আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১-১০-২০১৭ তারিখে পত্রিকা

এমএলএম মার্কেটিং সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

মমিনুল ইসলাম মোল্লা
| ইসলাম ও অর্থনীতি

মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম হচ্ছে বহুজাতবিশিষ্ট পণ্য বাজারজাত পদ্ধতি। বাংলাদেশে কয়েকবছর আগে এ ধরনের রমরমা বাণিজ্য ছিল। আমাদের দেশে এটি নতুন হলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ৫০ বছর আগেই শুরু হয়েছে। এটি নেটওয়ার্ক মার্কেটিং, ডিরেক্ট সেলিং, রেফারেন্স মার্কেটিং নামে পরিচিত। মাল্টিলেভেল মার্কেটিং মূলত ডিস্ট্রিবিউটরদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পণ্য ও সেবা বিক্রি করার একটি প্রক্রিয়া। মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম একধরনের ব্যবসা পদ্ধতি, যেখানে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা হয়। এখানে ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে বিক্রয় সম্পন্ন হয়। আপলাইন ও ডাউনলাইন এ ব্যবসার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আপলাইন ও ডাউনলাইন নামে এখানে বহু স্তরের ডিস্ট্রিবিউটর তৈরি হয়। ডাউনলাইনের কোনো ব্যক্তি কর্তৃক বিক্রীত পণ্যদ্রব্যের একটি কমিশন আপলাইনের ডিস্ট্রিবিউটাররা পেয়ে থাকে। 
লেনদেনের ক্ষেত্রে কোরআন ও হাদিসে কোনটি হালাল এবং কোনটি হারাম সুষ্টভাবে বলা হয়েছে। শরিয়তে যেটা হালাল করা হয়েছে, সেটাকে হারাম ঘোষণা দেয়ার অধিকার কারও নেই। এ ব্যাপারে আল্লাহ বলেন, ‘তুমি বল, তোমরা কি কখনও এ কথা চিন্তা করে দেখেছ, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য যে রিজিক নাজিল করেছেন তার মধ্য থেকে কিছু অংশকে তোমরা হারাম আর কিছু অংশকে হালাল করে নিয়েছে, তুমি বল, এসব হালাল-হারামের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদের কোনো অনুমতি দিয়েছেন, না তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করছ?’ (সূরা ইউনুস : ৫৯)। ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি হলো, তা বৈধ ও অনুমোদিত হতে হবে। সুতরাং যে ব্যবসার ক্ষেত্রে শরিয়তের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেগুলো ছাড়া অন্য সব ব্যবসা বৈধ। কোনো ব্যবসাকে হারাম সাব্যস্ত করতে হলে এর পক্ষে শরয়ি নিষেধাজ্ঞা থাকতে হবে। 
ইসলাম শ্রমবিহীন ফসল (সম্মান) লাভকে সমর্থন করে না। এ ধরনের ব্যবসার নিয়ম হলো কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কেনার পর ডিস্ট্রিবিউটর হওয়ার সুযোগ লাভ করে তারপর সে দুইজন ক্রেতা আনবে, তারা প্রত্যেকে আরও দুইজনকে এবং সে চারজন আরও আটজনকে কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত করবে। তবে প্রথম ব্যক্তির বিনিময়হীন শ্রম একধরনের শ্রম নির্যাতন। এ ধরনের কোম্পানিতে বিনিময়হীন শ্রমের ব্যাপারটি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কেননা একজন ডিস্ট্রিবিউটরের (পরিবেশক) ডান ও বাম উভয় দিকের নেট না চললে সে কমিশন পাবে না। অর্থাৎ কেউ যদি নির্ধারিত পয়েন্টের একজন ক্রেতা জোগাড় করে; কিন্তু আরেকজন জোগাড় করতে অক্ষম হয় তবে সে কোনো সুবিধা পাবে না। যে ব্যক্তি কোনো লোককে শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিল, তাকে দিয়ে কাজ করাল; কিন্তু কোনো সম্মানী বা পারিশ্রমিক দিল না তাকে আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে। 
বোখারিতে হাদিসে কুদসি আকারে এসেছে, ‘কেয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির সঙ্গে ঝগড়া করব। প্রথমত, যে ব্যক্তি আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে। দ্বিতীয়ত, যে ব্যক্তি কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করে এবং তৃতীয়ত, যে ব্যক্তি কোনো শ্রমিককে কাজে নিযুক্ত করে তার কাছে থেকে কাজ আদায় করার পর মজুরি পরিশোধ করে না। 
নির্দিষ্ট সংখ্যক দ্রব্য বিক্রির শর্তে ব্যবসায়ে কর্মচারী নিয়োগ দেয়া উচিত নয়। কেউ যদি এ শর্তে কর্মচারী নিয়োগ দেয় যে, নির্দিষ্ট সংখ্যক কাপড় বিক্রি করতে না পারলে সে পারিশ্রমিক পাবে না, তাহলে সে নিয়োগ বৈধ হবে না এবং দ্বিতীয় লেভেলের দুই ব্যক্তি নিম্ন লেভেলের আট ব্যক্তি ক্রেতা-পরিবেশকের সুবাদে কোম্পানি থেকে কমিশন পায়। অথচ এ আটজনের কাউকেই প্রথম ব্যক্তি ও দ্বিতীয় লেভেলের দুই ব্যক্তি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত করেননি। 
কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী তারা কমিশন পাবে। এ ধরনের নিয়ম ইসলামে সমর্থিত নয়। শর্তযুক্ত বিক্রি ইসলাম সমর্থন করে না। এছাড়া একই চুক্তির জন্য আরেকটি শর্ত করা ‘হাদিসে নিষিদ্ধ’।
এমএলএম কোম্পানিতে শুধু পণ্য বিক্রির শর্তে ডিস্ট্রিবিউটর করা হয়। এখানে পণ্য ক্রয়কে ডিস্ট্রিবিউটর হওয়ার জন্য শর্ত করা হচ্ছে, যা হাদিসে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘একটি আকদের (চুক্তি) জন্য আরেকটিকে শর্ত করা সুদি কারবার।’ (ইবনে হিব্বান)। ইসলামের একটি নির্দিষ্ট শ্রমনীতি রয়েছে। এ নীতি অনুযায়ী কোনো মানুষ শুধু তার নিজের শ্রমের প্রত্যক্ষ ফল লাভের অধিকারী। কারও নিযুক্ত কর্মী না হলে একজন অপরজনের শ্রমের ফলে অংশীদার হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, কোনো মানুষই অপরের বোঝা উঠাবে না। মানুষ ততটুকুই পাবে। কারও নিযুক্ত কর্মী না হলে একজন আরেকজনের শ্রমের ফসলে অংশীদার হতে পারে না। একইভাবে মানুষ তার শ্রমের ফল শুধু নিকটবর্তী লেভেল থেকে আশা করতে পারে। কোনোক্রমেই তা বহুস্তর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে না। 
এমএলএম কোম্পানিগুলো এভাবেই ব্যবসা করে থাকে। অনিশ্চিত বেচাকেনা বৈধ নয়। অনিশ্চিত বলতে ‘বাইয়ুল গারার’ এর কথা বলা হয়েছে। আল্লামা কাসানি বলেন, গারার হচ্ছে এমন একটি অনিশ্চয়তা, যাতে হওয়া এবং না হওয়া উভয় দিক বিদ্যমান। আরও সহজভাবে বলা যায়, যার এমন একটি প্রকাশ্য রূপ রয়েছে, যা দ্বারা মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু এখন অদৃশ্য যে কারণে
তা অস্পষ্ট। এর প্রকাশ্যরূপে ক্রেতাকে ধোঁকায় ফেলে আর এর ভেতরের রূপ অজানা। অনিশ্চিত বিক্রি সম্পর্কে রাসুলে আকরাম (সা.) নুড়ি পাথর নিক্ষেপ করে ক্রয়-বিক্রয় সাব্যস্ত করা এবং বাইয়ুল গারার সংক্রান্ত লেনদেন করতে বারণ করেছেন।’ (মুসলিম)। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হালাল সুস্পষ্ট এবং হারাম সুস্পষ্ট। এ দুইয়ের মাঝে রয়েছে সন্দেহ। সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকলে সে তার দ্বীন ও ইজ্জত রক্ষা করল।’ (বোখারি)।