্তিতে হলে বেতন কত আর অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হলে তা কী পরিমাণÑ এসব বিষয় অস্পষ্ট থাকে, কিছুই চূড়ান্ত করা হয় না। প্রত্যেকেই নিজ চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবসার অর্থ ব্যয় করতে থাকে। যদি কেউ বেতন বা অংশীদারত্বের পরিমাণ নির্ধারণের কথা বলে, তাহলে তা ঐক্য ও সম্প্রীতি পরিপন্থি মনে করা হয়। অথচ সমাজে প্রতিনিয়তই পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, এ ধরনের অস্বচ্ছ যৌথ ব্যবসার ফলে পরস্পরে ঝগড়া-বিবাদ জন্ম নিচ্ছে। অন্তরে অন্তরে অসন্তোষ ও ক্ষোভ ধূমায়িত হচ্ছে। বিশেষ করে অংশীদারদের যখন বিয়ে-শাদি হয়ে যায়, তখন প্রত্যেকেই মনে করে, অপর অংশীদাররা ব্যবসা দ্বারা বেশি সুবিধা লাভ করছে। আমার সঙ্গে অবিচার করা হচ্ছে। তখন বাহ্যত পারস্পরিক সম্প্রীতি দৃষ্টিগোচর হলেও ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ ও ক্ষোভের লাভা উত্তপ্ত হতে থাকে। অবশেষে এ ক্ষোভ ও অবিশ্বাস পর্বতাকার ধারণ করে। আর তা আগ্নেয়গিরির রূপ নেয়। তখন ঐক্য আর সম্প্রীতির সব সেøাগান মুখ থুবড়ে পড়ে। মৌখিক বচসা থেকে শুরু করে ঝগড়া-বিবাদ, মামলা-মোকদ্দমা কোনোটাই বাকি থাকে না। ভাইয়ে ভাইয়ে কথাবার্তা বন্ধ হয়ে একে অপরের চেহারা দেখতেও তখন রাজি থাকে না। যার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসার যে পরিমাণ থাকে, সে নির্দ্বিধায় ওই পরিমাণের ভোগ দখল করতে থাকে। আদল ও ইনসাফ তখন নীরবে নিভৃতে কাঁদে। অধিকন্তু প্রত্যেকেই নিজ নিজ আসরে অপরের কুৎসা রটনায় মগ্ন থাকে।
আর যেহেতু দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকা, এ যৌথ কারবারের কোনো মূলনীতি নির্ধারিত ছিল না। সুষ্ঠু হিসাব-নিকাশও ছিল না; তাই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে পারস্পরিক সমঝোতার বিষয়টিও অত্যন্ত জটিল হয়ে যায়। ন্যায়সংগত সমাধান খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বার্থের দৃষ্টিতে ঘটনা বিশ্লেষণ করতে থাকে। ফলে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সমঝোতার কোনো উপায় বের করা সম্ভব হয় না।
বলাবাহুল্য, এসব ফেতনা-ফ্যাসাদের কারণ শুধু এটিই যে, ব্যবসার সূচনায় ও পরবর্তী সময়ে অপর কেউ অংশগ্রহণের সময় কোনো মূলনীতি চূড়ান্ত করা হয়নি। যদি শুরুতেই কার কী অবস্থান হবে, কার কী দায়িত্ব-কর্তব্য হবে, কার প্রাপ্য কী হবে, এ বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হতো এবং তা লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা হতো, তাহলে পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট অনেক ফেতনা-ফ্যাসাদের দ্বার শুরুতেই বন্ধ হয়ে যেত।
কোরআন মজিদের সর্বাধিক দীর্ঘ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম জাতিকে হেদায়েত দান করেছেন যে, যখন তোমরা বাকিতে লেনদেন করবে, তখন তা লিখে রাখবে। সাধারণ বাকি লেনদেনকেই যখন লিখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তখন যৌথ কারবারের মতো জটিল বিষয়টিতে কার প্রাপ্য কী হবে, তা লিখে রাখার গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়।
এ নির্দেশ এজন্যই দেওয়া হয়েছে, যাতে পরবর্তী সময়ে ঝগড়া-বিবাদ ও মতবিরোধ সৃষ্টি না হয়। আর হলেও তা ন্যায়নীতির সঙ্গে সমাধান করা যায়।
