আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৭-০২-২০১৭ তারিখে পত্রিকা

চকরিয়ার দরিদ্র পল্লীর বন্ধু আইসিডিডিআরবি

বিএম হাবিব উল্লাহ, চকরিয়া
| সুসংবাদ প্রতিদিন

১৯৯১ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ল-ভ- করে দিয়ে যায় চকরিয়াসহ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা। ঘটে প্রায় ৩ লাখ মানুষের প্রাণহানি। ঘূর্ণিঝড়ের পরে সরকারি-বেসরকারি ত্রাণের বন্যায় মানুষের প্রাণ বাঁচানোর পাশাপাশি পুনর্গঠনের কাজ চলে জোরেশোরে। বিনামূল্যের ত্রাণের পেছনে ছুটতে শুরু করে তারা। এর ফলে মানুষের আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয়। ঠিক এ সময় ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র’ বা আইসিডিডিআরবি চকরিয়ার মানুষের পরনির্ভরতা দূরীকরণ, আত্মবিশ^াস ফিরিয়ে আনা ও বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। স্বাস্থ্যকে মাধ্যম করে ‘স্বাস্থ্য বিষয়ে স্বনির্ভরতা’ এ সেøাগান নিয়ে তারা এগিয়ে যায়। স্থানীয় স্বনির্ভর সংগঠনগুলোকে এ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়। চকরিয়ার দরিদ্র মানুষের বন্ধু হিসেবে কাজ করে আইসিডিডিআরবি।
আইসিডিডিআরবি চকরিয়ার ফিল্ড রিসার্চ ম্যানেজার শহীদুল হক জানান, চকরিয়ার ৪৯টি গ্রামের প্রায় ১৭ হাজার পরিবার বা খানার সদস্যদের সব তথ্য আমরা সংরক্ষণ করেছি। এ তথ্যভা-ারকে বলা হয় ‘হেলথ অ্যান্ড ডেমোগ্রাফিক সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম’ বা এইচডিএসএস। চকরিয়ায় এইচডিএসএসে কর্মরত শরীফ আল হাসান ও আশিষ পাল বলেন, আমরা এইচডিএসএসের মাধ্যমে ডেমোগ্রাফিক বা জনমিতিবিষয়ক বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে থাকি। এর মধ্যে আছে জন্ম, মৃত্যু, গমনাগমন, বিয়ে, শিক্ষা ও শিশুর টিকা পরিস্থিতি, স্বাস্থ্য বীমায় মানুষের অংশগ্রহণ, গর্ভকালীন ও পরবর্তী যতœ, তামাকের ব্যবহার, লবণের ব্যবহার, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের প্রভাব ইত্যাদি। এছাড়া স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ধনী-গরিবের সাম্য বিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তথ্য সংগ্রহকারীরা প্রতি ৩ মাস অন্তর খানা পরিদর্শনের মাধ্যমে ওই তথ্যগুলো সংগ্রহ করে থাকেন। শুরুতে কাগজে ছাপানো ফরমে তথ্য সংগ্রহ করা হতো। এখন সরাসরি ইন্টারনেটের মাধ্যমেই তথ্যগুলো সার্ভারে জমা হয় বলে তারা জানান।
আইসিডিডিআরবি চকরিয়া ক্যাম্পাসের গবেষণার মূল দিক হচ্ছে, স্বাস্থ্য বিষয়ে আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করা। শুরু থেকে এ পর্যন্ত আইসিডিডিআরবি চকরিয়া ক্যাম্পাস ‘স্বনির্ভর স্বাস্থ্য’ কার্যক্রম ছাড়াও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় গরিবের অভিগম্যতা বা দারিদ্র্যবান্ধব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো মনিটরিংয়ের কার্যক্রম বা ইউনিয়ন ও গ্রামভিত্তিক হেলথ ওয়াচ, যা স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে বর্তমানেও চলমান আছে। 
