আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১৪-১২-২০১৫ তারিখে পত্রিকা

রাজনীতি

লিবারেল স্পেস ও ক্ষমতা

গৌতম দাস

| সম্পাদকীয়

ইংরেজি স্পেস শব্দের সাধারণ অর্থ জায়গা; তবে সুনির্দিষ্ট এ কনটেক্সট বা পটভূমিতে একটু জায়গা দেয়া। কিন্তু একটু কেন? মানে হলো আমাকে একটু জায়গা দাও শ্বাস নেয়ার জন্য, ভালোভাবে দাঁড়ানোর জন্য কিংবা মুক্ত অনুভব করে যাতে আরামে দাঁড়াতে ও নড়াচড়া করতে পারি। তবে এর সঙ্গে অব্যক্ত আরেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তাতে আমি তোমার ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করব না, করছি না, অথবা উল্টো করে বলা যায়, তোমার ক্ষমতা যাতে চ্যালেঞ্জ না হয়ে পড়ে ওই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগের মাত্রা পর্যন্ত আমাকে একটু মুক্ত জায়গা দাও। সারকথায় এটা এক রিলেটিভ বা সাপেক্ষ অবস্থা; ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করা হবে না এ 'সাপেক্ষে মুক্ত', এটাই এখানের সূক্ষ্ম প্রসঙ্গ।

লিবারেল স্পেস কথার ভেতর লিবারেল শব্দটা ঠিক অবাধ অর্থে 'মুক্ত'- এমন ধারণা বহন করে না, বরং 'সাপেক্ষে মুক্ত' ধারণা ও অর্থ বহন করে। যেমন- কোনো দম্পতি বা কাপলের ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই এমন শুনি, এখানে কোনো একজনের অপরজনের বিরুদ্ধে অনুযোগ হলো যে, সে স্পেস দেয় না। অর্থাৎ এ অনুযোগে স্পেস শব্দের আদর্শ অর্থ হলো, প্রথমজন বলতে চাচ্ছেন, তার আকাঙ্ক্ষা যে, তাদের দম্পতি সম্পর্কের ওপর প্রভাব না পড়ে বা কোনো হানি না পৌঁছায় ইত্যাদি খেয়াল রেখে এই সাপেক্ষে সে তৃতীয় লোকজনের সঙ্গে ওঠাবসা করতে চায়। অন্যজন সেটা অনুমোদন করছে না। এ অর্থে এখানে স্পেস কথার মানে 'সাপেক্ষে মুক্ত' থাকতে চাওয়ার এক আকাঙ্ক্ষা।

রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস

সমাজ বা পরিবারের কথা থাক। আমরা এখন রাজনীতিতে প্রবেশ করব। রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস পরিবারের মতো আপাত সরল নয়। রাজনীতি এখানে ক্ষমতা ধারণাটা লিবারেল স্পেস কথার সঙ্গে আরও স্পষ্ট এবং ঘনিষ্ঠভাবে পাশাপাশি হাঁটে। ওদিকে 'লিবারেল ধারার' রাজনীতি বলে একটা ধারণা চালু আছে বলে আমরা জানি। পশ্চিমা জগতে রাষ্ট্র এবং ওই জগতের প্রায় সব রাজনৈতিক ধারাগুলোর সবাই এমন নাম-পরিচয়ে নিজেকে চেনাতে চায়। তবে এক বাড়াবাড়ি ছলনাও সেখানে থাকে। এককথায় বললে, পশ্চিমের লিবারেল ধারা আসলে সে যে ক্ষমতায় আছে এটা অটুট থাকা সত্ত্বেও সে একটা মিথ্যা ভাব আনতে চায় যে, তার অপর যারা- এরা ঠিক যেন 'তার ক্ষমতা সাপেক্ষে শুধু মুক্তই' না, তার সমাজ রাষ্ট্রে সবাই পুরাপুরি অবাধভাবেই যেনবা মুক্ত- এই ভাবের ওপর দাঁড়ানো রাজনৈতিক ধারা। যেন দাবি করা হয় ওই সমাজ রাষ্ট্রে ক্ষমতা ও বল প্রয়োগ বলে কিছুর অস্তিত্ব নেই। ফলে কোনো ক্ষমতার সাপেক্ষে লিবারেল স্পেস নয়, যেন কোনো বল প্রয়োগই অনুপস্থিত, তাই ওই সমাজে সবাই মুক্ত। সবাই অবাধ অর্থে লিবারেল স্পেসে বসবাস করে। অর্থাৎ সমাজে জলজ্যান্ত ক্ষমতার উপস্থিতি সত্ত্বেও তাকে আড়াল করে দাবি প্রচার করা যে, সবাই পুরো স্বাধীন। এই অর্থে পশ্চিমে এটা এক বাড়তি ছলনার। তাহলে সারকথা হলো, লিবারেল ধারার রাজনীতি যত লিবার্টি বা মুক্ত সমাজের কথার প্রোপাগান্ডা করুক, ছলনা করুক না কেন সবসময় মনে রাখতে হবে, আসলে এখানে মুক্ত মানে উপস্থিত একটা (পাল্টা চ্যালেঞ্জ না করা) ক্ষমতার সাপেক্ষে মুক্ত। পশ্চিমের লিবারেল ধারার এমন রাজনীতি এরই ব্রান্ড নাম 'গণতন্ত্র' এই ব্রান্ডেই এটা প্যাকেটজাত হয়ে আমাদের দেশেও হাজির দেখা যায়।