অতএব কোনো ব্যবসায় যদি একাধিক ব্যক্তি কাজ করে, তাহলে প্রথম ধাপেই এ বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যাওয়া জরুরি যে, এ ব্যবসায় কার কী অবস্থান হবে। এমনকি যদি বাবার ব্যবসায় ছেলে অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলেও প্রথমদিনেই এ বিষয়টি শরিয়তের দৃষ্টিতে চূড়ান্ত হওয়া জরুরি যে, সে কি বেতনের ভিত্তিতে কাজ করবে, না ব্যবসার যথারীতি অংশীদার হিসেবে, কিংবা শুধু বাবার সাহায্যকারী হিসেবে। বেতনের ভিত্তিতে হলে বেতনের পরিমাণ নির্ধারিত হওয়া উচিত। আর যদি পিতা তাকে ব্যবসার মালিকানায় অংশীদার বানাতে চায়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে এর প্রথম শর্ত হলো, ছেলের পক্ষ থেকে ব্যবসায় মূলধন যুক্ত করা (এ মূলধন সংযুক্তির একটি পন্থা এ-ও হতে পারে যে, পিতা ছেলেকে কিছু নগদ অর্থ প্রদান করবে। ছেলে ওই অর্থ দ্বারা ব্যবসার নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ ক্রয় করে নেবে)। দ্বিতীয় বিষয়টি লিখিত আকারে যৌথ ব্যবসার ডকুমেন্টস্বরূপ সংরক্ষণ করা উচিত। ডকুমেন্টে এ বিষয়টিও সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকা জরুরি যে, লভ্যাংশের কে কত শতাংশ পাবে। যাতে পরবর্তী সময়ে কোনো প্রকার জটিলতা সৃষ্টি না হয়।
যদি কোনো অংশীদারের ব্যবসায় অধিক সময় দিতে হয়, অধিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাহলে এ বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, অধিক কাজ কি বিনিময়হীন স্বেচ্ছায় করবে, না এর বিনিময়ে সে পারিশ্রমিক বা লভ্যাংশের হার বৃদ্ধি করে নেবে। মোটকথা, দায়দায়িত্ব ও প্রাপ্য সব বিষয়ই স্পষ্ট হওয়া জরুরি। আর যদি সহযোগী হিসেবে পিতার ব্যবসায় বিনিময়হীন স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে থাকে, তাহলে ব্যবসা থেকে সে কিছুই পাবে না।
যদি কারও যৌথ ব্যবসায় উপরোক্ত বিষয়গুলো এখনও চূড়ান্ত না করা হয়, তাহলে অতি দ্রুত তা চূড়ান্ত করা বাঞ্ছনীয়। এ ব্যাপারে লজ্জা, তিরষ্কার, তাচ্ছিল্য কিংবা উদারতা কোনো কিছুই প্রতিবন্ধক হওয়া উচিত নয়। যৌথ কারবারের এ স্বচ্ছতাকে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের পরিপন্থি মনে করা মস্ত বড় শয়তানি ধোঁকা ছাড়া আর কিছু নয়; বরং ঐক্য ও সম্প্রীতির স্থায়িত্ব এ স্বচ্ছতার ওপরই নির্ভরশীল। অন্যথায় এ বাহ্য ভালোবাসাই শত্রুতার জন্ম দিবে। আর এজন্য ইসলামের সোনালি শিক্ষা হলো, ‘ভ্রাতৃত্বের আবহে বসবাস কর আর অপরিচিতের মতো লেনদেন কর।’
২. আমাদের সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্যও এককভাবে গৃহ নির্মাণ বড় কঠিন বিষয়। তাই সাধারণত গৃহ ক্রয় বা নির্মাণ পরিবারের একাধিক সদস্য মিলে যৌথভাবেই হয়ে থাকে। বাবা বাড়ি নির্মাণ করলে ছেলেরাও সামর্থ্য অনুপাতে নিজেদের অর্থ দিয়ে থাকে। সাধারণত তা কোনো বিষয় চূড়ান্ত করা ছাড়াই হয়ে থাকে। (কী পরিমাণ দেওয়া হচ্ছে তার হিসাবও রাখা হয় না)। তা কি ছেলের পক্ষ থেকে বাবার জন্য হাদিয়া-সহযোগিতা, না ঋণ, নাকি বাড়ির মালিকানায় অংশগ্রহণ কিছুই স্বচ্ছ থাকে না। অথচ হাদিয়া বা দান হলে বাড়ির মালিকানায় সে অংশীদার হবে না এবং এ টাকা সে কখনও ফেরত পাবে না। ঋণ হলে বাড়ির একক মালিকানা পিতার হবে আর ছেলের প্রদত্ত অর্থ পিতার দায়িত্ব ঋণস্বরূপ থাকবে। আর যদি বাড়ির মালিকানায় অংশীদার হওয়ার জন্য টাকা দেওয়া হয়, তাহলে অর্থের পরিমাণ অনুযায়ী বাড়ির মালিকানা লাভ করবে। বাড়ির মূল্য বৃদ্ধি ঘটলে তার প্রাপ্য মালিকানারও মূল্য বৃদ্ধি পাবে। মোটকথা প্রত্যেক অবস্থার ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু যেহেতু অর্থ দেওয়ার সময় কোনো বিষয় চূড়ান্ত করা হয়নি, প্রদত্ত টাকার হিসাবও রাখা হয়নি; তাই পরবর্তী সময়ে কোনো বিরোধ দেখা দিলে বিশেষ করে এ অবস্থায় বাবার মৃত্যু হলে উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনে অবর্ণনীয় জটিলতার সৃষ্টি হয়। যারা গৃহ নির্মাণে অর্থ ব্যয় করেছে তাদের সঙ্গে অন্যদের সীমাহীন দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। কখনও এ বিবাদে পুরো বংশ জড়িয়ে যায়।
