আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

নবজাতক ও বাল্যবিয়ের হিড়িক রোহিঙ্গা ক্যাম্পে

মাহমুদুল হক আনসারী
| সম্পাদকীয়

নবজাতকের জন্ম ও বাল্যবিয়ের কারণে দিন দিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসংখ্যার ভার বাড়ছে। এ বছর ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাসের এক বছর পূর্ণ হলো। এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর উদ্বাস্তু  রোহিঙ্গারা তাদের ভিটাবাড়িতে নিরাপদে নাগরিক অধিকার নিয়ে ফেরত যেতে বিক্ষোভ করেছে। হাজার হাজার রোহিঙ্গা নরনারী একত্রিত হয়ে পৃথিবীর মানবতাকামী নেতাদের কাছে এ দাবি তুলে ধরেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন-নিপীড়ন, হত্যা-ধর্ষণ সহ্য করতে না পেরে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে প্রতিবেশী বন্ধু সুলভ আচরণ করতে গিয়ে ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়। এক বছর ধরে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ নানাভাবে তাদের আশ্রয় দিতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছে। তাদের থাকা-খাওয়া, অস্থায়ী ক্যাম্প নির্মাণে দেশের সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড, পুলিশ বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করেছে। কক্সবাজার-টেকনাফের স্থায়ী জনগণ সাধ্যমতো উদ্বাস্তু এ জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতি, ভালোবাসা ও আন্তরিকতা প্রকাশ করেছে। নিজেদের বাড়ি ভিটে খালি জমি তাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে। মানবতার প্রতি উদারতা ও ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণ বিশেষ করে ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের ওপর চরম বিপর্যয় ও ভোগান্তি  নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক পরাশক্তি ও জাতিসংঘের যেভাবে আনুকূল্য আশা করা হচ্ছিল ঠিক সেভাবে সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে নানা বৈঠক, যোগাযোগ হলেও বাস্তব কোনো সুফল বাংলাদেশ দেখছে না। বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের পার্শ্ববর্তী যেসব দেশ রয়েছে তারা এগিয়ে আসছে না এ সমস্যার সমাধানে।
এদিকে প্রতিদিন ১ হাজার ৬০০ এর অধিক রোহিঙ্গা নবজাতকের জন্ম হচ্ছে এখানে। ক্যাম্পে প্রতিদিন শত শত বাল্যবিয়ে হচ্ছে। নতুন নতুন অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। কিছু এনজিও সাহায্যের নামে ক্যাম্পে তরুণ-তরুণীদের অপরাধ কর্মকা-ে জড়ানোর সংবাদও মিডিয়ায় আসছে। নারী-শিশু পাচার হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে পড়ছে। একশ্রেণির দালালের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের জন্মনিবন্ধন, আইডি পেয়ে যাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন  দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। সেখানেও তাদের নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সংবাদ পাওয়া যায়। ফলে প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকরা এদের অপরাধের কারণে আন্তর্জাতিক সমস্যায় পড়ছে। কারণ ওই রোহিঙ্গারা বাস্তবে বাংলাদেশি  নাগরিক নয়। সে অবৈধ নাগরিক হয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে সে দেশে অপরাধ করে বাংলাদেশের সুনাম ধ্বংস করছে। এভাবে মূলত রোহিঙ্গাদের কারণে বাংলাদেশ আজ ঘরে এবং বাইরে এক বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সমস্যায় নিমজ্জিত।
ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ। ১৭ কোটির অধিক জনসংখ্যার এদেশে নানা জাত ও ধর্মের মানুষের বসবাস। জনবহুল এমন একটি দেশে যেন বিষফোড়া হিসেবে আবির্ভূত হলো রোহিঙ্গা সমস্যা। যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। রোহিঙ্গাদের এভাবে বছরের পর বছর বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হিসেবে রাখা যাবে না। তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি থামিয়ে দিতে হবে। তাদের প্রবেশের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে তারা যেন প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত আলাপ আলোচনার মাধ্যমে যাদের নিয়ে এর সমাধান করা সম্ভব, তাদের ম্যানেজ করে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। বর্তমান সরকারের জন্য এ সমস্যা সমাধান করা যত সহজ হবে, আরেকটি পরিবর্তিত সরকার এলে তার জন্য সহজ না হয়ে সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে।
ক্যাম্পে প্রতিদিন হাজার হাজার জন্ম নেওয়া এসব শিশুর কী ভবিষৎ, কী পরিচয় সব দিক মাথায় রেখে স্থানীয় প্রশাসনকে এসব নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাল্যবিয়ে ও তরুণ-তরুণীদের পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের ক্যাম্পে বসিয়ে না রেখে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে অর্থনৈতিক সফলতা আসতে পারে। এসব বিষয় বাংলাদেশ সরকারকে গভীরভাবে চিন্তা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে। তাহলেই হয়তো বা বাংলাদেশের জনগণ রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে নিস্তার পেতে পারে। 

প্রাবন্ধিক ও গবেষক
[email protected]