আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১২-০১-২০১৭ তারিখে পত্রিকা

আহমেদ সুমন

আজ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দিবস। ২০০১ সাল থেকে এ দিনটিকে কর্তৃপক্ষ ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে পালন করছে। তৎকালীন ভিসি খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুল বায়েস ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ পালনের প্রচলন করেন। এখন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়। অধ্যাপক আবদুল বায়েস এক্ষেত্রে পথিকৃৎ। তবে এর আগে আরেক খ্যাতিমান ভিসি অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৯৬ সালের ১২ জানুয়ারি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ বছর পূর্তি উৎসব পালন করেন। 
বিশ্ববিদ্যালয় দিবস বা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীÑ যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, সবার কাছে এ ধরনের উৎসব পুনর্মিলনী হিসেবে পরিগণিত। পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে সাবেক ও বর্তমান মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ইংরেজি অভিধানেও পুনর্মিলনী বলতে তাই বোঝানো হয়েছে। পুনর্মিলনীর ইংরেজি প্রতিশব্দ Reunion. Reunion বলতেUnion after separation, an assembly of friends, old students--কে বোঝায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বয়স বাড়লে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়। স্বাধীনতার সমান বয়সী জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়েরও বয়স বেড়েছে। ২০১১ সালে এ বিশ^বিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়। অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ২০১৬ সালে অ্যালামনাই ডে মিলনমেলার আয়োজন করে। সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির বিশ্ববিদ্যালয়ে নবগঠিত অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ব্যাচের রসায়ন বিভাগের ছাত্র ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবস এবং অ্যালামনাই ডে মিলনমেলা উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন নানা ধরনের অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। ১২ জানুয়ারি সকালে বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ চত্বরে জাতীয় পতাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। ভিসি অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম বিশ^বিদ্যালয় দিবস কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।
ইতিহাসের এ পথপরিক্রমায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। চারটি বিভাগ ও ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল, প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছরে সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ মহিরুহ ধারণ করেছে। বর্তমানে দুইটি ইনস্টিটিউট ও সাতটি অনুষদভুক্ত ৩৫টি বিভাগে ১৫ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী অধ্যয়ন করছে। ছাত্র হলের সংখ্যা ৮টি এবং ছাত্রী হলের সংখ্যাও ৮টি। প্রতিষ্ঠার ৪৬ বছরে এ পর্যন্ত ৫টি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম সমাবর্তনে নিবন্ধকৃত গ্রাজুয়েট সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৪৮৪ জন, দ্বিতীয় সমাবর্তনে ৫ হাজার ১২ জন, তৃতীয় সমাবর্তনে ৪ হাজার ৩৮৩ জন, চতুর্থ সমাবর্তনে ৩ হাজার ৮৭৪ জন, ২২ জন এমফিল, পঞ্চম সমাবর্তনে প্রায় ৯ হাজার গ্রাজুয়েট অংশগ্রহণ করেন।
প্রতিষ্ঠার এ ৪৬ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় গৌরবোজ্জ্বল অনেক কীর্তি সাধিত হয়েছে। এর আগের নিবন্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রদের রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা কীর্তি ও অবদানের বিষয়াদি আলোচিত হয়েছে। পাঠকদের কাছে নতুন তথ্য জানানোর নিমিত্তে বিশ^বিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল অগ্রযাত্রার ৪৬ বছরের পদার্পণে বক্ষমাণ নিবন্ধে সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আলোচনা করতে চাই।
