আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৭-০৩-২০১৭ তারিখে পত্রিকা

বাংলা ক্রিকেটের লঙ্কা জয় ও আমাদের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ

শরীফুর রহমান আদিল
| সম্পাদকীয়

 কাবাডি বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হলেও কালের বিবর্তনে ক্রিকেট দেশে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের খেলা হলেই শত বাধা, হরতাল, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা রোদ-বৃষ্টি সবকিছু উপেক্ষা করে ভরপুর গ্যালারি তারই প্রমাণ করে। আর বিজয়ের পর সারা পাড়া-মহল্লায় জয়োৎসব হয়। ক্রিকেটের ওপর বাংলাদেশের আবেগ আর উচ্ছ্বাসেরই বাস্তব চিত্র সমাজ, রাষ্ট্র তথা পৃথিবীর বুকে ফুটে ওঠে। যা হোক, বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলে বহু বছর আগ থেকে। আর এর পরিপ্রেক্ষিতেই জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে এ খেলা। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে প্রথম টেস্ট প্লেয়িং দেশ পাকিস্তানকে হারানোর মধ্য দিয়ে শুরু বড় জয়ের। এরপর একে একে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, শ্রীলঙ্কাসহ সব দেশকে হারায় বাংলার টাইগাররা। এই ধারাবাহিকতা এখনও অক্ষুণœ রয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যে আগের অবস্থানে নেই সেটা বিশ্বের বাঘা বাঘা সাবেক খেলোয়াড় বলেছেন বিভিন্ন সময়। আমার এর ধারাবাহিকতা এখন শ্রীলঙ্কায় দেখতে পাচ্ছি। প্রথম একদিনে ম্যাচে যেভাবে খেলে জিতল তাতে এটা ভালোভাবে প্রমাণিত হলো। কারণ ক’দিন আগে অস্ট্রেলিয়া তাদের কাছে টেস্ট সিজির হেরেছে। তার মানে শ্রীলঙ্কা দল তার শক্তিতে দুর্বল নয়। 
যা হোক, একটু পেছন ফিরলে দেখা যাবে, এর আগে একটি খেলায় জয়ের পর আবার দেখতে হয় বাংলাদেশের ছন্দপতন, কোনো কোনো ম্যাচে কোনো নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের নান্দনিক কিছু শট; আবার কোনো কোনো ম্যাচে কিছুটা আশা জাগানোÑ এভাবেই চলছিল ৬ থেকে ৮ বছর। আর এভাবেই সন্তুষ্ট থাকতে হতো বাংলাদেশসহ পৃথিবীজুড়ে থাকা টাইগার ভক্তদের। তবে এ যাত্রার মধ্য দিয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশ গ্রহণ করে ফেলেছে হোয়াইটওয়াশের স্বাদও। কিন্তু এসব অভাবনীয় সাফল্য শুধু ওয়ানডেতে পরিলক্ষিত হয়েছে; টেস্টে টাইগারদের জয়রথ যেন কচ্ছপগতিতে এগোচ্ছিল। কেননা টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম জয় পেতে খেলতে হয়েছে ৩৫ ম্যাচ! ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ১০০টি টেস্ট খেলেছে; কিন্তু জয় শুধু চারটি টেস্ট দলের বিপক্ষে। তাও দুর্বল জিম্বাবুয়ে আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এসেছে এসব জয়! তাই বলা যায়, বাংলাদেশ ঐতিহাসিক এ জয়ের আগে যে আটটি ম্যাচ জিতেছে তার মধ্যে পাঁচটি জিতেছে দুর্বল জিম্বাবুয়ে আর দুইটি জিতেছে দ্বিতীয় সারির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে! শুধু ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের সঙ্গে বিজয় ছাড়া বলতে গেলে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে আর দলীয় অর্জন নেই। তবে ব্যক্তিগত অনেক অর্জন রয়েছে। তাই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এ জয় বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে বিজয়ের যে বদনাম ছিল তা কিছুটা হলেও ঘুচবে। টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম জয় পেতে খেলতে হয়েছে ৩৫ ম্যাচ আর বাকি ৬৫ টেস্টে বাংলাদেশের জয়ের ঝুলি ৯টি, যা সত্যিই ক্রমান্বয়ে উন্নতির লক্ষণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। 