জানা গেছে, পল্লী এলাকায় টিবি বা যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণের বিকল্প পদ্ধতির কার্যকারিতা পরীক্ষণ, যক্ষ্মা রোগীর সেবা কেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাম্যতা ও বিলম্ব হওয়ার কারণ অনুসন্ধান; কিশোর-কিশেরীদের স্বাস্থ্য ভাবনা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এর প্রতিফলন; খাবারে লবণ ব্যবহারে মানুষের বিশ্বাস, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট; মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে মানুষের প্রস্তুতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান; ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্ভাবনমূলক কার্যক্রম যথা গ্রাম ডাক্তারদের ক্ষতিকর ব্যবস্থাপত্র কমানোর লক্ষ্যে স্থানীয় গ্রাম ডাক্তারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিক ও নিয়মসিদ্ধ জ্ঞান দান; গ্রাম ডাক্তারদের ‘স্বাস্থ্যসেনা’ বা স্বাস্থ্যের অগ্রবর্তী সৈনিক হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদান; টেলিমেডিসিন বা মোবাইলভিত্তিক স¦াস্থ্যসেবার মাধ্যমে স্বীকৃত ও গ্র্যাজুয়েট ডাক্তারের সঙ্গে গ্রাম ডাক্তারের সংযোগ স্থাপন; শৈশবে শিশুদের টিকা দানের প্রভাব পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য শিশুর স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রমের প্রভাব মনিটরিং; মাদের প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির হার বাড়ানোর লক্ষ্যে হতদরিদ্র মাদের জন্য মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার স্কিমের পাইলট প্রকল্প পরীক্ষণ; ম্যালেরিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণে মশারিতে কীটনাশক ওষুধের ব্যবহার ও মানুষের আচরণ পরিবর্তনের পাইলট কার্যক্রম; প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষের সহনীয়তা ও সক্ষমতা অনুন্ধান; তামাক ও তামাক জাতীয় দ্রব্য পরিহার বা ব্যবহার কমানোর লক্ষ্যে মানুষের আচরণ পরিবর্তনে বিভিন্ন উদ্বুদ্ধকরণ পদ্ধতির ব্যবহার ইত্যাদি গবেষণা পরিচালিত হয়েছেÑ যার সবক’টিতে চকরিয়া এইচডিএসএসের তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। 
দীর্ঘদিন একই এলাকার তথ্য এবং পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা (গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে) প্রদান করলেও চকরিয়ার তথ্য-উপাত্ত পরিসংখ্যানে পক্ষপাতিত্ব নেই বলে ঢাকা থেকে টেলিফোনে মন্তব্য করেছেন আইসিডিডিআরবির অ্যাসিস্ট্যান্ট সাইন্টিস্ট এস এম এ হানিফী। তিনি বলেন, প্রতিটি মাঠ কর্মীকে যথাযথ ও উন্নত প্রশিক্ষণ দেয়ার পর তথ্য সংগ্রহের কাজে লাগানো হয়। একাধিক পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। এছাড়া একাধিক স্তরে তথ্য যাচাই ও মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে। মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শনে গিয়ে জানা গেছে, এলাকার স্বাস্থ্য ও মানুষের সামাজিক উন্নয়নে আইসিডিডিআরবি চকরিয়া ক্যাম্পাস শুরু থেকে মানুষের মধ্যে তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে একটি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠেছে। তাছাড়া এলাকাবাসীর সঙ্গে আইসিডিডিআরবির আন্তরিক সম্পর্ক এলাকাবাসীর মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। বরইতলী ইউনিয়নের গ্রামবাসী আকতার আহমেদ জানান, আইসিডিডিআরবি আসার পর থেকে গ্রামের মানুষের মধ্যে স¦াস্থ্য উন্নয়নে নিজেদের প্রচেষ্টার একটি ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কর্মীদের প্রতিনিয়ত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তাছাড়া এলাকার স্বাস্থ্য উন্নয়নে গ্রামবাসীদের একতাবদ্ধ করে আইসিডিডিআরবি আমাদের স্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের এইচডিডিএসএসের সমন্বয়ে আফ্রিকার ঘানায় ইনডেপথ নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। চকরিয়া এইচডিএসএস এ নেটওয়ার্কের একটি সক্রিয় সদস্য।