logo
প্রকাশ: ১২:২২:১০ AM, বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৭, ২০১৯
একদিন নবীজির বাড়িতে
অধ্যাপক ড. মুফতি মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী

যথাসময়ে শুরু হলো মাগরিবের নামাজ। আহ! সে কি মধুর সুর। সাবলীল ভাষায় কেরাত পড়া চলল। আদায় করা হলো রুকু, সিজদা, কাওমা, জলসা। এক সময় শেষ বৈঠক শেষে সালাম দ্বারা শেষ করা হলো নামাজ। নামাজের পর তসবিহ। আওয়াবিন নামাজ ইত্যাদির পর সবাই চলে গেল তাদের বাড়ি। নবীজিও ফেরেন এ সময়ে তার স্ত্রীদের ঘরে। চলে আলাপ-আলোচনা। চলে নারীশিক্ষা কার্যক্রম। 
নবী (সা.) যখন বাড়িতে থাকেন তখন সন্ধ্যার পর নামাজ শেষে সবাই একত্রিত হয় নির্দিষ্ট ঘরে। সেখানে চলে দ্বীন ও শরিয়ত শিক্ষার কার্যক্রম। অনেক সময় আশপাশের মহিলারাও অংশ নেয় এ তালিমি মজলিসে। পর্দার আড়াল থেকে প্রশ্ন করে কোনো কোনো মহিলা। জেনে নেন জীবন চলার পথ।
নবীজি (সা.) যখন বাড়িতে
একজন লোক বাইরের লোকদের সঙ্গে অনেক সময় ভালো আচরণ করে; কিন্তু সে যখন বাড়িতে থাকে, তখনই তার আসল রূপ ধরা পড়ে। তাই বলা হয়, যে তার পরিবারের লোকজনের কাছে ভালো সে প্রকৃতই ভালো। সে হিসেবে নবীজির ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে নবীজিকে পেয়েছি একজন আদর্শ স্বামী, একজন আদর্শ পিতা, একজন আদর্শ মনিব হিসেবে।
তিনি যখন তার স্ত্রীদের সঙ্গে মেশেন, তখন স্ত্রীরা হন মুগ্ধ। তার আচরণে সবাই হয় খুশি। তার স্ত্রী আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার স্বামী নবীজি (সা.) অন্যান্য মানুষের মতোই একজন মানুষ। (তার মাঝে রাজকীয় কোনো ভাব নেই)। তিনি কাপড় সেলাই করেন। তিনি বকরির দুধ দোহন করেন। নিজের কাজ নিজেই করে নেন তিনি। তার মাঝে আছে নম্রতা আর বিনয়। অহংকার বলতে কিছুই নেই। তিনি ভদ্র ও মার্জিত আচরণের অধিকারী। এক কথায়, মানুষের মাঝে যত ধরনের ভালো গুণ হতে পারে, সবই আছে তার মধ্যে। তার সুন্দর আচরণের ফলে তার ঘর থেকে বিকশিত হয়েছে হেদায়েতের আলো। মানুষ পেয়েছে তার কাছে সত্যের দিশা। তিনি ঘরে যতক্ষণ থাকেন, খাওয়ার পেছনে পড়ে থাকেন না। অনেক সময় শুকনো খেজুর খেয়েই কাটিয়ে দেন দিন।’ (আবুল হাসান আলী নদবি : আসসিরাতুন নববিয়া, লক্ষেèৗ : আলমাজামাউল ইসলামি আল ইলমি, তা. বি., পৃ. ৪৪৭)।
তার স্ত্রী আয়েশা (রা.) আরও বলেন, ‘এক মাস পর্যন্ত দেখা যেত আমাদের ঘরের চুলায় আগুন জ্বলেনি। আমরা তার বাড়িতে এভাবেই কাটিয়ে দিতাম। বড়জোর খেজুর বা পানির ব্যবস্থা হতো।’