দেশের মাটিতে দাপুটে বাংলাদেশ বিদেশের মাটিতে উল্টো ভাব দেখে অনেকে সমালোচনায় মত্ত ছিলেন। কেউবা আবার দেশের মাটিতে হিরো বনে যাওয়া মিরাজ কিংবা এনামুল হক জুনিয়রদেরও সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, শুধু দেশের মাটিতে স্পিনসহায়ক উইকেট তৈরি করে নতুন নতুন বোলারকে হিরো বানানো হচ্ছে; কিন্তু এসব হিরো বিদেশের মাটিতে গিয়ে জিরো হয়ে পরের ম্যাচে বাদ পড়ছে, যা বাংলাদেশ কোচিং স্টাফদের জন্য সত্যিই লজ্জাজনক ছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের শততম টেস্ট ম্যাচ জয়ে সমালোচকদের এ ধরনের সমালোচনা বন্ধ করে দেবে বলে বিশ্বাস। 
ডায়েরিতে কিংবা ইতিহাসে ১৯ মার্চ  নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য এক অবিস্মরণীয় দিন। বলা যায়, এ যেন বিজয়ের মাসে স্মরণীয় অন্য এক বিজয়। তবে কোচ হাথুরুসিংহে বাংলাদেশের এ ঐতিহাসিক জয়ে ক্রিকেটারদের মধ্যে যে আবেগের সৃষ্টি হয়েছে তার লাগাম টেনে ধরে আরও প্রফেশনাল হওয়ার যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বাংলাদেশ কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়া-বধের মধ্য দিয়ে যে আবেগে ভেসে যাচ্ছিল তা পরে আর দেখা যায়নি। 
বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন সামাজিক, রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ঐক্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের খেলা সেখানেই সব দল, মত, ধর্ম-বর্ণ সবাই দেখে আর প্রার্থনায় মত্ত থাকে জয়ের প্রত্যাশায়। পরিশেষে জয়ের মধ্য দিয়ে সবার বিভেদ ভুলে আবার বিজয় মিছিল সত্যিকার বাংলাদেশের ঐক্যই পরিলক্ষিত হয়। মনে হয়, বাংলাদেশে নেই কোনো বিভেদ, নেই কোনো হানাহানি কিংবা রেষারেষি; এ ঐক্য ও আবেগের মূল্য দেয়ার সময় এখন বাংলাদেশের সামনে। ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মাত্র ১০০ টেস্ট যে কোনো দেশের জন্য কম বলে গণ্য হয়, তাই আগামীতে বাংলাদেশ আরও বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ তার স্বভাবসুলভ খেলা খেলে আগামীতে দেশে ও দেশের বাইরে আরও বেশি জয় উপহার দেবেÑ এ প্রত্যাশা সবার। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর যেমনি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে স্মরণীয় হয়ে আছে, তেমনি ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশের ডায়েরিতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। 
আমাদের ক্রিকেট এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেটকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে ঘরোয়া ক্রিকেটের ওপর আরও জোর দিতে হবে। ডোমেস্টিক ক্রিকেট না আগালে জাতীয় পর্যায়ে আমরা ভালো খেলোয়াড় পাব না। শুধু বিকেএসপির ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। জেলা পর্যায়ে ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে থানা পর্যায়ে ক্রিকেটে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্রিকেট শুধু একটি খেলা নয়; আবেগের নামও বটে। জেলা পর্যায়ে যেসব লীগ অনুষ্ঠিত হয় সেগুলোর ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে। সেই সব তরুণ খেলোয়াড়কে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। সারাবছর মাঠে ক্রিকেট থাকতে হবে। শরীফুর রহমান আদিল 
শিক্ষক, দর্শন বিভাগ, ফেনী সাউথ ইস্ট ডিগ্রি কলেজ