বিগত শতকের ৯০ দশকে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়কে সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে অভিহিত করেন। সেই থেকে সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের পরিচিতি গড়ে উঠেছে। সাংস্কৃতিক রাজধানীর কুশীলবদের হাতেখড়ি হয়েছিল সেলিম আল দীনের হাতেই। বাংলাদেশ তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম মুক্তমঞ্চ নির্মিত হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে। গ্রিক আদলে গড়ে ওঠা এ মুক্তমঞ্চ নির্মাণ করেন তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। ১৯৮০ সালে সেলিম আল দীন রচিত ও নির্দেশিত শকুন্তলা নাটক দিয়ে শুরু হয় মুক্তমঞ্চের অনুষ্ঠানযাত্রা। আজকের নন্দিত অভিনেতা ফারুক আহমেদ, শুভাষিক ভৌমিক প্রমুখ অভিনয় শিল্পীর অভিষেক ঘটে এ নাটকের মধ্য দিয়ে। কৃতীমান অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি, শহিদুজ্জামান সেলিম, রাজু আহমেদ প্রমুখ শিল্পীর নাট্যজগতে প্রবেশিকা পর্ব এ মুক্তমঞ্চে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ঘটে। মুক্তমঞ্চে দ্বিতীয় মঞ্চায়নকৃত নাটক ‘চোর’। ফারুক আহমেদ নির্দেশিত এ নাটকের রচয়িতা ছিলেন নাট্যজন সালাম সাকলাইন। সালাম সাকলাইন রচিত জাহেন আলীরে ধর, বানরের পিঠা বণ্টন, কারিগরনামা, সেনের খিলের তালুকদার, হামেদ আলীর স্বর্গদর্শন প্রভৃতি নাটক এ মুক্তমঞ্চে মঞ্চায়ন হয়। কারিগরনামার নির্দেশক সাইফুল ইসলাম সোহাগের অভিনয় দর্শকদের কাছে আজও অমলিন। গীতিকার, সুরকার ও অনুবাদক হিসেবে আরেক সাবেক ছাত্র বর্তমানে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আফসার আহমদ বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। টেলিভিশনের অনুষ্ঠান উপস্থাপনায়ও তিনি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তার সাবলীল ও শুদ্ধ উচ্চারণ টেলিভিশন দর্শকদের আবিষ্ট করে রাখে। ‘প্রেম উপাখ্যান’ নাটকের মধ্য দিয়ে ড. আফসার আহমদ সৃজনশীল নাট্যচর্চায়ও বিশেষ নজির স্থাপন করেছেন। বিশ^বিদ্যালয়ের অষ্টম ব্যাচের ইংরেজি বিভাগের সাবেক ছাত্র আহমেদ রেজার উপস্থিত বক্তৃতা এবং অনুষ্ঠান উপস্থাপনা সবার কাছেই চমৎকার লাগে। তিনি ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করছেন এবং বাংলাদেশ বেতারের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান উত্তরণ উপস্থাপনা করেন। সাবেক ছাত্র ড. রশীদ হারুন একাধারে অভিনয় শিল্পী, গবেষক এবং বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকও বটে। তিনি পুতুলনাট্য নিয়ে গবেষণা করছেন। তার পুতুলনাচ দেশ-বিদেশে বিশেষ সুনাম ও প্রশংসা অর্জন করেছে। সাংস্কৃতিক পরিম-লে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদর মধ্যে নতুন প্রজন্মের টেলিভিশন নাট্যশিল্পী হিসেবে সুমাইয়া সিমু, জাকিয়া বারী মম, মাজনুন মিজান প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। যশ, মনো, পারভেজ আখতারসহ বিশ^বিদ্যালয়ের আবর্তন পরম্পরা মুক্তমঞ্চে অনেকের অভিনয় দর্শককে আনন্দ দিয়েছে। বাংলা বিভাগের সাজেদ ফাতেমী ও খুশবু, ভূত্তিক বিভাগের রাসেল, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ফকিরের গান দর্শক শ্রোতাদের মনে স্থায়ী আসন গেড়ে আছে। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব, ইংরেজি, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী যারা গান গেয়ে মুক্তমঞ্চ মাতিয়েছেন, তারাসহ অনেকের নাম এ নিবন্ধে উল্লেখ করা সম্ভব হলো না, সেজন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা আশা করব, ভবিষ্যতে অন্য কেউ সাংস্কৃতিক রাজধানীর সব কুশীলবকে নিয়ে লিখবেন। 
সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজ থেকে অনাচার, অনিয়ম, অশুচি, অশিষ্ট আচার-আচরণ দূরীভূত হয়। সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংঘটিত হয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের আহ্বানে। রাষ্ট্র, সমাজ সভ্যতা ও সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক কুশীলবদের ভূমিকায় বিশ^বিদ্যালয় গর্ববোধ করতে পারে। দেশ-বিদেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক দূতদের পরিচয়-পরিচিতি ও বিশ^বিদ্যালয়ের সুনামের যে প্রসার ঘটছে, তাতে কারও সংশয় নেই। সাংস্কৃতিক রাজধানীর বুকে আরও জন্ম নেবে নতুন রথীমহারথীরÑ এমন প্রত্যাশা সবার। হ

আহমেদ সুমন 
অ্যালামনাই, ২২তম ব্যাচ, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ সেশন ১৯৯২-১৯৯৩
 


খবরটি পঠিত হয়েছে ৬০০ বার