রাজনৈতিক আইডিয়া বা মতাদর্শে লিবারেল স্পেস

সব সমাজেই রাজনীতিতে নানা আদর্শ বা আইডিওলজি সদর্পে আছে, থাকে ও কাজ করে এবং থাকবেই। মোটা দাগে, এমন নানা রাজনৈতিক আইডিয়ার ধারাগুলোকে তিনটা প্রকরণে ফেলতে পারি- কমিউনিস্ট, গণতান্ত্রিক (পশ্চিমা বা লিবারেল) আর ইসলামী। লিবারেল স্পেস ধারণাটার প্রতি এ তিন ধারারই মনোভাব কেমন বা কীভাবে এরা দেখে সেদিক থেকে কথা বলব। যে কোনো রাজনৈতিক আইডিয়ায় লিবারেল স্পেস ধারণাটা আছে কিনা, থাকলে কীভাবে কতটুকু কী অর্থে আছে তাই পরখ করব। এ কাজটা করার একটা সহজ উপায় হলো, তিন রাজনৈতিক ধারারই প্রত্যেক প্রবক্তাকে জিজ্ঞেস করা যে, তার ধারার বিরোধীদের প্রতি তার মনোভাব কী? যারা বিরোধী এই 'অপর'কে সে কীভাবে দেখে? যারা তার আইডিয়া বা বয়ানের সঙ্গে একমত হবে না বলে জানাবে তাদের তিনি কী করবেন?

প্রথমে কমিউনিস্ট ধারার ক্ষেত্রে দেখা যাক- এরা বলবে লিবারেল স্পেস আবার কী? সমাজ মাত্রই শ্রেণীবিভক্ত সমাজ। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে, শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধি হয়ে আমরা এখন ক্ষমতায় আছি (অথবা বলবে যাব)। আমার বিরোধী 'অপর' মানে আমার শ্রেণীশত্রু। তাতে আবার লিবারেল স্পেস কী? অর্থাৎ লিবারেল স্পেস বলে ছোটখাটো ছলনা অথবা অবাধ ও লিবার্টিতে মুক্ত দাবি করে বড় কোনো ছলনা- কোনোটারই সে ধার ধারতে চায় না। এজন্য এদের ঘোষিত 'নো লিবারেল স্পেস' ধারা গোত্রের বলা যায়।

এবার পশ্চিমা লিবারেল গণতন্ত্রের ধারার ক্ষেত্রে দেখা যাক- এরা বলবে, আমার সব 'অপরই' মুক্ত। ওরা মুক্ত থাকবে আমাকে সমালোচনা ও প্রতিবাদ করবে, মানি না বলে স্লোগান দেবে, বিরুদ্ধ আর্টিকেল লিখবে- কোনো অসুবিধা নেই। একটা খালি কিন্তু আছে। খালি আমি যদি বুঝি যে, ওরা আমার ক্ষমতার জন্য বিপদ, আমাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে তাহলে কিন্তু রাষ্ট্রের আইনে থাকুক আর নাই থাকুক আইন ছাড়াই অথবা নতুন আইন বানিয়ে নিয়ে, প্যাট্রিয়ট ল', হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইত্যাদির মাধ্যমে আমি তাদের কোনো ধরনের খাতির না করে নির্বিশেষে সরাসরি নির্মূল করব। এর মানে দাঁড়াল যদিও আসলে এরা 'শর্তযুক্ত' লিবারেল কিন্তু মুখে দাবি করবে তারা অবাধ লিবারেল।