আমরা যখন ঘরে থাকি, তখন স্ত্রী, পুত্র-কন্যাকে নিয়ে এককথায় সংসারে আমরা ডুবে যাই। নবীজিও কি এমন করেনÑ এমন প্রশ্ন এলো মনে। আয়েশা (রা.) থেকেই উত্তর পেয়ে গেলাম, ‘নবীজি (সা.) কখনও ঘরোয়া কাজে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু যখনই আজান শোনেন, তখনই তিনি বেরিয়ে পড়েন নামাজের উদ্দেশ্যে।’ (মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল : বোখারি, খ. ১, পৃ.২৭২)।
নবীজিকে কোনো কিছুই নামাজ থেকে গাফেল করে রাখতে পারে না। যখন ডাক শোনেন তখনই তিনি সেই ডাকে সাড়া দেন। তার স্ত্রী বা পরিজন তাঁকে আগলে রাখতে পারেন না। তার বেশ কয়েকজন স্ত্রী-ই বলেছেন, যখন তিনি আজান শোনেন তখন তার চেহারায় পরিবর্তন আসে। তিনি তখন কিসের টানে যেন ব্যাকুল হয়ে পড়েন। তখন মনে হয় তিনি আমাদের চেনেনই না। নবীজি (সা.) একদিন সাহাবাদের বলেছিলেন, কেউ যদি আজান শুনে আর সে ডাকে সে সাড়া না দেয়, তাহলে তার নামাজই যেন হলো না। তবে সমস্যা থাকলে (যেমন নিরাপত্তার অভাব বা রোগ হলে) ভিন্ন কথা। 
নবীজি (সা.) একদিন জামাতে নামাজ পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বললেন, আমার তো ইচ্ছা হয় একদল লোককে খড়ি সংগ্রহ করতে বলি। এদিকে নামাজের জন্য ডাক দেওয়া হবে। যারা নামাজের জামাতে উপস্থিত হবে না, তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেব। (কেন তারা বাড়িঘরের মায়া ছাড়তে পারে না?)। কিন্তু তা করি না, যেহেতু বাড়িতে নারী ও শিশু রয়েছে। (বোখারি খ. ১ পৃ. ২৬২)।
নবীজির স্বভাব
মানুষের ওঠবস, কথাবার্তায় ফুটে ওঠে তার জ্ঞান-বুদ্ধি। প্রকাশ পায় তার মানসিক অবস্থা। নবীজিকে যারা কাছে থেকে দেখেছেন, তার সঙ্গে শয়নে-স্বপনে, সুস্থ-অসুস্থ অবস্থায় প্রচুর সময় দিয়েছেন, তারা বলতে পারবেন নবীজি (সা.) কেমন মানুষ? তাহলে আসুন, শুনি তার স্ত্রী হজরত আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.) কী বলেন।
আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) অশ্লীল কাজ করতেন না, খারাপ গালি দিতেন না। বাজারে হট্টগোল করতেন না। কেউ তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করলেও তিনি খারাপ আচরণ করতেন না। বরং তাকে ক্ষমা করে দিতেন, ছাড় দিতেন।’ (আবুল হাসান আলী নদবি : আসসিরাতুন নববিয়া, পৃ. ৪৩৪)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নাতি হুসাইন (রা.) বলেন, আমি একবার আমার আব্বা আলী (রা.) কে জিজ্ঞেস করলাম নবীজির সিরাত সম্পর্কে। আব্বা জবাবে বললেন, নবী করিম (সা.) সর্বদা হাসিমুখে থাকতেন। তাঁর প্রতিবেশী বা মুসাফিরের সঙ্গে নরম আচরণ করতেন। রুক্ষভাব তাঁর মাঝে ছিল না। শোরগোলও তিনি করতেন না। মানুষের দোষ খোঁজার তালে থাকতেন না। যে জিনিস তিনি পছন্দ করতেন না, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতেন। কোনো ব্যক্তি তাঁর কাছে আশা নিয়ে কোনো কিছু চাওয়ার পর নিরাশ হতো না। তাঁর থেকে কেউ বঞ্চিত হতো না।’ 
