আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ১-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

নদী-খাল বর্জ্যমুক্ত হোক

আবু আফজাল মো. সালেহ
| সম্পাদকীয়

রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বর্জ্যে ভরাট হচ্ছে আশপাশের নদী ও খাল। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় প্রতিদিন আবর্জনা উৎপাদিত হয় হাজার হাজার টন। নানা জটিলতায় রোজকার বর্জ্য অপসারণ করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। ফলে রাস্তাঘাট, অলিগলি, আবাসিক, বাণিজ্যিক কি শিল্প এলাকা সর্বত্রই ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকছে। বৃষ্টি হলে এসব আবর্জনা সরাসরি ড্রেনে চলে যাচ্ছে। আবার অনেকে ইচ্ছা করেও ড্রেন ও নদীতে বর্জ্য ফেলছে। ফলে এসব বর্জ্যে রাজধানীর বিভিন্ন ডোবা-নালা ও নদী-খাল ভরাট হচ্ছে। অন্যদিকে যত্রতত্র ময়লা পড়ে থাকায় নগরবাসীকে নানা দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে। পাশাপাশি রাজধানীতে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।
বাংলাদেশের রাজধানী ও তার আশপাশের জেলার নদীগুলোর দূষণমাত্রা চরমে। বলা যায়, শিল্পকারখানার বর্জ্য বা উপজাতসহ বিভিন্ন কারণে বড় শহরগুলোতে এ সমস্যা প্রকট। নদী হলো প্রকৃতির অন্যতম দান। নদীর প্রবাহ না থাকলে প্রকৃতিও বিরূপ হয়। অথচ নদীগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। বুড়িগঙ্গা থেকে কর্ণফুলী, শীতলক্ষ্যা থেকে সুরমা কিংবা তুরাগ থেকে রূপসাÑ সব নদীই ভয়াবহ দূষণের শিকার। আমরাই আমাদের প্রকৃতির অন্যতম প্রাণ নদীকে হারিয়ে ফেলছি, নষ্ট করছি। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে দূষণের মাত্রা চরমে। যেখানে শিল্প-কলকারখানা যত বেশি সেখানে দূষণের মাত্রার অনুপাত ততই বেশি। অনেক স্থানে শিল্প-কারাখানা থেকে রাসায়নিক মিশ্রিত বর্জ্য শীতলক্ষ্যায় ফেলা হচ্ছে। ফলে পানির রং কুচকুচে কালো। এ পানি ব্যবহার করলে চর্মসহ বিভিন রোগে আক্রান্ত হতেই হবে। মৃত গবাদিপশুর বেশিরভাগই সরাসরি ফেলা হয় নদীতে। এসব মৃত গবাদিপশু পচে নদীগুলো দূষিত করে।  
৪০০ বছরের বেশি পুরানো শহর ঢাকা। ষোল শতকে এ শহর ঘিরে থাকা নদী-খাল এবং বিল-ঝিলগুলো হয়ে উঠেছিল প্রধান নগরপথ। এখন ঢাকার অনেক নদীই হারিয়ে গেছে চিরতরে। কিছু নদী টিকে থাকলেও মৃতপ্রায়; ছোট ছোট খাল কিংবা নালা হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। কিছু দিন পর হয়তো সেটাও বোঝার উপায় থাকবে না। অন্যদিকে বিলুপ্ত হয়েছে ঢাকার অনেক প্রমত্ত খালবিল। রাজধানী ঘিরে থাকা প্রধান চার নদী বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা দূষণ আর-দখলে জর্জরিত। এক সময় রাজধানীর প্রাণ ও যোগাযোগের প্রধান পথ চার নদী অবৈধ দখলে দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। নদীগুলো মাঝে মধ্যে দখলমুক্ত করতে চলে অভিযান। কিন্তু অভিযান শেষ হলেই আবার আগের মতোই দখলবাজরা হামলে পড়ে। এছাড়া নদীতীরে গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য প্রতিনিয়ত দূষিত করছে নদীকে। এতে বিপজ্জনক প্রতিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে এবং জীবনীশক্তি, জীববৈচিত্র্য প্রায় বিলুপ্তির পথে।  
শিল্পকারখানা স্থাপনের সময় বা এখন শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর হতে হবে। সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকলে কোনো শিল্প স্থাপনা করার অনুমোদন না দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অধিক কঠোর হতে হবে। প্লাস্টিক সামগ্রী, পলিব্যাগ, চিপস সামগ্রীর মোড়কের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করতে হবে। এগুলো নদীদূষণের অন্যতম কারণ। নদীর ধারে পশুর হাটগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। অযথা যাতে পানি দূষণ করতে না পারে এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হতে হবে। নগরায়ণে মাস্টার প্লানের কোনো বিকল্প নেই। শিল্পকারখানা বা আবাসিক স্থাপনা বা হাটবাজার স্থাপনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শুধু আইন করে বা আইন প্রয়োগ করেই এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না। সরকার-শিল্পপতি-জনগণ সবাইকে সচেতন হতে হবে। যার যার ক্ষেত্র থেকে আন্তরিক হলেই এ সমস্যার সমাধান করা যাবে। আমরা চাই রাজধানীর নদী-খাল বর্জ্যমুক্ত হোক, দূষণমুক্ত হোক। এজন্য দরকার সম্মিলিত উদ্যোগ। দরকার সচেতনতা। তাহলেই আগের রূপ ফিরে না পেলেও ভারসাম্য অন্তত রক্ষা হবে। এ প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি। 

কলামিস্ট, চুয়াডাঙ্গা 
[email protected]