এবার ইসলামী ধারার ক্ষেত্রে দেখা যাক- এখানে হয়তো অনেককে পাওয়া যাবে এমন ধারার ক্যাটাগরিতে। এমন ধারার কেউ কেউ তাদের ক্ষমতাকে আল্লাহর শাসন বা কোরআনের শাসন বলে দাবি করতে পারে। তবুও সবার সাধারণ দিকটা আমল করে বললে, কমন দিকটা হলো, এদের সবাই নিজেদেরটা ইসলামী শাসন বলে দাবি করবে তা বলা যায়। এখন যেহেতু যে কোনো ক্ষমতা মাত্রই কেউ কেউ এর বিরোধিতাকারীও থাকবে, স্বাভাবিক। কিন্তু এর ফলে এক্ষেত্রে ইসলামী শাসনের বিরোধিতা সে তো ইসলামেরই বিরোধিতা হবে- এমন একটা অর্থ তৈরি হবে সেখানে। তো 'ইসলামেরই বিরোধিতা' কী করে একটা ইসলামী শাসন হতে দিতে পারে? অতএব, এখানে লিবারেল স্পেস আবার কী? ফলে এটাও নো লিবারেল স্পেস।

পাবলিক পারসেপশনে রাজনৈতিক দল

রাজনৈতিক দল কেমন হবে? একালে পাবলিক পারসেপশনে মানে, ঠিক বাস্তবে নয় তবে পাবলিকের মনে অাঁকা ছবিতে থাকা আকাঙ্ক্ষা বা গণঅনুমিত আকাঙ্ক্ষাটা কেমন? সেটা বোঝার চেষ্টা করব। কিন্তু 'একালের' কেন? বাংলাদেশ ১৯৯১ সালের পর থেকে রাজনৈতিক শাসনে এক বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ধারার শাসন যুক্ত হয়েছে। অবশ্য মাঝের দুই বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক শাসন এই ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে পপুলার ভাষায় বললে, এটা দ্বিদলীয় রাজনীতির শাসন। একের বদলে দ্বিদল। আবার দুই দলের মাঝে এক লিবারেল স্পেস আছে। সেটা যে চেহারারই বা ছলনার হোক না কেন একটা লিবারেল স্পেসের ধারণার অন্তত এক মৌখিক স্বীকৃতি সেখানে আছে। মানে রাজনৈতিক পরিভাষায় বললে দ্বিদলীয় লিবারেল ধারার ক্ষমতার শাসন। একালের পাবলিক পারসেপশনের শুরু এখান থেকেই। ১৯৯১ সালের আগে এমনটা হয়নি বা দেখা যায়নি কেন? এ বিষয়ে এদিকে বিস্তারিত যেতে চাই না প্রসঙ্গচ্যুতি হবে বলে। তাই না গিয়ে সংক্ষেপে কয়েক বাক্যে বললে, একেবারে মূল কারণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। বিগত ১৯৫০-এর দশক থেকে দুনিয়া সোভিয়েত আর আমেরিকা এ দুই বস্নকে দুই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ও রাজনীতিতে বিভক্ত হয়ে ছিল। এমন সে দুনিয়ায় গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম জিনিসটা শুধু একটা অংশে বিস্তৃত হচ্ছিল। অপর অংশেও তা প্রবাহিত বা এর গম্যতা ছিল না বা গম্য হতে চায়ওনি। ফলে স্বভাবতই অগম্য অংশে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বিস্তৃত ঘটেনি। অন্যভাবে বললে, গম্য অংশের সঙ্গে অগম্য অংশের কোনো লেনদেন বাণিজ্য বিনিময়ের সম্পর্কে সম্পর্কিত ছিল না। ফলে তা থেকে মোটা দাগে গ্লোবাল এক রাজনৈতিক বিভাজন হাজির ছিল। এ পরিস্থিতিতে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বিস্তৃত অংশ যেটার মাতবর আমেরিকা, এই অংশে আমেরিকার পক্ষে কোনো লিবারেল শাসন ব্যবস্থা কায়েম আমেরিকান নীতিতে সম্ভব ছিল না। বিশেষত আমাদের মতো দেশ কোনো লিবারেল রাজনৈতিক দলের ওপর ভর করে। ফলে আমেরিকাকে নিজের প্রভাব বিস্তারে সেকালে সরাসরি সামরিক শাসনই কায়েম করতে হতো। একমাত্র শুধু এমন শাসনের মাধ্যমেই বিভিন্ন সমাজ রাজনীতির ওপর আমেরিকান ক্ষমতার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা সম্ভব হতো। তাই আমেরিকার প্রভাবাধীন বস্নক হলেও আমাদের মতো দেশের শাসনের রূপটা দ্বিদলীয় অথবা অন্তত মৌখিক স্বীকৃতির আপাত লিবারেল- এসব বৈশিষ্ট্য এর হওয়া সম্ভব ছিল না। এভাবে যে বয়ান করলাম, এ বয়ান চিন্তার ফ্রেমে ১৯৯১ সালের আগে সেকালের সময়কে এবং আরও পেছনের আয়ুব খানের মিলিটারি শাসনকেও ব্যাখ্যা করতে সক্ষম।

সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৯০ সাল থেকেই নিজেই ভেঙে যাওয়ার এক প্রক্রিয়া শুরুর ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। যা ভেঙে যায় ১৯৯২ সালে। ফলে শুরু থেকেই এর আর নিজ প্রভাবিত দুনিয়া অংশকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় এর মুঠি আলগা হতে শুরু করেছিল। আর এর ফলে আমেরিকা এক মেরুর এক দুনিয়া পেয়ে যায়। ফলে এটাই আমেরিকার পক্ষে এবার দুনিয়ায় নতুন লিবারেল দ্বিদলীয় শাসনের সূত্রপাত করার মতো নতুন শর্ত হিসেবে উপস্থিত হয়। আমেরিকা সেটাকে আমল করে কাজে লাগিয়ে বাস্তব করে তুলেছিল। আমাদের মতো দেশে এরই মধ্যে আবার এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত জনগণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকেই একালে রাজনীতি সম্পর্কে পাবলিক পারসেপশনে বা গণ-অনুমিত আকাঙ্ক্ষাটা হলো রাজনৈতিক দলমাত্রই সেটা তো এক 'লিবারেল' দলই হবে। আমাদের পপুলার ভাষায় ভোটের রাজনীতির দল।

যেমন, ৮০'র দশকেও কমিউনিস্টদের মধ্যে রাজনৈতিক তর্কের এক বড় ইস্যু ছিল পার্টি কেমন হবে 'মাস লাইনের' না 'সশস্ত্র লাইনের'। একালের ভোকাবুলারিতে 'মাস লাইন' কথাটাও পরিচিতি হারিয়ে ফেলেছে। এখন অচল, হারিয়ে যাওয়া ধারণা। ইংরেজি রাজনৈতিক পরিভাষায় 'মাস' মানে, জনগণ বা 'গণ' বলতে যা বুঝি তাই। তাই মাস লাইন মানে হলো, দলকে আগানোর জন্য দলের তৎপরতা 'গণ-আন্দোলনে' সংগঠিত করে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে আগাবে। সবকিছুই হবে প্রকাশ্য তৎপরতার মাধ্যমে; জনগণকে আকৃষ্ট করে সরাসরি অংশগ্রহণ করানোর এক প্রকাশ্য পপুলার উইল তৈরি করার মাধ্যমে। এমন দলকে কনস্টিটিউশনাল দলও বলা হয়। কারণ অন্তত মুখে ও পার্টির প্রকাশ্য কাগজপত্র দল দেশের কনস্টিটিউশন মানে বলে স্বীকার করে সে তৎপর থাকে। এছাড়া মনে বা রাজনৈতিক চিন্তায় যাই থাক, সে ভাব ধরে যে, উপস্থিত রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতাকে সে চ্যালেঞ্জ করছে না। ফলে লিবারেল স্পেসে নড়াচড়া তৎপরতার সুযোগ সে চায় এবং পায়। এমনকি নির্বাচন কমিশনে দলের নাম রেজিস্ট্রেশন নেয়ার সুযোগও নিয়ে থাকতে পারে। তবে চলতি হাসিনা সরকারের আমলে এ লিবারেল স্পেস ক্রমেই নাই হতে চলেছে।

 

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Goutamdas1958@hotmail.com

১১ ডিসেম্বর ২০১৫

 

::::imageTop