জানলাম নবীজি তিনটি বিষয় থেকে দূরে থাকেন : (ক) রিয়া বা লোক দেখানো ভাব। (খ) সম্পদ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। (গ) অহেতুক কথাবার্তা। 
তিনি মানুষদের তিনটি কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেন : (ক) কোনো মানুষকে তিরস্কার না করা এবং কারও দোষ না ধরা। (খ) কারও গোপন বিষয় খুঁজে না বেড়ানো। (গ) যাতে কোনো সওয়াবের আশা নেইÑ এমন কথাবার্তা না বলা। 
নবীজির মজলিস
নবীজি (সা.) এর মজলিস হয় অত্যন্ত আকর্ষণীয়। যখন তিনি কথা বলেন তখন শ্রোতারা চুপ করে শ্রবণ করেন। তারা নড়েন না। মনে হয়, যেন তাদের মাথায় পাখি বসে আছে। (ইমাম আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু হা¤¦ল : মুসনাদু আহমাদ, খ. ২, পৃ. ৪৩৮)।
নবীজির (সা.) দরবারের কথা বলছিলাম। নবীজি (সা.) এর মুখ নিঃসৃত কিছু উপদেশ শোনার জন্য আমার মন ব্যাকুল হয়ে উঠল। সাহাবায়ে কেরাম কোন কথা শোনার জন্য এত মনোযোগী, এত আগ্রহী হন যে, কথা শুনতে গিয়ে একটু নড়াচড়াও করেন না। আমার মন যখন ব্যাকুল, তখন বিভিন্ন সময়ে বলা রাসুলের উপদেশগুলো জানতে লাগলাম। এর মধ্যে দু-চারটি বাক্য এমনÑ
* ‘যখন কোনো অভাবীর প্রয়োজন তোমার সামনে ধরা পড়ে, তখন অভাবীর প্রয়োজন পূরণে সাহায্য কর।’
* ‘মুসলিম তো সেই ব্যক্তিÑ যার ভাষা ও শক্তি থেকে মানুষ নিরাপদ।’ (ইমাম মুসলিম : মুসলিম, খ. ২, পৃ. ১০)। আর ত্যাগী (মুহাজির) তো সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাকতে পেরেছে।’
* ‘যারা রাতের অন্ধকার উপেক্ষা করে মসজিদে যায় (জামাতে) নামাজ পড়ার জন্য, তাদের জন্য কেয়ামত দিবসে পূর্ণ আলোকপ্রাপ্তির সুসংবাদ রয়েছে।’
* ‘মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর তোমাদের ধনসম্পদ দ্বারা, তোমাদের জীবন দ্বারা এবং তোমাদের বক্তব্য দ্বারা।’
নবীজি (সা.) তার নিজের সম্পর্কে অনেকগুলো কথা বলেছেন। তা এ মুহূর্তে না বললেই নয়। তিনি (সা.) বলেছেন, ‘আমি তো অভিশাপ দেওয়ার জন্য আসিনি। এসেছি রহমত হিসেবে।’

সম্পাদক ও প্রকাশক : কাজী রফিকুল আলম । সম্পাদক ও প্রকাশক কর্তৃক আলোকিত মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫ থেকে প্রকাশিত এবং প্রাইম আর্ট প্রেস ৭০ নয়াপল্টন ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগ : ১৫১/৭, গ্রীন রোড (৪র্থ-৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২০৫। ফোন : ৯১১০৫৭২, ৯১১০৭০১, ৯১১০৮৫৩, ৯১২৩৭০৩, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৪৫৯৪৩, ফ্যাক্স : ৯১২১৭৩০, E-mail : [email protected], [email protected], [email protected]