আজকের পত্রিকাআপনি দেখছেন ২-০৯-২০১৮ তারিখে পত্রিকা

জন্মাষ্টমী

নিমাই কৃষ্ণ সেন
| সম্পাদকীয়

যিনি সর্বোতভাবে ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ যার মধ্যে সমগ্র ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও  বৈরাগ্য পূর্ণরূপে বিদ্যমান, তিনিই হচ্ছেন পরম পুরুষোত্মম ভগবান। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং। যখনই এ  ধরাধামে ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের অভ্যুত্থান হবে তখনই শ্রী ভগবান সাধুদের পরিত্রাণ, দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ এবং জগতে ধর্ম সংস্থাপনের জন্য যুগে যুগে অবতীর্ণ হন। এ তার নিজের প্রতিজ্ঞা। এ প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্যই তিনি অবতীর্ণ হয়েছিলেন মথুরায় কংশের কারাগারে, নিকষ কালো অন্ধকারে, ভুবন কাঁপানো বজ্রপাতে, বিদ্যুৎ চমকানো অন্ধকারাচ্ছন্ন গভীর রাতে, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, বিরামহীন বারিধারা, ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ দিনে, অত্যাচারী কংশ কর্তৃক কারাগারে বন্দি, বাসুদেব আর দেবকির আশ্রিত সেই কারাগার আলোকিত করে, রোহিনী নক্ষত্রে, অষ্টমী তিথিতে, মেঘকুঞ্জের রং ধারণ করে, অষ্টম গর্ভের সন্তান হয়ে দেবকির হৃদয়ে আবির্ভূত হন। যিনি জন্ম-মৃত্যুর অধীন নন, যিনি অনন্ত অসীম তারই জন্মদিন, কী এক আশ্চর্য বিস্ময়। মহর্ষি বেদব্যাস মহাভারতের আদি পর্বেই শ্রীকৃষ্ণের স্বরূপ বর্ণনা করেছেন, ত্রিলোক পুজ্য মহা যশশ্বী স্বয়ং নারায়ণ লোকের প্রতি অনুগ্রহ করতে বসুদেব ও দেবকির সন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম ও মৃত্যুর অধীন তিনি নন, লিলায় মনুষ্য দেহ ধারণ করেন। ধর্ম সংস্থাপনের জন্য তিনি বৃষ্ণি বংশে জন্ম নেন। আবার অন্যত্র ব্যসদেব বলেছেন, নারায়ণই শ্রীকৃষ্ণরূপে জন্ম নেন।
বহুমাত্রিকভাবে দেখা দৃশ্য। আবির্ভূত হলেন বসুদেব ও দেবকীর কাছে। লালিত-পালিত হলেন নন্দ রাজার ঘরে মা যশদার কাছে। বিচিত্র লীলা, যার চরিত্র সর্বদাই নির্মল নিষ্কলঙ্ক, সেই ভগবান ষড়ইন্দ্রিয়ের এবং ষড়ঐশর্যের অধীশ্বর। তিনি কোনোভাবে প্রভাবিত না হয়ে এ বিশ্ব সৃষ্টি করেন, পালন করেন এবং ধ্বংস করেন। তিনি প্রতিটি জীবের অন্তরে বিরাজ করেন এবং তিনি সর্ব অবস্থাতেই সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন। নটব্যৎ অভিনয়পরায়ণ পরমেশ্বর ভগবানের নাম, রূপ এবং লীলা বিলাসের অপ্রাকৃত স্বভাব বিকৃত মনোভাবাপন্ন মূর্খ মানুষ জানতে পারে না। তারা তাদের জল্পনা-কল্পনায় অথবা বাক্যের মাধ্যমে তা ব্যক্ত করতে পারে না। যারা দুরন্ত বীর্য রথচক্রধারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপন্দে অনুকূলভাবে অহৈতুকি এবং অপ্রতিহতা সেবাপরায়ণ, তারাই কেবল জগতের সৃষ্টিকর্তার পুণ্য মহিমা, শক্তি এবং দিব্যভাব সম্পর্কে অবগত হতে পারেন।
শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সব অবতারের উৎস, বিশাল জলাশয় থেকে যেমন অসংখ্য নদী প্রবাহিত হয়, ঠিক তেমনি ভগবানের থেকে অসংখ্য অবতার প্রকাশিত হন। সব ঋষি, মনু, দেবতা এবং মনুর বংশধররা যারা বিশেষ শক্তিসম্পন্ন, তারাও হচ্ছে ভগবানের অংশ এবং কলা। প্রজাপতিরাও এ অংশ ও কলার অন্তর্গত। শ্রীকৃষ্ণের অবতারত্বের প্রকৃষ্ট প্রমাণ একমাত্র বৃন্দাবন লীলাতেই প্রকট হয়েছে। কারণ তাতেই তিনি তার অনিবর্চনীয় প্রেম স্বরূপতার মূর্ত লীলা দেখিয়ে গেছেন। শুদ্ধা ভক্তি ও প্রেমে ভগবান কত ভক্তাধীন হন এবং তিনি ভক্তকে কতখানি আপনার করে নিতে পারেন ইহা তার বৃন্দাবন লীলাতেই সবচেয়ে বেশি করে বোঝা যায়। যে প্রেমের ধারণা করা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জ্ঞান বুদ্ধির অগম্য, যা ভগবান ছাড়া মানুষে সম্ভব নয়। সেই প্রেমের ভাবই আবার উজ্জীবিত করতে জগন্নাথ তনয় নিমাই, শচিমাতার দুলাল, মহা প্রভু শ্রীচৈতন্য দেব বহু যুগ পরে অবতার হয়ে এসেছিলেন এবং রাধার সঙ্গে কৃষ্ণের সেই কাম গন্ধ বর্জিত মধুর লীলায় মহাভাবে আত্মহারা হয়ে জগৎকে শুদ্ধাভক্তি ও প্রেম বিলিয়ে গেছেন। সত্যযুগে শ্রী হরি, ত্রেতায় রাম, দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণ এই তিন নাম একত্র করে কলিযুগে কলিহত জীবকে উদ্ধার করার জন্য, মহানাম সংকীর্তন কলিহত জীবের গলায় পরিয়ে দিলেন।
রাজা কংশ একান্ত স্বৈরাচারী ও প্রজা পীড়ক। কংশের নারকীয় অত্যাচারে, দুর্যোধনের প্রবল হিংসাবৃত্তি তৎকালীন ভারতবর্ষ এক ক্রান্তিকালে পৌঁছে যায়। এ অত্যাচারীদের হাত থেকে ভারত বর্ষকে উদ্ধার করে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীকৃষ্ণ। কুরু পান্ডবদের পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে তৎকালীন ভারতের রাজন্যবর্গ নিজ নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার খেলায় মত্ত হয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ আসন্ন যুদ্ধ নিবারণ করতে চান, চান শান্তি। তিনি রাজন্যবর্গের কাঠে আবেদন জানালেন। ন্যায়সঙ্গত অর্ধ রাজ্য তিনি চান না, পা-বদের জন্য চাইলেন একটি ক্ষুদ্র গ্রাম। দুর্যোধন সব প্রস্তাব প্রত্যাখান করার পর অনিবার্য যুদ্ধ। আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে কুরুক্ষেত্রের সেই যুদ্ধের ময়দানে বেঁচে ছিলেন পা-বদের সাতজন, কৌরব পক্ষের তিনজন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আসুরিক বল বিনাশ করে ব্রহ্মতেজ ও ক্ষত্র তেজ উভয়কে রক্ষা করা হলো। জ্ঞান ও শক্তি পরস্পরের সহযোগিতায় বৃদ্ধি পায়। ব্রাহ্মণ তার প্রজ্ঞাবলের জন্য ক্ষত্রিয়ের শক্তিকে অপব্যবহার করতে বাধা দেন। এটা সংস্কৃতির প্রভাব। আবার ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণের রক্ষা কর্তা। স্বেচ্ছাচার, দর্প ও অহংকারের প্রতীক দুর্যোধন। দুর্যোধনের গুরুচার্বাক ব্রাহ্মণ বেশধারী রাক্ষস।
দীর্ঘ ১২৫ বছর স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মর্ত্যলোকে নর লীলা করে গেছেন, যা মহর্ষী বেদ ব্যস কর্তৃক পবিত্র মহাভারতে অলংকৃত হয়ে আছে। আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে পুণ্যভূমি কুরুক্ষেত্রের পবিত্র ধর্মযুদ্ধে বিষাদগ্রস্ত অর্জুনকে উপলক্ষ করে মানব কল্যাণে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ ভগবান পরম পবিত্র শ্রীমদ্ভগবদগীতার মাধ্যমে উপদেশ প্রদান করেন। গীতা কোনো সম্প্রদায় বিশেষের ধর্মগ্রন্থ নয়, এটি মানব ধর্মগ্রন্থ। গীতার সার্বভৌম ধর্ম উপদেশ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই গ্রহণ করতে পারে। প্রসিদ্ধ ইংরেজ মনীষী কার্লাইল, বিখ্যাত মার্কিন মনীষী এমার্সনের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তাকে একখানি গীতা উপহার দেন। এমার্সন তার কনকর্ডের বাসভবনে নিয়মিত শ্রীমদ্ভগবদগীতা অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করতেন। ১৮৯৩ খ্রি. ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার শিকাগো শহরে বিশ্ব ধর্ম মহা সম্মেলনে বীর সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, আমরা সব ধর্মমতকে সত্য বলে স্বীকার করি, জগতে কোনো ধর্ম ছোট নয়। ১৯৩৩ খ্রি. দ্বিতীয় বিশ্বধর্ম সম্মেলনে ড. মহানাম ব্রত ব্রহ্মচারীজী, সম্মেলনের প্রাণপুরুষ চার্লস ওয়েলার সাহেবকে দুই হাত জোড় করে বুকের কাছে নিয়ে মাথানত করে তাকে প্রণাম জানান। চার্লস ওয়েলার জানতে চান এরূপ প্রণামের তাৎপর্য কী? ড. মহানাম ব্রত ব্রহ্মচারীজী বলেন, ডরঃয যবধফ ধহফ যবধৎঃ ও ংধষঁঃব ঃযব এড়ফ রহ ুড়ঁ. অর্থাৎ আমার হৃদয় ও মস্তক দিয়ে আপনার অন্তরে যে ভগবান আছেন তাকে প্রণাম জানাই অর্থাৎ সব মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের অবস্থান।
মহান জন্মাষ্টমীর এ শুভক্ষণে দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় আমরা অতীতের সব কালিমা, ভিরুতা, মোহাচ্ছন্নতাকে দূরে ফেলে আজ আমরা সবাই ধর্মের মহান পতাকাতলে উপস্থিত হয়েছি, সেই মহান শিক্ষাঙ্গনে আমরা পা রেখেছি, যেখানে দাঁড়িয়ে আত্মার অমরত্বের কথা আমরা শুনব; ভেদ-বৈষম্যের ঊর্ধ্বে যেখানে মনুষ্যত্বের সব নীচতা, পরশ্রীকাতরতা, অবমাননা, সব লাঞ্ছনা, প্রতিপদে গ্লানি, বীর্যহীনতা ও হতাশা, জাতির অস্থি মজ্জায় কামনা-বাসনার পৈশাচিকতা চিরতরে দূর হয়ে যাবে। ভয় আর ব্যর্থতাকে জয় করে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই, সন্ত্রাস দমন, পুনর্গণতন্ত্র বাস্তবায়ন, আর অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনে বিকশিত হোক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের মর্যাদা। আজ সারা বিশ্বের মানুষ অন্য মানুষকে, এক জাতি অন্য জাতিকে নিজ নিজ ভোগ স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নির্মমভাবে ধ্বংস করছে। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শক্তিমান তথা কথিত উন্নত জাতি তাদের জাতীয় উন্নতি ও স্বদেশ সেবার পুণ্য নামে এবং জগতের শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সভ্যতা বিস্তারের দোহাই দিয়ে দুর্বল ও অনুন্নত জাতিগুলোর সর্বস্ব শোষণ করে সর্বনাশা অস্ত্রের ভয়ে ভীত করে প্রভাব বিস্তার করছে। পাশ্চাত্যের দৃষ্টিতে অপাশ্চাত্য অশ্বেত অখ্রিষ্টান মানুষ নয়, তারা অশিক্ষিত, বর্বর। এরূপ পীড়াদায়ক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বের ভোগের উপকরণ রাশি নিয়ে, তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই আধুনিক বিশ্বে অশান্তির কারণ। আমরা শান্তি চাই, আমরা ঈশ্বর লাভে বিশ্বাসী, এ পৃথিবীর মানুষ যতদিন না অন্তরের সম্পদে, অন্তরের ঐশ্বর্যে নিজেদের হৃদয়কে ভরে না তুলছে, ততদিন পৃথিবীতে শান্তি আশা অসম্ভব। আমরা পৃথিবীর সব মানুষের ঐক্য ও মিলনের সাধনায় বিশ্বাসী। আমরা বিশ্বাস করি, ধর্মের সব মত ও পথের প্রতিপাদ্য বিষয় যেমন ঈশ্বর, তেমনি পৃথিবীর সব মানুষও বিভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়েও সেই পরম ঐক্যের সাধনায়রত। 

নিমাই কৃষ্ণ সেন
প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট