আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৭-০৩-২০১৭ তারিখে পত্রিকা

মুন্সীগঞ্জ ও রূপগঞ্জে স্বাধীনতা দিবসে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি

আওয়ামী লীগে সংঘর্ষ গুলি : আহত ৫৫

মুন্সীগঞ্জ ও রূপগঞ্জ সংবাদদাতা
| শেষ পাতা

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে আওয়ামী লীগের দু’পক্ষে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাংচুর ও গোলাগুলি হয়েছে। স্বাধীনতা দিবসের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নিয়ে রোববার দুপুরে এম রহমান শপিং কমপ্লেক্সে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ এবং সাবেক ছাত্রনেতা গোলাম সারোয়ার কবিরের সমর্থকদের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ শতাধিক রাউন্ড কাঁদানে গ্যাস ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষে কমপক্ষে ২৫ জন আহত হন। এদিকে স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা শাজাহান ভূঁইয়া ও এমপি গোলাম দস্তগীরের পক্ষের লোকজনের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়েছে। এতে গুলিবিদ্ধসহ ৩০ জন আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এম রহমান শপিং কমপ্লেক্সের সামনের রাস্তায় সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা গোলাম সারোয়ার কবির গ্রুপের লোকজন মিছিল বের করে। এ সময় স্থানীয় এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষের গাড়ি বহর এ কারণে আটকা পড়ে। খবর পেয়ে ঘটনা স্থল থেকে তিনশ গজ দূরে ঝুমুর হলের সামনে অপেক্ষমাণ  এমপি গ্রুপের লোকজন তাকে এগিয়ে আনতে যান। তখন দু’গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ঘণ্টাব্যাপী চলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গোলাগুলি। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শতাধিক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও কাঁদানো গ্যাস ছুড়ে পুলিশ। সংঘর্ষে দুই গ্রুপের অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। তাদের কয়েকজনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষ শুরু হলে এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ দৌড়ে ঝুমুর সিনেমা হলে আশ্রয় নেন।
গোলাম সারোয়ার কবির গ্রুপের নেতা ও জেলা যুবলীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক মশিউর রহমান মামুন দাবি করেন, পুলিশ প্রহরায় এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষের লোকজন উসকানি দিয়ে সংঘর্ষ শুরু করে। তার লোকজন পিস্তল দিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি করে। আমাদের লোকজন প্রাণ বাঁচাতে মার্কেটের ভেতর আশ্রয় নিলে তারা মার্কেটে ও আশপাশের দোকানে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এতে বেশ কয়েকজনকে আহত হন। গুরুতর আহত আসিকুর রহমান সোহেল, শাহাজাহান দেওয়ান, নাজমুল সরদার, জহিরুল হক নিশাত, সাইফুর রহমান, রাতুল, সোহেল শাহরিয়ার, মিল্টন, জুলফিকার, পারভীন ও অপর একজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অপরদিকে এমপির লোকজন দাবি করেন গোলাম সারোয়ার কবিরের লোকজনই প্রথমে এমপির গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করে এবং উসকানি দিয়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত করে। তারা এমপির লোকজনকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি ছুড়ে। ঘটনার পরপরই লৌহজং সার্কেলের এএসপি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং জেলা পুলিশ লাইন থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
গোলাম সারোয়ার জানান, শ্রীনগর থানার ওসির সঙ্গে আলোচনা করে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে র‌্যালি করা নিয়ে সমন্বয়ে করা হয়। সেখানে বলা হয় আপনারা দু’পক্ষ দুইটি রোড ব্যবহার করবেন। এমপি সমর্থকরা ঝুমুর হল সড়ক ব্যবহার করবে এবং আমাদের সমর্থকরা এমএম রহমান রোড ব্যবহার করবে। তবে এমপি সমর্থকরা এমএম রহমান রোডে এসে আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় আমাদের ১০ জন আহত হয়েছেন। শ্রীনগর থানার ওসি এস এম আলমগীর হোসেন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিতে ফাঁকা গুলি করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে সিরাজদিখান সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার কাজী মাকসুদা লিমা জানান, অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শটগান ও টিয়ার শেল ব্যবহার করতে হয়েছে। পুলিশ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য অভিযান চালাচ্ছে।
রূপগঞ্জে দফায় দফায় সংঘর্ষ : পুলিশ ও প্রত্যেক্ষদর্শীরা জানান, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মুড়াপাড়া স্টেডিয়াম মাঠে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এতে উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশের নেতৃত্বদানকারী শাজাহান ভূঁইয়া সমর্থিত কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম তার লোকজন নিয়ে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের অপর অংশের নেতৃত্বদানকারী এমপি গোলাম দস্তগীর পক্ষের ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জায়েদ আলীসহ ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেন, ফারুক ভূঁইয়া, মহিউদ্দিন, বাদল ভূঁইয়া, আলমগীরে নেতৃত্বে লোকজন রফিকুলের লোকজনকে সেখানে যেতে বাধা দেয়। এ সময় সিএনজি অটোরিকশা ভাংচুরসহ চার থেকে পাঁচজনকে পিটিয়ে আহত করেন তারা। পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এদিকে, বিকাল ৩টার দিকে নাওড়া এলাকা থেকে কায়েতপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৫০ থেকে ২০০ গাড়ি ও মোটরসাইকেলের বিশাল বহর নিয়ে কায়েতপাড়ার নাওড়া এলাকা থেকে বিজয় র‌্যালি বের হয়। সেখানে মোশারফ মেম্বারের লোকজন র‌্যালিতে বাধা দেয়। এ সময় দুই পক্ষে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হলে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে ঘটনাস্থল থেকে আসার পথে হরিণা এলাকায় দৈনিক প্রথম ভোরের স্টাফ রিপোর্টার দৃক বিজয়কে কুপিয়ে জখম করে এক পক্ষ। এ সময় তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। র‌্যালিটি বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ইছাখালী এলাকা অতিক্রম করার সময় সেখানে আগে থেকে অবস্থান নিয়ে থাকা এমপি সমর্থিত লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের সময় পুরো এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় এক পক্ষ অপর পক্ষকে লক্ষ করে গুলি ছুড়ে বলে দুই পক্ষই অভিযোগ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে এ সময় পুলিশ অর্ধশতাধিক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের সময় রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল ও দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। সংঘর্ষকালে নেতাকর্মীরা বেশ কয়েকটি দোকানপাট ও যানবাহন ভাংচুর করে। সংঘর্ষে কায়েতপাড়ার নগরপাড়া এলাকার ছাত্রলীগ নেতা দ্বীন ইসলাম, নাওড়া এলাকার আকরাম হোসেন গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শ্রী রবি রায়, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইয়ার হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা আওলাদ হোসেন, কামাল আহমেদ রঞ্জু, মহিউদ্দিন, সুলতান আহমেদ, যুবলীগ নেতা মিলন মিয়া, আল আমিন হোসেন, ইউনিয়ন মহিলা লীগের সভাপতি জোসনা বেগম, মহিলা লীগ নেত্রী হাসু বেগম, সুলতানা বেগম, সাদিয়া খাতুন, শাহিদা বেগম, জাহানারা আক্তার, আরজুদা, ছাত্রলীগ নেতা শাকিল আহমেদ, নূর আলম, রবিউল ইসলাম, রিফাত হাসান, শাহাদাত হোসেন, জোবায়ের রহমান, সিফাত আহমেদসহ অন্তত ৩০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত ছাত্রলীগ নেতা দ্বীন ইসলাম, আকরাম হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা ইয়ার হোসেন, আওলাদ হোসেন, সাংবাদিক দৃক বিজয়কে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আওলাদ হোসেন ও দ্বীন ইসলামের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বর্তমানে পুরো কায়েতপাড়া ইউনিয়নজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চনপাড়া বস্তি এলাকার আওয়ামী লীগের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এলাকায় মহড়া দিচ্ছে।
কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, আমরা নেতাকর্মীদের নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বিজয় র‌্যালি বের করেছিলাম। সেখানে আওয়ামী লীগ নামধারী অস্ত্রধারী-সন্ত্রাসীরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে আমার লোকজনকে আহত করেছেন। আমি এ ঘটনার সঠিক তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।
ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জায়েদ আলী বলেন, এমপি মহোদয়ের নির্দেশক্রমে আমরা ইছাখালী এলাকায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। সেখান দিয়ে রফিক লোকজন নিয়ে যাওয়ার পথে আমাদের লোকজনের উদ্দেশে উসকানিমূলক কথাবার্তা বলে। এ সময় আমাদের লোকজন তাদের নিষেধ করলে তারা অস্ত্র বের করে গুলি করে এবং অনুষ্ঠানের মঞ্চ চেয়ার-টেবিল ভাংচুর করে। এ ঘটনায় কায়েতপাড়াবাসী রফিকের বিচার দাবি করেছেন।
রূপগঞ্জ থানার ওসি ইসমাইল হোসেন বলেন, বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার কথা শুনেছি। তবে কে কীভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, সেটা আমার জানা নেই। আমরা দু’পক্ষকে নিভৃত করতে অর্ধশতাধিক রাউন্ড টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করি। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ।