আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২৫-১১-২০১৭ তারিখে পত্রিকা

নেত্রকোনায় বারী সিদ্দিকী চিরনিদ্রায়

আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রথম পাতা

‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘তুমি থাকো কারাগারে’, ‘সাড়ে তিন হাত কবর’Ñ এর মতো বাংলা লোকগানের শিল্পী বারী সিদ্দিকী চলে গেলেন সব মায়া ছেড়ে, সেই সাড়ে তিন হাত কবরে। তিনি আর জাগবেন না। গাইবেন না গান। এ জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও নন্দিত বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী আর নেই। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটার  

দিকে তিনি মারা যান (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ একজন জনপ্রিয় লোকসংগীত শিল্পীকে হারাল। যতদিন লোকসংগীত থাকবে, ততদিন বারী সিদ্দিকী বেঁচে থাকবেন।
১৭ নভেম্বর রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে বারী সিদ্দিকীকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসা হয়। সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তার দুইটি কিডনি আগে থেকেই অকার্যকর ছিল। ২ বছর ধরে তার ডায়ালিসিস চলছিল। বারী সিদ্দিকীর ছেলে সাব্বির সিদ্দিকী জানান, শুক্রবার সকালে বারী সিদ্দিকীর লাশ নেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে ভক্ত আর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মীরা তার জানাজায় অংশ নেন। এরপর তার কফিন নেয়া হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রাঙ্গণে। সেখানে আরেক দফা জানাজার পর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নেত্রকোনায়। আসরের পর নেত্রকোনা সরকারি কলেজ মাঠে জানাজা শেষে চল্লিশা কালী গ্রামে দাফন করা হয়। বারী সিদ্দিকী একাধারে সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও বংশীবাদক ছিলেন। তিনি মূলত গ্রামীণ লোকসংগীত ও আধ্যাত্মিক ধারার গান করতেন। তার গাওয়া ‘শুয়া চান পাখি’, ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’, ‘সাড়ে তিন হাত কবর’, ‘তুমি থাকো কারাগারে’, ‘রজনী’সহ আরও অনেক গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।  
বারী সিদ্দিকী ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেত্রকোনায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পরিবারেই গান শেখার হাতেখড়ি হয় তার। ১২ বছর বয়সেই নেত্রকোনার শিল্পী ওস্তাদ গোপাল দত্তের অধীনে তার আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমান, দবির খান, পান্নালাল ঘোষসহ অসংখ্য গুণী শিল্পীর সান্নিধ্য লাভ করেন। ওস্তাদ আমিনুর রহমান একটি কনসার্টের সময় বারী সিদ্দিকীকে দেখে তাকে প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন। পরে ৬ বছর ধরে তিনি ওস্তাদ আমিনুর রহমানের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন।
সত্তরের দশকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হন বারী সিদ্দিকী। ওস্তাদ গোপাল দত্তের পরামর্শে ক্লাসিক্যাল মিউজিকের ওপর পড়াশোনা শুরু করেন। পরে বাঁশির প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন ও বাঁশির ওপর উচ্চাঙ্গ সংগীতে প্রশিক্ষণ নেন। নব্বইয়ের দশকে ভারতের পুনে গিয়ে প-িত ভিজি কার্নাডের কাছে তালিম নেন। দেশে ফিরে এসে লোকগীতির সঙ্গে ক্লাসিক মিউজিকের সম্মিলনে গান গাওয়া শুরু করেন। 
ঢাকার বিভিন্ন স্টুডিওতে বাঁশি বাজিয়ে বেড়ানোর মধ্যেই ১৯৯৩ সালে হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে তার বাসায় এক অনুষ্ঠানে বাঁশি শোনাতে যান বারী সিদ্দিকী। সেই অনুষ্ঠানে বারী সিদ্দিকীর বাঁশির চেয়ে তার কণ্ঠে গাওয়া রশিদ উদ্দিন বাউল আর উকিল মুন্সির গানই বেশি পছন্দ হয় হুমায়ূনের। পরে লেখক হুমায়ূনের আগ্রহেই বারীর কণ্ঠে ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়,’ ‘পুবালি বাতাসে’ গানগুলো রেকর্ড করা হয়।
টেলিভিশনে ‘রঙের বাড়ই’ নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ‘আমার গায়ে যত দুঃখ সয়’ গানটি প্রচার করা হলে বারী সিদ্দিকী পৌঁছে যান সারা দেশের শ্রোতাদের হৃদয়ে। ১৯৯৯ সালে হুমায়ূন আহমেদের রচনা ও পরিচালনায় ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে সাতটি গানে কণ্ঠ দেন বারী সিদ্দিকী। ‘শুয়া চান পাখি’ গানটি সে সময় তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। ওই বছরই জেনেভায় বিশ্ব বাঁশি সম্মেলনে যোগ দেন বারী সিদ্দিকী। পরে ‘রূপকথার গল্প’, ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ ও ‘আমার দেশের মাটি’সহ আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকে গেয়েছেন এ শিল্পী। তার কণ্ঠের গান নিয়ে ডজনখানেক অ্যালবামও প্রকাশিত হয়েছে।     
শুক্রবার দুপুরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বারী সিদ্দিকীর মৃত্যুতে দলের চেয়ারপারসনের পাশাপাশি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় বারী সিদ্দিকীকে লোকগান ও আধ্যাত্মিক গানের একজন জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করে খালেদা জিয়া বলেন, তার গান এ দেশের সংগীতপ্রেমী মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছিল। তার কণ্ঠে মরমি গানে সংগীতপ্রিয় মানুষ মোহাবিষ্ট থাকত। বারী সিদ্দিকীর মৃত্যু সংগীতানুরাগী মানুষের জন্য অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও বেদনার। 
দেশের এ বরেণ্য সংগীতসাধক তার অক্লান্ত অধ্যাবসায়ে দেশের লোকসংগীত ও আধ্যাত্মিক ধারার গানের জগৎকে করেছিলেন সমৃদ্ধ। সংগীতাকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। তার মৃত্যুতে দেশ হারাল অসাধারণ একজন গুণী শিল্পীকে, যার অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। সংগীতে তার অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।