যদি ইসলামের সোনালি শিক্ষা অনুসরণ করে গৃহ নির্মাণের আগেই এ বিষয়টি চূড়ান্ত করা হতো আর তা লিখিত আকারে সংরক্ষণ করা হতো, তাহলে পারিবারিক এ দ্বন্দ্ব-কলহের সুযোগ সৃষ্টি হতো না।
৩. পরিবারের কোনো ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে শরিয়তের নির্দেশ হলো অনতিবিলম্বে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তি উত্তরাধিকারদের মাঝে বণ্টন করে দিতে হবে। কিন্তু আমাদের সমাজে শরিয়তের এ নির্দেশ পালনে চরম অবহেলা-উদাসীনতা বিরাজমান। কোথাও তো হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করে যে যা পায় তার ওপরই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। আবার কোথাও এমন মন্দ নিয়ত না থাকলেও অজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে সম্পত্তি বণ্টন করা হয় না। যদি মৃত ব্যক্তির কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য থাকে, তাহলে জীবদ্দশায় যে সন্তান তার দেখাশোনা বা সহযোগিতা করত সেই তা দেখাশোনা করতে থাকে। কিন্তু এ বিষয়টি পরিষ্কার করা হয় না যে, এখন ব্যবসার মালিকানা কার, আর তা কী পরিমাণ। উত্তরাধিকারীদের অংশ কী হারে পরিশোধ করা হবে। ব্যবসায় যে ভাই শ্রম দিচ্ছে সে এর বিনিময়ে কী পাবে; বরং কেউ যদি সম্পত্তি বণ্টনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাহলে তার এ প্রস্তাবকে সমাজে ঘৃণিত ও দোষণীয় মনে করা হয়। বলা হয় মৃত ব্যক্তির কাফনও এখনও পুরাতন হয়নি জীবিতরা সম্পদ ভাগ বাটোয়ারার ধান্ধায় পড়ে গেছে।
অথচ এ বণ্টন শরিয়তের নির্দেশ, স্বচ্ছ মালিকানার দাবিও বটে। কিন্তু এদিকে ভ্রƒক্ষেপ নেই। আর এ অবহেলার ফলাফলই কিছুদিন পর প্রকাশ পেতে থাকে। সময় অতিবাহিত হলে পরস্পরের নিজ প্রাপ্য ও অধিকারের কথা স্মরণ হয়। অসন্তোষ ও ক্ষোভ জন্মাতে থাকে। সময়ের ব্যবধানে পরিত্যক্ত সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধিতে বড় ধরনের তারতম্য ঘটে গেলে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-কলহও বড় আকার ধারণ করে। সে দ্বন্দ্ব-কলহের উপযুক্ত কোনো সমাধানও খুঁজে পাওয়া যায় না। তখন এ বিবাদ হাটে ঘাটে প্রসার লাভ করে। এমনকি কখনও আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
যদি শরিয়তের নির্দেশ অনুযায়ী যথাসময়ে সম্পদ বণ্টন হয়ে যেত, তাহলে সবার সন্তুষ্টিতে সব বিষয় মীমাংসা হয়ে যেত। সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পেত।
উপরোক্ত আলোচনায় সমাজে প্রচলিত শুধু তিনটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হলো। অন্যথায় সমাজে বিস্তৃত ঝগড়া-বিবাদ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হলে দেখা যাবে মালিকানার অস্বচ্ছতা ও লেনদেনের অপরিচ্ছন্নতা মহামারির আকার ধারণ করে আছে, ফলে সৃষ্ট হচ্ছে অসংখ্য অগণিত ফেতনা-ফ্যাসাদ, দ্বন্দ্ব-কলহ। লেনদেন ছোট হোক বা বড়, তা পরিষ্কার হওয়া উচিত। তার শর্তগুলো স্বচ্ছ ও অস্পষ্টতামুক্ত হওয়া উচিত। এ ব্যাপারে কোনো সংকোচ, লজ্জা, উদারতা বা লৌকিকতা কোনো কিছুই প্রতিবন্ধক না হওয়া উচিত। এভাবে লেনদেনের শর্তগুলো পরিষ্কার করে পারস্পরিক যত সদাচার করা যায়, ততই ভালো। নিজে ত্যাগ স্বীকার করে অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করাই কাম্য। বলাবাহুল্য, এটিই উদ্দেশ্য হলো শরিয়তের এ নীতির ‘ভ্রাতৃত্বের আবহে বসবাস কর আর অপরিচিতের মতো লেনদেন কর।’

(যিকর ও ফিকর’ থেকে গৃহীত। 
অনুবাদ : মাওলানা শাব্বীর আহমদ)

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]